করোনাকালে গণমাধ্যম : অস্তিত্বের সংকট ও জাতিকে সচেতন করার লড়াই

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২০

এখন বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের লড়াই চলছে। গণমাধ্যমসমূহ এই লড়াইয়ের সম্মুখে রয়েছে। অসংখ্য গণমাধ্যম নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বেশকিছু গণমাধ্যম মানুষকে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতন করার কাজটি সব ধরনের ঝুঁকি নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশেও প্রিন্ট মিডিয়া এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এখন মানুষের অন্যতম ভরসার স্থল। এর মধ্যে দৈনিক পত্রিকাগুলো নিয়মিত প্রকাশিত হলেও পাঠকদের পড়তে হয় অনলাইনে। সাধারণ পাঠকরা আগের মতো পত্রিকা পড়ার সুযোগ পায় না। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে হকাররা পাঠকদের হাতে পত্রিকা পৌঁছাতে পারছে না। তারা এখন কার্যত বেকার। পত্রিকাগুলোও সীমিত পাতায় স্বল্পসংখ্যক প্রতিদিন প্রকাশিত হচ্ছে। প্রতিদিনের নানা খবরাখবর এবং দেশীয় ও বৈশ্বিক সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দৈনিক পত্রিকাগুলো বিজ্ঞাপন প্রাপ্তিতে সংকটে পড়েছে। পত্রিকায় কর্মরত সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতনের সংস্থান করা বেশ দুরূহ হয়ে পড়েছে। অনেক পত্রিকাই হয়তো এখন আর টিকে থাকার পর্যায়ে নেই। ফলে দৈনিক পত্রিকাগুলো করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই বন্ধ হওয়ার লড়াইতে বিপর্যস্ত। অচিরেই হয়তো কর্তৃপক্ষসমূহ বেশিরভাগ দৈনিক পত্রিকা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। এর ফলে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের ভাগ্যে নেমে আসতে পারে চরম হাহাকার। আমরা জানি না কয়টি জনপ্রিয় পত্রিকা নিজেদের অস্তিত্বের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে, মালিকপক্ষ কর্মরত সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সবেতনে চাকরিতে বহাল রাখবেন। যারা এই ঝুঁকি বহন করবেন তারা সত্যিকার অর্থেই মানবতার পক্ষের তাদের অবস্থান প্রমাণ করবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।

মানুষের এখন সবচাইতে নির্ভর করার গণমাধ্যম হিসেবে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া তথা টিভি চ্যানেলগুলো ভরসার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। লকডাউন কিংবা ঘরে থাকা সব মানুষই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত খবর ও নানা ধরনের আলোচনা অনুষ্ঠান দেখে থাকেন। এই মুহূর্তে টিভি চ্যানেলগুলো সব ধরনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা ভাইরাসের খবরাখবর সচিত্র প্রতিবেদন আকারে প্রচার করে থাকে। দেশের আনাচে-কানাচে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষদের সংবাদ টিভি চ্যানেলগুলো মুহূর্তের মধ্যে দেয়ার চেষ্টা করছে, একই সঙ্গে করোনা সংক্রমণে সচেতন হওয়ার জন্য সরকারি নির্দেশাবলি, করণীয় এবং প্রতিদিনের হালনাগাদ তথ্য প্রচার করে থাকে। এর ফলে করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করে প্রয়োজনীয় জনসচেতনতা তৈরি হচ্ছে, দেশ এবং আন্তর্জাতিক করোনা পরিস্থিতির খবরাখবর মানুষ পাওয়ার আকাক্সক্ষা নিবৃত করতে পারছে। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে প্রাদুর্ভাব কীভাবে ছড়াচ্ছে এ সম্পর্কেও জনগণের আগ্রহ নিবারণ করা যাচ্ছে। এই ভাইরাসটি সম্পর্কে আমাদের মতো দেশের মানুষকে সচেতন করা খুবই কঠিন কাজ। নানা বিভ্রান্তি, অজ্ঞতা ও কুসংস্কার মানুষের বিশ্বাসের জগতে আগে থেকেই ঠাঁই করে নিয়েছে। সেকারণে করোনা ভাইরাসে সংক্রমণজনিত সতর্কতাগুলো অনেকের কাছে বোধগম্য হচ্ছিল না। যেমন হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার, সাবান দিয়ে ঘন ঘন হাত ধোয়া, শারীরিক বিচ্ছিন্নতা, লকডাউন, মাস্ক পরা, নানা ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা ইত্যাদি বিষয় সঙ্গে পরিচিত ও অভ্যস্ত হওয়া খুবই জটিল কাজ ছিল। এই প্রচারণাটি টিভি চ্যানেলগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে করে এসেছে, তারপরও ব্যাপকসংখ্যক মানুষ এখনো নানা কারণে এসব নির্দেশনাবলি ভঙ্গ করে চলছে। টিভি চ্যানেলগুলো যদি এই সময়ে সচল না থাকতে পারত তাহলে এই কাজটি কীভাবে সম্পন্ন হতো এটি একটি গুরুতর প্রশ্ন। চ্যানেলগুলো একদিকে বিজ্ঞাপন পাচ্ছে না অন্যদিকে সাংবাদিকদের অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি বেশিরভাগ টিভি চ্যানেলই আর্থিক সংকটে পড়েছে। ফলে জনগণের চাহিদা মোতাবেক অনুষ্ঠান প্রচার করার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ চ্যানেলই হাত গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে। তারপরও কিছু চ্যানেল এই মুহূর্তে জনগণকে শুধু করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত খবরাখবর প্রদানে সীমাবদ্ধ না থেকে এর গবেষণা সংক্রান্ত ধারণা প্রদানের বহুমাত্রিক উদ্যোগ নেয়ার চেষ্টা করছে। দেশে অণুজীব বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ধারণার সঙ্গে যুক্ত সব ধরনের প্রতিষ্ঠান, ল্যাবরেটরি এবং গবেষকদের বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম, উপদেশ, ধারণা উদ্যোগ, ভবিষ্যদ্বাণী ইত্যাদি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, একই সঙ্গে বিদেশের কোথায় কি কি কাজ ও গবেষণা হচ্ছে তার সর্বশেষ গতিপ্রকৃতি জানানো হচ্ছে। আমাদের চিকিৎসকদের লড়াই কীভাবে এগিয়ে চলছে সেটিও সরজমিনে উপস্থাপন করা হচ্ছে। দেশের চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা এবারের করোনা যুদ্ধে কীভাবে যার যার অবস্থান বা সম্মিলিতভাবে কাজ করে চলছেন সেটিও প্রতিদিন কোনো না কোনো টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে দর্শক-শ্রোতারা জানতে ও বুঝতে পারছেন। এসব অনুষ্ঠান আমাদের টিভি দর্শকদের বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সংক্রমিত জীবাণু, অণুজীব ইত্যাদি জটিল জ্ঞান তাত্তি¡ক ধারণার সঙ্গে অনেকটাই পরিচিত করেছে। বিষয়গুলো যে কোনো স্থূল অন্ধ বিশ্বাসজনিত নয় বরং গবেষণার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব সেটি জানা ও বোঝার সুযোগ ক’টি টিভি চ্যানেল প্রতিদিন নিয়মিতভাবে করছে। এর ফলে টিভি চ্যানেলগুলো এখন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে নয় বরং জ্ঞান-বিজ্ঞানের জটিল বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত করার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। টিভি চ্যানেলগুলোর এসব অনুষ্ঠান আমাদের উঠতি তরুণ থেকে শিক্ষিত প্রবীণের মধ্যে বিজ্ঞান সচেতনতা গড়ে তুলতে, নানা ধরনের অন্ধ বিশ্বাস থেকে মুক্ত হতে কিংবা অসহায়ত্ব থেকে উদ্ধার পেতে কতখানি প্রভাব বিস্তার করবে সেটির কোনো সনদ আমি এই লেখায় দেয়ার দাবি করছি না। তবে তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান এর এসব গুরুত্বপূর্ণ শাখার প্রতি আগ্রহী করে গড়ে তুলতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। কেননা টিভি চ্যানেলগুলো প্রতিদিনকার ওইসব অনুষ্ঠানে তরুণরা দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎ কথা শুনছে, গবেষণা কাজের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে- যা তাদের চিন্তার জগতে কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত করতে পারে। আমাদের দেশে উচ্চ শিক্ষায় এসব বিষয়ে পড়াশুনা ও গবেষণা খুবই সীমিত, তাদের কাছে অনেকটাই হয়তো কম পরিচিত অথবা অজানা রয়ে গেছে কিন্তু সাম্প্রতিক করোনা ভাইরাস নিয়ে দেশে ও বিদেশে বিজ্ঞানীদের মধ্যে যে ধরনের জ্ঞানের চর্চা চলছে, ল্যাবগুলোতে বিজ্ঞানীরা যেভাবে কাজ করে চলছেন তা আমাদের তরুণদের উদ্দীপিত করতে পারে, তারাও নিকট ভবিষ্যতে এভাবে বিজ্ঞানের মৌলিক গবেষণায় যুক্ত হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ হতে পারে। মনে রাখতে হবে আমাদের তরুণরা মোটেও মেধায় পিছিয়ে নেই কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটি এতটাই সেকেলে এবং আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষা ও গবেষণা থেকে দূরে অবস্থান করছে যে এসব শিক্ষার্থীর বড় একটি অংশই বিশ্ব জ্ঞানের মূল ধারা থেকে ছিটকে পড়ে আছে। তারা আধুনিক এসব জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষালাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। অথচ তারা এমন সব বিষয় নিয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশুনা করে যেগুলোর সামাজিক মূল্য প্রায় শূন্যের কাছে, পঠন-পাঠনের মানও নিম্ন। উচ্চ শিক্ষায় সনদ লাভ করলেও মান অর্জন মোটেও সম্ভব নয়। ফলে বেশিরভাগই বেকারত্বের গøানি বহন করে বেড়ায়। অথচ এরা যদি স্কুল থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেত কিংবা তাদের মধ্যে সে ধরনের স্বপ্নের বীজ বোপিত হতো তাহলে এদের অনেকেই বর্তমান যুগের প্রয়োজনে প্রয়োজনীয়তাকে ধারণ করে এমন সব জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করত। আমার ধারণা করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করে এখন টিভি চ্যানেলগুলো যেসব জ্ঞান-বিজ্ঞান সংক্রান্ত অনুষ্ঠান নিয়মিত প্রচার করছে তা তাদের মধ্যে কোনো না কোনোভাবে প্রভাব ফেলতে পারে, সচেতন হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে। নিকট ভবিষ্যতে করোনা-উত্তর পরিস্থিতিতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সেভাবে ঢেলে সাজানো গেলে গণমাধ্যমের বর্তমান প্রচেষ্টা ইতিবাচক ফল প্রদান করবে।

মূলধারার গণমাধ্যমের বাইরে সামাজিক মাধ্যমে দুধরনের প্রচার-প্রচারণা চলছে। এক, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইতিবাচক খবরাখবর ও উদ্যোগকে জনগণের মধ্যে প্রচারে সহযোগিতা করা হচ্ছে। দুই, অবৈজ্ঞানিক চিন্তাধারায় বিশ্বাসী কুসংস্কারাচ্ছন্ন একটি মহল করোনা ভাইরাস নিয়ে নিজেদের মনগড়া তথ্য প্রদানে লিপ্ত রয়েছে। এরা আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজকে পিছিয়ে নেয়ার কাজে তথ্যপ্রযুক্তির মতো মাধ্যমকে অপব্যবহার করে চলছে। যত বেশি আমাদের সমাজ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও গবেষণায় সচেতন হবে তত বেশি এসব গোষ্ঠী প্রচার-অপপ্রচার থেকে হারিয়ে যেতে বাধ্য হবে। আমরা কত দ্রুত মূলধারার গণমাধ্যমকে শিক্ষা ও জ্ঞান সচেতনতায় পরিচালিত করতে পারব ততই আমাদের জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত হবে।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj