বৃষ্টি ও শ্রমিক সংকটে ধান ঘরে তোলা নিয়ে সংশয়

সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২০

তানভীর আহমেদ : করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতিতে ধান কাটার শ্রমিক না পাওয়ায় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা সম্মিলিতভাবে কৃষকদের ধান কাটতে জমিতে নামলেও ফটোসেশন ও অধিকাংশ স্বেচ্ছাসেবক অনভিজ্ঞ হওয়ায় খুব বেশি লাভবান হচ্ছে না কৃষক। এরই মধ্যে শ্রমিক অভাব ও টানা বৃষ্টিতে কৃষকদের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আগামী পাঁচ দিন দেশের প্রায় সব এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হবে। দুপুর গড়ালে প্রায় প্রতিদিনই ঘন কালো অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে চারপাশ। দেশের কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টি হচ্ছে। মাঠে বোরো ধান কাটা শুরু হতে না হতেই জলাবদ্ধতায় ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা জেগেছে কৃষকের মনে। হাওরসহ নিচু এলাকাগুলোতে এই আশঙ্কা এখন সবচেয়ে বেশি। আর এই আশঙ্কাটা বাড়িয়ে তুলেছে করোনা ভাইরাসের কারণে দেশজুড়ে চলা লকডাউন পরিস্থিতি।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আজ ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায়, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। দেশের দক্ষিণাংশের কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ চমকানোসহ মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। বৃষ্টি, বজ্রসহ বৃষ্টি বা দমকা ঝড়ো হাওয়াসহ শিলাবৃষ্টি হলে চরম ক্ষতি হবে হাওর অঞ্চলে। এই আশঙ্কা ধান ঘরে না ওঠা পর্যন্ত হাওরবাসীর থাকবে।

হাওর অঞ্চলের সাতটি জেলার মানুষ এখন আবহাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। মেঘ গুড়গুড় করলেই তাদের কপালে ভাঁজ পড়ে যায়। একদিকে তারা ধান কাটছেন, অন্যদিকে বাকি ধান ভালোভাবে তারা ঘরে তুলতে পারবেন কিনা তা নিয়ে আতঙ্ক।

গত কয়েকদিন ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে বেশ কিছু জায়গায় ধানের ক্ষতি হয়েছে। সে কারণে হাওরবাসীর চিন্তায় এখন শুধু আবহাওয়া। তবে কোনো কোনো হাওরে ধান কাটা ৬০ থেকে ৭০ ভাগ শেষ হয়েছে। আর ৪-৫ দিন ঝড়, বৃষ্টি, শিলা না হলে তারা পুরো ধান ঘরে তুলতে পারবেন।

সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর বাজারের দক্ষিণ দিকে ফসল রক্ষাবাঁধের পাশে হাওরে কৃষক কোমর পানিতে নেমে জমির আধাপাকা ধান কাটছেন। কৃষকরা জানান, হাওরের উঁচু এলাকা থেকে নিচের দিকে পানি প্রবাহিত হওয়ায় এবং কয়েক দিনের বৃষ্টিতে তাদের জমির আধাপাকা ধান পানিতে ডুবে গেছে। এজন্য তারা ধান কেটে নিচ্ছেন।

এবার হাওর অঞ্চলে ধান ঘরে তোলার জন্য সরকারের দেয়া ধানকাটা যন্ত্র হারভেস্টার, রিপার সরবরাহ ও শ্রমিক ছাড়াও ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগও ধান কেটে কৃষকের ঘরে তুলে দিচ্ছে। এত কিছুর পর এখনো ৫৬ ভাগ ধান কাটা বাকি হাওরে। এ কারণেই কৃষকের মনে আতঙ্ক। তবে আগামী ১০ দিনের মধ্যে হাওরের ধান কাটা শেষ করা যাবে বলে আশা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের কৃষি আবহাওয়ার বিষয়ে ২২ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পূর্বাভাসে বলা হয়, এ সপ্তাহে ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক স্থানে অস্থায়ী দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ হাল্কা ধরনের (প্রতিদিন ৪ থেকে ১০ মিলিমিটার) থেকে মাঝারি ধরনের (প্রতিদিন ১১ থেকে ২২ মিলিমিটার) বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে সিলেট, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী (প্রতিদিন ২৩ থেকে ৪৩ মিলিমিটার) থেকে ভারী (প্রতিদিন ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার) বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে মাইজদীকোর্টে ৮৩ মিলিমিটার। এছাড়া স›দ্বীপে ৭২, ভোলায় ৬৯, চাঁদপুরে ৫৭, রাজারহাট ও বরিশালে ৫৩, মাদারীপুরে ৪৪, গোপালগঞ্জ ও যশোরে ৩৩, খুলনায় ৪২, ফেনীতে ৩৮, রাঙ্গামাটিতে ৩৭, সিলেটে ৩৪, হাতিয়া ও সীতাকুণ্ডে ৩২, কুতুবদিয়ায় ২৯, ডিমলায় ২৮, রংপুরে ২৭, ঢাকায় ২০, শ্রীমঙ্গলে ১৮, কক্সবাজারে ১৭, নেত্রকোনায় ১৬, নিকলিতে ১২, ফরিদপুরে ১০, পটুয়াখালীতে ৮, কুমিল্লায় ৫, তেঁতুলিয়ায় ৩ এবং চুয়াডাঙ্গা ও সৈয়দপুরে ১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।

কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের নানা উদ্যোগের ফলে হাওরের কৃষকরা ভালোভাবে ধান কাটতে পারছেন। ইতোমধ্যে ৪৪ শতাংশ ধান কেটে ঘরে তুলেছেন। অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত বা আগাম বন্যা না হলে যে গতিতে ধান কাটা চলছে, আমরা আশাবাদী হাওরের কৃষকরা সময়মতো ধান ঘরে তুলতে পারবেন।

এবার বোরো মৌসুমে সারাদেশে ৪৭ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় এবার দুই কোটি ৪ লাখ টন চালের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সারাদেশে বোরো ধান কাটার সময় এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। যারা আগাম কিছু বি-২৮ ধান লাগিয়েছেন, তারা এখন ধান কাটছেন। সারাদেশে ধান কাটার মৌসুম শুরু হতে এখনো ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগবে। তবে হাওর অঞ্চলের আগাম ধান লাগানো হয় বিধায় এ ধান আগাম পাকে। দেশের হাওরবেষ্টিত সাত জেলায় বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৭ লাখ ৪৫ হাজার টন, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২০ ভাগ।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj