স্বাস্থ্যবিধিই প্রধান চ্যালেঞ্জ : খুলল পোশাক কারখানা, শ্রমিকরা ফের ঢাকামুখী

সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২০

কাগজ প্রতিবেদক : করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) মহামারির উদ্বেগের মধ্যেই শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিয়ে সীমিত পরিসরে পোশাক কারখানা চালু হয়েছে। ধাপে ধাপে মে মাসের প্রথমে সব কারখানা খুলে দেয়ারও চিন্তা-ভাবনা চলছে। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কলকারখানা চালু রাখাই প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এদিকে কাজে যোগ দিতে শত মাইল দূর থেকে পায়ে হেঁটে বা বহুকষ্টে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চাকরি বাঁচাতে কারখানায় যোগ দিতে বাধ্য হয়েছেন লাখো পোশাক শ্রমিক। কারখানা খোলার খবরে গত শনিবার থেকেই অনেক শ্রমিক কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেন। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় কেউ হেঁটে, আবার কেউ অতিরিক্ত ভাড়ায় রিকশা-ভ্যানে গাজীপুর ও সাভারের বিভিন্ন কারখানায় প্রবেশ করেন।

গত শনিবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে ৮টি অঞ্চলভিত্তিক পোশাক কারখানা চালুর ঘোষণা দেয় তৈরি পোশাক শিল্পের দুই খাতের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। সংগঠন দুটির ঘোষণা অনুযায়ী, গতকাল রবিবার রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়াসহ ঢাকার আশপাশ এবং চট্টগ্রামসহ দেশের প্রায় সবকটি বিভাগীয় শহরে পোশাক কারখানা খুলেছে।

এর আগে গত শনিবার বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক জানান, পোশাক শিল্পের ৮৬৫টি কারখানা খুলে দেয়ার দাবি আছে। এ পর্যন্ত ৩ বিলিয়ন ডলারের ওপর অর্ডার বাতিল হয়েছে। অনেকের অর্ডার আছে। এলাকাভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দিনক্ষণ বেঁধে, সীমিত আকারে, স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে কারখানা খুলে দিতে তিনি সবার সহযোগিতা চান। মালিকপক্ষের পাশাপাশি খাত সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবসায়ী ও সরকারের পক্ষ থেকেও এই প্রস্তাবে সায় দেয়া হয়। সামাজিক দূরত্ব রক্ষার এই সময়ে সতর্কতার সঙ্গে কীভাবে কারখানা চালু করা যায় তার একটি প্রটোকল তৈরি করে মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। ধাপে ধাপে সব কারখানা মে মাসের প্রথমে খুলে দেয়া হবে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।

বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর ঘোষণায় বলা হয়- রাজধানীর আশপাশে যেখানে কারখানার শ্রমিকরা অবস্থান করেন এমন সব এলাকার পোশাক কারখানা মাত্র ৩০ শতাংশ শ্রমিক নিয়ে খোলা যাবে। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে মালিকরা শ্রমিকদের ফোন করে গতকাল রবিবার সকাল ৮টার মধ্যে কারখানায় হাজির হতে নির্দেশনা জারি করেছে বলে শ্রমিক সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে। আর মালিকদের এ হুকুম তামিল করতে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে লাখো শ্রমিক পায়ে হেঁটে, বিভিন্ন উপায়ে চাকরি বাঁচাতে কারখানায় হাজির হওয়ার চেষ্টা করেন। গতকাল সকালে গার্মেন্টস কারখানায় কাজে যোগ না দিলে ‘চাকরি যাওয়ার’ হুমকি আছে বলে জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন তৈরি পোশাক শ্রমিক।

তবে সব খোলা পোশাক কারখানার অনেকাংশে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি না মানায় পুলিশ-প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকটি কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়।

গতকাল বিজিএমইএর সহসভাপতি ফয়সাল সামাদ জানান, ঢাকা ও আশপাশের অন্তত ২০০ কারখানা চালু হয়েছে। তবে বিকেএমইএ কারখানার সংখ্যা জানাতে পারেনি। এদিকে চট্টগ্রামে তিনটি ইপিজেড এবং নাসিরাবাদ, কালুরঘাট এলাকায় দেড় শতাধিক কারখানা চালু হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিজিএমইএর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে- যেসব কারখানা চালু হচ্ছে সেখানে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ শ্রমিকের উপস্থিতির লক্ষ্য ধরেছে বিজিএমইএ। কেবল নিটিং, ডায়িং ও স্যাম্পল সেকশন চালু করার পরামর্শ দিয়েছে বিকেএমইএ। তাতেও অন্তত ৩০ শতাংশ শ্রমিকের উপস্থিতির প্রয়োজন হবে। লকডাউন পরিস্থিতিতে যেসব শ্রমিক সংশ্লিষ্ট কারখানার আশপাশে অবস্থান করছেন তাদের দিয়েই কারখানা চালুর কাজটি শুরু করার কথা ছিল।

এ বিষয়ে বিজিএমইএর সহসভাপতি ফয়সাল সামাদ বলেন, আমরা তাড়াহুড়ো করে কোনো কিছু করছি না; সবকিছু ধীরে ধীরে করা হচ্ছে। গত শনিবার আমরা মালিকদের বলে দিয়েছি। দূর-দূরান্ত থেকে কোনো শ্রমিক আনা যাবে না। শুধু যারা কারখানার আশপাশে রয়েছে তাদের দিয়েই কাজ শুরু করতে হবে। খুবই ছোট পরিসরে, ৩০ শতাংশের বেশি উপস্থিতি করানো যাবে না। অনুপস্থিতির জন্য কারো চাকরিও যাবে না।

নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আমরা সদস্যদের বলেছি, উপস্থিতি কম রাখার সুবিধার্থে নিটিং, ডায়িং ও স্যাম্পল সেকশন খোলার জন্য। পুরো গার্মেন্টস খুলবে না। এরপরে ২ মে থেকে কারখানাগুলো পুরোপুরি খুলবে। দূর-দূরান্তে অবস্থানকারী শ্রমিকদের এই মুহূর্তে আসতে নিষেধ করেছি। কতটি কারখানা চালু হয়েছে সেটা গতকাল দিন শেষে বলা যাবে। অন্যদিকে যেসব কারখানার আশপাশে পর্যাপ্ত শ্রমিকের উপস্থিতি রয়েছে সেগুলোই খুলতে বলেছে বিজিএমইএ।

করোনা আতঙ্কে দীর্ঘ মাসাধিককাল বন্ধ থাকার পর সাভার ও আশুলিয়ায় দেখা গেছে কারখানার সামনে গতকাল ভোর থেকে শ্রমিকদের ভিড়। অনেক কারখানায় শ্রমিকদের প্রবেশ করতেও দেখা গেছে। তবে কোনো কোনো কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি মানা হলেও অধিকাংশ কারখানায় তা মানা হচ্ছে না। এসব কারখানা থেকে করোনা ছড়াতে পারে বলে শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন। সাভার পৌর এলাকার আল মুসলিম গ্রুপের কারখানায় ৩০ হাজার শ্রমিক কাজ করে। এটি বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই স্বল্প পরিসরে চালু ছিল বলে জানা গেছে। তবে এ কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

এদিকে বাংলাদেশ বস্ত্র ও পোশাক শিল্প শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সরোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, আশুলিয়াসহ এতদসংলগ্ন এলাকায় বেশ কিছু কারখানা চালু করা হলেও স্বাস্থ্য সুরক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হয়নি। যদিও অনেক স্থানে প্রবেশের সময় ওষুধ স্প্রে করতে দেখা যায়। কোনো কোনো কারখানায় তিন শিফটও চালু হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে কারখানা চালুর বিরুদ্ধে বরাবরের মতোই অবস্থান রয়েছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। গার্মেন্টস শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের সমন্বয়ক মাহবুবুর রহমান ইসমাইল বলেন, যেখানে মানুষের জীবনের নিশ্চিয়তা নেই সেখানে কলকারখানাগুলো চালু থাকে কীভাবে? আমরা এই পরিস্থিতিতে আগামী তিন মাস পোশাক শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের বেতন-ভাতা বহনের দাবি জানাচ্ছি। আবার কোনো কোনো কারখানায় বিগত ২-৩ মাসের বেতন বাকি তা নিয়ে বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে শ্রমিকদের।

এর আগে শনিবার সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ময়মনসিংহ পাটগুদাম ব্রিজ মোড় এলাকায় দেখা যায় ঢাকামুখী গার্মেন্টস কর্মীদের। তবে দিনের বেলা তাদের বাড়ির দিকে ফিরিয়ে দেয় পুলিশ। তবে গার্মেন্টস শ্রমিকরা ফিরে না গিয়ে চর কালিবাড়ি এলাকায় রাস্তার পাশে অবস্থান করতে থাকেন। শনিবার রাতে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকাগামী কয়েকজন পোশাক শ্রমিক জানান, আমাদের ফোন করে বলা হয়েছে রবিবার সকাল ৭টার মধ্যে গার্মেন্টস খুলবে। সকাল ৭টার আগেই কাজে যোগদান করতে হবে। আমরা যদি সঠিক সময়ে না যাই চাকরি চলে যাবে। তাই রাতেই বাচ্চা কোলে নিয়ে টঙ্গীর পথে রওনা দিচ্ছি।

গার্মেন্টস কর্মীরা জানান, চাকরিই একমাত্র ভরসা। চাকরি না থাকলে কিভাবে চলব? তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কারখানায় যোগ দিয়েছেন। দূর-দূরান্ত থেকে শ্রমিকরা কারখানা থেকে ডাক পেয়েই গ্রাম থেকে ফিরেছেন বলে জানিয়েছেন। সামাজিক দূরত্বের তোয়াক্কা না করে রাতের আঁধারে বিভিন্ন বিকল্প পরিবহনে গাদাগাদি করে তাদের ঢাকার পথ ধরতে দেখা গেছে।

বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে বিক্ষোভ : এদিকে রাজধানীর মালিবাগে বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে পোশাক শ্রমিকরা। রবিবার সকাল ৮টা থেকে মালিবাগ চৌধুরীপাড়া আবুল হোটেলের সামনে তাহসিন ফ্যাশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা এ সড়ক অবরোধ করে। রাস্তা অবরোধ করে গার্মেন্ট শ্রমিকরা বিক্ষোভ করায় রাস্তার একপাশ বন্ধ হয়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। উজ্জ্বল নামে কারখানার এক শ্রমিক বলেন, দুই মাসের বেতন-ভাতা বকেয়া থাকলেও মালিক টাকা পরিশোধ না করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে।

এদিকে করোনার কারণে বকেয়া বেতন পরিশোধ না করায় শ্রমিকদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। যার কারণে বেতন-ভাতার দাবিতে বাধ্য হয়ে আমরা রাস্তা অবরোধ করেছি। বেতন-ভাতা পরিশোধ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলেও জানান তিনি।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj