সংকট উত্তরণে মিডিয়াকে বন্ধু ভাবা জরুরি

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২০


প্রাকৃতিক বা সামাজিক দুর্যোগ কোনো দেশেই নতুন কোনো বিষয় নয়। অতীতে এই দুই ধরনের দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে আমাদের দেশের সব সম্মিলিতভাবে কাজ করেছেন। অভিজ্ঞতা আছে। আছে ইতিহাস। এককভাবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দুর্যোগ মোকাবিলা করা সহজ নয়, সহজ হয়নি কখনো। বর্তমানে কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস শুধু বাংলাদেশের নয়, গোটা বিশে^র জন্য এক ভয়ানক আতঙ্ক। একশ বছরের মধ্যে এমন আতঙ্ক, দুর্যোগ কেউ দেখেননি। লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন প্রতিদিন। গোটা বিশ^ আজ যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। এমন অবস্থায় বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনা প্রাদুর্ভাব রোধে অনেক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে, কাজ করা হচ্ছে। প্রস্তুতি নিয়ে জনমনে সংশয় দেখা দিয়েছে। দেয়াটা স্বাভাবিক ছিল। গত তিন মাসের প্রস্তুতির মধ্যে করোনা শনাক্তের জন্য ২ হাজার কিট, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পারসোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট বা পিপিই না থাকা, করোনার জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থাকে গুছিয়ে না আনা, কতিপয় মন্ত্রীদের অসংলগ্ন কথাবার্তা, ইতালি থেকে অবাধে প্রবাসীদের দেশে প্রবেশ ইত্যাদির কারণে এই সংশয়। যাই হোক, করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে দেখা দেয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সরকার এখন পুরোদমে কাজ শুরু করেছে। আর্মি, স্থানীয় প্রশাসন নেমে গেছে মাঠে। চীন থেকে এসেছে কিট, পিপিই ও থার্মোমিটার। একটা কথা না বলে পারছি না এসবের ভেতরেও জনমন থেকে সংশয়, আতঙ্ক দূর হচ্ছে না। চীন, ইতালি, স্পেন, যুক্তরাজ্য প্রভৃতি দেশগুলোর মর্মান্তিক অবস্থা, লাশের মিছিল, সেসব দেশের সরকারপ্রধানদের বক্তব্য আজ গোটা বিশ^বাসীকে করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে ভীতু করে তুলেছে। বাংলাদেশের মানুষ আজ সেই ভয়ের কাতারে দাঁড়িয়ে গেছে। এসব দৃশ্য মানুষ বিশ^ মিডিয়ায় প্রচারিত সংবাদের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করছে প্রতিনিয়ত। এমন সংবাদ প্রচার কী শুধু ভয়াবহতার কথাই বলছে? তা নয়। অন্য দেশকে প্রস্তুতি নেয়ার আগাম বার্তা দেয়া হচ্ছে। কারণ এসব সংবাদে কোন দেশ, কোন ব্যক্তি-গোষ্ঠী কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন তার জাতিকে রক্ষা করার জন্য সেসব থাকছে। আজকে কিন্তু এই মিডিয়ার বদৌলতে এক দেশ অন্য দেশে করোনার ভয়াবহতা ও উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের সার্বিক তথ্য পাচ্ছেন। মিডিয়ার কাজ হলো সঠিক তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে নিজ দেশ ও অন্য দেশকে জাগ্রত করে রাখা ও কোথাও কোনো দুর্বলতা থাকলে তা উপস্থাপন করা। আমরা এমনো সংবাদ দেখেছি মৃত্যু ভয়কে জয় করে কীভাবে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা মৃত্যুকাতর মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন। এই সংবাদ তৈরি করছেন সাংবাদিক বা মিডিয়াকর্মীরা। যা অন্য চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করার জন্য সহায়ক হয়। শুধু চিকিৎসক নন, কমিউনিটি, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কিংবা কোনো ব্যক্তির ভালোমন্দ কাজকে তুলে ধরেন জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সংবাদকর্মীরা।

রাষ্ট্রের, বিশে^র ক্রান্তিকালে মিডিয়াকে বন্ধু ভাবলে সংকট দূর হয়। এই ভাবনা নিছক নয়, প্রমাণিত। একটা দেশের সরকারের পক্ষে সম্ভব নয় সব তথ্য জানার। সার্বিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সব পর্যায় থেকে তথ্য গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সরকারের নিজস্ব বিভাগ যদিও আছে তথ্য সংগ্রহের জন্য, কিন্তু তা আদতে কতটা নির্ভরযোগ্য ও সংকট উত্তরণের চাহিদা পূরণে কতটা বিশ^স্ততাপূর্ণ, সেই বিষয়ে যথেষ্ট সংশয় ও সন্দেহ রয়ে যায়। এই সংশয় ও সন্দেহের পেছনে কাজ করে অতীত অভিজ্ঞতা। বলতে দ্বিধা নেই যে, কোনো সরকার আমলেই এই নির্ভরযোগ্যতা আসেনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সব রাজনৈতিক সরকার নিজেদের দুর্বলতা বা ব্যর্থতা প্রকাশ করতে চায় না, চায়নি অতীতে।

অভিজ্ঞতা মানুষ জীবনের একটি বড় শিক্ষা। এই শিক্ষায় মানুষ তার বর্তমান পাড়ি দেয় যেমন এবং তেমনই বর্তমান অভিজ্ঞতা নিয়ে ভবিষ্যৎ দেখতে পায়, দেখতে চায়। মানুষের মানসিক অবস্থাটা কিন্তু তৈরি হয় তার প্রত্যক্ষণ ও শিক্ষণের ওপর দাঁড়িয়ে। যেটাকে আমরা প্রচলিতভাবে অভিজ্ঞতা বলে থাকি। গোটা দেশে যে দুর্নীতির ছেয়ে যাওয়া এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে যে দুর্নীতি নিয়ে জনমনে অসন্তুষ্টি, তা কিন্তু একটা শ্রেণি মানুষের তথ্য গোপন কিংবা সঠিক তথ্য উপস্থাপন না করে তাদের স্বার্থ উদ্ধারের পাঁয়তারারই একটা ফলশ্রæতি। দুর্নীতির প্রথম স্তর কিন্তু তথ্য গোপন করা। সরকারের বড় বড় প্রকল্পের পুকুরচুরির ঘটনা কিন্তু এই তথ্য গোপন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা করে আসছেন এবং তা বহুদিন ধরেই। শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান কেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও দুর্নীতি হয় প্রকৃত তথ্য গোপনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু মজার বিষয় হলো তথ্য কখনো গোপন থাকে না, থাকেনি। তথ্য সত্যের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। সুযোগ পেলেই এই দায়বদ্ধতা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সত্য প্রকাশ পায়। কিন্তু এর মাঝে যে কাজটা হয়ে যায় তা হলো তথ্য গোপনের সংস্কৃতির কারণেই কিছু কাল্পনিক গল্পগুজব জেগে ওঠে। অন্য এক পক্ষ এই গল্পগুজব জেগে উঠতে ভূমিকা রাখে। যার ভেতর যেমন থাকে প্রতিশোধপরায়ণতা, তেমন থাকে রসিকতা। যেটাকে সাধারণ ভাষায় বলা হয় গুজব। সুতরাং গুজব একা একা জন্মে যায় না কিংবা বেড়ে ওঠে না। ছড়ায়ও না।

এখন তো সময় চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসন, সংবাদকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সবারই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার। সহযোদ্ধার ও বন্ধুভাবাপন্ন দৃষ্টির অপরিহার্যতা রয়েছে। যে কোনো সংকটে সংবাদকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে আনেন যা অন্য কারোর পক্ষে সম্ভব হয় না। মূলধারার টিভি চ্যানেল কখনোই গুজব ছড়িয়েছে এমন তথ্য আমার জানা নেই। জনমনে অসংখ্য বিস্ময়কর প্রশ্নের সূত্রপাত কোথায় সেটা যদি অনুসন্ধান করা যায় তাহলে বাজারে বিভ্রান্তকর তথ্য প্রচার হয় না কিংবা হতে পারে না।

পরিশেষে সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রোধে জনগণকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলে সেই দূরত্ব যেন সরকার, চিকিৎসক, সাংবাদিক, প্রশাসন, উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে না আসে। সম্মিলিত উদ্যোগ আর সমন্বয় জরুরি এই মুহূর্তে। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতাকেও পরিহার করে দেশ ও জাতিকে রক্ষার স্বার্থে এক আদর্শতলে শামিল হওয়া দরকার। বিশ^ নেতারাও কিন্তু এখন কিছুদিন পূর্বের মতপার্থক্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। গোটা বিশ^কে রক্ষার জন্য তারা সহনীয় হয়ে এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন। আসুন আমরাও আমাদের দেশের মানুষকে বাঁচাতে ভেদাভেদ ভুলে যাই।

স্বপ্না রেজা : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj