করোনা-পরবর্তী ব্যাপারগুলো নিয়েই আমি বেশি চিন্তিত

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২০

করোনা প্রতিরোধে দেশে চলা সরকারি ছুটিতে জরুরি কাজ ছাড়া ঘর থেকে বের হতে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। এই অবস্থায় আর সবার মতো বাসাতেই সময় কাটাচ্ছেন অভিনেতা শতাব্দী ওয়াদুদ। প্রতিকূল এই সময়ে কিছু কিছু ব্যাপারে বেশ চিন্তিতও তিনি। বাসায় কীভাবে সময় কাটাচ্ছেন এবং কী বিষয়ে চিন্তিত, এ নিয়ে মুঠোফোনে তার সঙ্গে কথা হয় ভোরের কাগজের। কথা বলে লিখেছেন রাব্বানী রাব্বি

ঘরে কীভাবে সময় কাটাচ্ছেন?

সিনেমা দেখা, বই পড়া এবং গান শোনা। আর বাচ্চাকে সময় দিচ্ছি। তার খেলাধুলায় সঙ্গ দিচ্ছি, সে ছবি আঁকছে সেখানে সাহায্য করছি কিংবা পাপেট বানাচ্ছে সেখানে সাহায্য করছি। তাকেই বেশি সময় দেয়া হচ্ছে। স্ত্রীকেও সময় দিতে পারছি, যা দৈনন্দিন জীবনে হয়ে ওঠে না। আমি যেমন অভিনয়ে ব্যস্ত থাকি, আমার স্ত্রীও শিক্ষকতা করেন। করোনা হয়তো প্রতিটা বাড়ি থেকে প্রতিটা বাড়িকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে; সবাইকে আলাদা করে দিয়েছে। আবার পরিবারের লোকজনের কাছে আসার একটা সুযোগ করে দিয়েছে, ভাবনার সুযোগ দিয়েছে।

বর্তমান সময়টাকে কি খুব বেশি কঠিন মনে হচ্ছে?

এখন যে সময়টা যাচ্ছে এর সঙ্গে সারা বিশে^র কেউই অভ্যস্ত ছিলাম না আমরা। এ জন্য খাপ খাইয়ে নিতে একটু কষ্ট হচ্ছে। আমার কাছে মনে হয়, পরবর্তী অবস্থাটা এর চেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর হবে। কারণ গত দু’মাসে অনেক অফিস বা কোম্পানি শ্রমিকদের বেতন দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে; কর্মী ছাঁটাই করছে। আমাদের টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির কথাই ধরেন, কাজকর্ম তো সব বন্ধ। এই পরিবারগুলো এখন কী করবে? প্রডিউসার, অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান, টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর কথাই বলেন! তারা এই দুই মাস পরে গিয়ে নতুন করে কাজ শুরু করে আবার অন-এয়ার হয়ে পুরো প্রক্রিয়াটা স্বাভাবিক হতে যে সময় লাগবে ওই সময়ের মধ্যেই হয়তো অনেক বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। অনেকেই হয়তো ইন্ডাস্ট্রি থেকে হারিয়ে যাবে, অন্য প্রফেশনের দিকে যাবে। তাই আসলে করোনা-পরবর্তী ব্যাপারগুলো নিয়েই আমি বেশি চিন্তিত। শুধু আমার নিজের প্রফেশনের কথাই বলছি না, অন্যান্য প্রফেশনের ক্ষেত্রেও করোনা-পরবর্তী সময়ে আমরা কীভাবে নিজের কর্মস্থলে ফিরে আসব- এ নিয়ে চিন্তিত। ধরেন করোনা-পরবর্তী সময়ে শুটিংয়ে গেলাম, সেখানে ৫০ জনের সঙ্গে মিশলাম; আমার স্ত্রী বা বাচ্চা স্কুলে গেল, সেখানে মানুষের সঙ্গে মিশল- এই অবস্থায় আবার করোনা ফিরে আসবে কি-আসবে না সেটা নিয়েও একটা অজানা ভীতি থাকবে হয়তো।

এছাড়া আর কোন বিষয়গুলো নিয়ে আপনি চিন্তিত?

আরেকটা ব্যাপার হলো যে, মানুষের ক্ষুধার কষ্ট সবচেয়ে বড় কষ্ট। এখানে আমাদের দেশে দুটি বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। একটা শ্রেণি মানবিকভাবে ক্ষুধার্তদের পাশে দাঁড়াচ্ছে, আরেকটা শ্রেণি আবার সেই ক্ষুধার্তদের ত্রাণ চুরি করছে। পাশাপাশি আরেকটা শ্রেণি কেউ মারা যাওয়ার পর তার লাশ দাফনের জন্য মসজিদ থেকে খাটিয়া দিচ্ছে না; আরেকটা শ্রেণি করোনা রোগীদের জন্য হাসপাতাল হবে সেখানে বাধা দিচ্ছে। মানুষও আসলে এই অস্থির সময়ে অদ্ভুত আচরণ করছে। এটা আসলে সময়ের দোষ, শুধু চোরদের ব্যাপারটা ছাড়া। চোররা বরাবরই চোর; এরা আগেও ছিল, এখনো আছে, পরবর্তীতেও থাকবে। আর সাধারণ মানুষেরাও না জানার কারণে একটা ট্রমার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, নয়তো একটা হসপিটাল হলে কেন তারা বাধা দিবে? কেন গোরস্তানে দাফন করতে দিবে না তারা?

বলছিলেন ত্রাণ চুরি হচ্ছে, করোনা হাসপাতাল হতে দিচ্ছে না মানুষ; এমনটা কেন হচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?

আমার মনে হয়, এটা বিচার-বিবেক-বোধ-বুদ্ধিহীনতা; মানুষ আসলে বুঝতেই পারছে না তাদের কী করা উচিত? আমি যে জায়গাটাই অবস্থান করি, সেই জায়গা থেকে আমার কী করা উচিত আর কী করা উচিত না; মানুষ সেটাই বুঝতে পারছে না। অনেকেই আছে লোভের তাড়নায় করছে, অনেকেই ক্ষুধার তাড়নায় করছে। মিডিয়ার বিশ^ায়নে সবকিছু সামনে এসে পড়ছে। আমরা এখন যে সময়টা পার করছি, সবাইকে সবার পাশে দাঁড়ানো উচিত। আর চুরির বিষয়টা অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে করছে। ইউপি চেয়ারম্যান ২০ কেজি ত্রাণ থেকে ৫ কেজি মেরে দেয়াকে হক ভাবছে; না এটা তার হক না, সে অপরাধ করছে। তার হক হলো মানুষকে সেবা দেয়া, ৫ কেজি রেখে দেয়া না। আর এই মুহূর্তে আমাদের সরকারের এমপিদেরও ঘরে বসে না থেকে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে কাজ করার উদ্যোগটা নেয়া প্রয়োজন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এই মুহূর্তে কেন আমাদের মাঝে সমন্বয়হীনতা থাকবে? সবশেষে বলব আমাদের সামাজিক শিক্ষার অভাবে আমরা আরো পিছিয়ে যাচ্ছি। পৃথিবী যেখানে এক হয়ে যাচ্ছে সেখানে আমরা সামাজিক শিক্ষার অভাবে উল্টাপাল্টা কাজ করছি।

সমাজবিজ্ঞানীদের ধারণা ‘করোনাকাল শেষে মানুষ মানবিক হবে’, আপনার কী ধারণা?

কেউ কেউ হয়তো হবে, কিন্তু সবাই যে একদম মানবিক হয়ে যাবে তা না। এখনই এই সংকটে অনেকেই সুযোগ নিচ্ছে, আর পরবর্তীতে তো আরো সুযোগ নিবে। সারাবিশে^র অবস্থা কী হবে আমি জানি না; তবে আমি নিশ্চিত, আমাদের অবস্থা আরো খারাপ হবে।

বিনোদন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj