সংক্রমণের নতুন হটস্পট হবিগঞ্জ : ভেষজ পদ্ধতির তাগিদ করোনা মোকাবিলায়

সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২০

অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য : প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছেই। সেইসঙ্গে বাড়ছে সংক্রমিত এলাকার পরিধিও। যুক্ত হচ্ছে সংক্রমণের নতুন নতুন হটস্পট। করোনা শনাক্ত হওয়ার ৫০তম দিনে এসে গতকাল রবিবার পর্যন্ত দেশে আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ হাজার ছুঁইছুঁই করছে। এরমধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪১৮ জনের শরীরে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের। এ নিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৫ জনে।

রাজধানী ঢাকায় এখন পর্যন্ত সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি, ২ হাজার ৪৮৫। এর পরই রয়েছে নারায়ণগঞ্জ, ৬২৫। নতুন করে আরো তিনটি জেলায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। গত কয়েকদিনে নতুন করে বেশি সংক্রমিত এলাকা হয়ে উঠেছে হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও চট্টগাম। আগের মতই গাজীপুর ও কিশোরগঞ্জে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে। গতকাল গাজীপুরে রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৩০৮ জন এবং কিশোরগঞ্জে ১৮২ জন। এদিকে করোনা মোকাবিলায় নিত্যনতুন ওষুধ ও চিকিৎসা পদ্ধতির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ চলছে বিশ^জুড়েই। বাংলাদেশেও প্রথাগত চিকিৎসার পাশাপাশি ভেষজ চিকিৎসায় জোর দেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ার থেকে একটি চিঠি জারি করে বলেছে, করোনা প্রতিরোধে চিরায়ত চিকিৎসা ব্যবস্থাকে মূলধারায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে আদা, লবঙ্গ মিশ্রিত গরম পানি, কলোজিরা ও মধু, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফলমূল গ্রহণ করলে করোনা প্রতিরোধে সহজ হতে পারে। অর্থাৎ করোনা প্রতিরোধে বর্তমান চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গে ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতিকেও কাজে লাগাতে চায় সরকার। উল্লেখ্য, শ্রীলঙ্কা ভেষজ চিকিৎসাপদ্ধতি ব্যবহার করে করোনাকে আয়ত্বের মধ্যে এনেছে বলে দেশটির সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ভারতও করোনা প্রতিরোধে ভেষজ তথা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। এরপর বাংলাদেশ এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা দিতে চিঠি জারি করল।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) ওয়েবসাইটে গতকাল রবিবার পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের যে পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে- ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর কিশোরগঞ্জের পর নতুন রুট হয়েছে হবিগঞ্জ। সেখানে গত কয়েকদিনে রোগীর সংখ্যা হয়ে গেছে ১ থেকে ৪৭। এর আগেই রোগীর সংখ্যা ৪০ পার করা জেলাগুলো হচ্ছে- ময়মনসিংহ ৯২, চট্টগ্রাম ৪৮, মুন্সীগঞ্জ ৭২, কুমিল্লা ৪১, জামালপুর ৪৫। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জেলাভিত্তিক বিশ্নেষণে নতুন রোগী আমরা যাদের দেখতে পেয়েছি, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত হয়েছে ঢাকা শহরে। এর পরই নতুন নতুন সংক্রমিত এলাকা দেখতে পাচ্ছি। এরইমধ্যে গাজীপুর, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জে দ্রুত গতিতে বাড়ছে সংক্রমণ।

করোনা ভাইরাস আক্রান্তে সিলেট বিভাগের হটস্পট এখন হবিগঞ্জ : সিলেট বিভাগে চলতি এপ্রিলের প্রথম ১০ দিন পর্যন্ত রোগী সংখ্যা ছিল হাতে গোনা ৫ জন। কিন্তু ২০ এপ্রিলের পর থেকে হবিগঞ্জে হঠাৎ করে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, হবিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার বহু নারী-পুরুষ নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্প কারখানায় কাজ করেন। সেখানে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর প্রতিদিন দলে দলে এসব শ্রমিক হবিগঞ্জ নিজ বাসস্থানে এসেছেন। এরা হোম কোয়ারেন্টাইন না মানায় এর খেসারত এখন দিতে হচ্ছে পুরো সিলেট বিভাগকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হবিগঞ্জের এক চিকিৎসক জানান, হবিগঞ্জের কয়েকটি এলাকা আছে যেখানে করোনা ভাইরাস পরীক্ষা করলে বহু আক্রান্ত পাওয়া যাবে। গত কয়েকদিনে আক্রান্তের সংখ্যা একজন থেকে ৪৭ জনে পৌঁছে যাওয়া সেই আভাসই দিচ্ছে। আক্রান্তদের মধ্যে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি, হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ ডাক্তারও রয়েছেন। এরইমধ্যে জেলার লাখাই ও চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স লকডাউন করা হয়েছে। গত রাত সাড়ে ৯টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হবিগঞ্জ সদর হাসপাতাল লকডাউনের প্রস্তুতি চলছিল। এ অবস্থার মধ্যেই হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন ইফতারসামগ্রী বিক্রি করার জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে হোটেল-রেস্তোরাঁ খোলার অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু স্থানীয়দের প্রবল প্রতিবাদে জেলা প্রশাসন সেই সিদ্ধান্তটি স্থগিত করতে বাধ্য হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিভিন্ন জেলায় সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার কারণ হচ্ছে সবকিছুইতে অব্যবস্থাপনা। চিকিৎসা নিয়ে অব্যবস্থাপনা, ত্রাণ নিয়ে অব্যবস্থাপনা। মানুষ লকডাউন মানছে না। রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব ঘটনা সংক্রমণের শঙ্কা আরো বাড়াচ্ছে। বাজারেও শত শত মানুষ সমবেত হচ্ছেন। সবকিছুই যদি স্বাভাবিকভাবে চলে তাহলে লকডাউন করার প্রয়োজন কী?

সর্বোচ্চ আক্রান্তের সংখ্যা রাজারবাগে : পরিসংখ্যান অনুযায়ী শুধু ঢাকা মহানগরেই করোনা আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৪৮৫ জন। যা সারাদেশে আক্রান্তের ৫২ দশমিক ০১ শতাংশ। এরমধ্যে রাজারবাগে সবচেয়ে বেশি ৯৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এরপরই লালবাগে ৫৯, মোহাম্মদপুরে ৫৪, বংশালে ৪৭ আর বৃহত্তর মিরপুরে ১১৯ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

রমজানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে আক্রান্তের সংখ্যা আরো বাড়বে : নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধি না মানলে অর্থাৎ ঘরে না থাকলে রমজান মাসে করোনা ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আইইডিসিআর। সংস্থাটি বলেছে, আমরা যদি সাবধানতা অবলম্বন না করি তবে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং একারণে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল সময় পার করছে। তাই ঘরে থেকেই তারাবিহর নামাজ পড়তে হবে। ইফতারও করতে হবে।

করোনায় নতুন আক্রান্ত ৪১৮, মৃত বেড়ে ১৪৫ : গত ২৪ ঘণ্টায় ৩ হাজার ৪৭৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এরমধ্যে ৪১৮ জনের শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে করোনা ভাইরাসে দেশে শনাক্ত হওয়া মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪১৬ জনে। এছাড়া করোনায় আক্রান্ত হয়ে নতুন করে মারা গেছেন আরো ৫ জন। এ নিয়ে দেশে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৫ জনে। গতকাল রবিবার দুপুরে করোনা ভাইরাস নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত অনলাইন ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা। তিনি জানান, মৃতদের মধ্যে ৩ জন পুরুষ এবং ২ জন নারী। এদের মধ্যে ৩ জন ৫১-৬০ বছর বয়সী। এছাড়া সুস্থ হয়েছেন আরো ৯ জন। ফলে মোট সুস্থ হয়েছেন ১২১ জন।

ডিসেম্বরে চীনে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেলেও বাংলাদেশে ভাইরাসটি শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। ওইদিন তিনজন করোনা ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা অনেকটাই সমান্তরাল ছিল। কিন্তু এরপর থেকে হুট করেই বাড়তে থাকে রোগীর সংখ্যা। দেশে প্রথম করোনা ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হলে বাড়ানো হয় সতর্কতা। ভাইরাসটি যেন ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য মার্চেই ব্যবস্থা নেয় বাংলাদেশ সরকার। বন্ধ ঘোষণা করা হয় সব সরকারি-বেসরকারি অফিস। সেই ছুটি বাড়ানো হয়েছে আগামী ৫ মে পর্যন্ত।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj