করোনায় মুখ থুবড়ে পড়েছে রাজস্ব আদায় : ঘাটতি মোকাবিলায় নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে সরকার

সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২০

কাগজ প্রতিবেদক : করোনা প্রতিরোধের লকডাউনে স্থবির হয়ে পড়েছে সারাবিশ্বের অর্থনৈতিক কার্যক্রম। ফলশ্রæতিতে বিশ^জুড়েই শুরু হয়েছে মন্দা। সাধারণ ছুটির আড়ালে প্রায় এক মাস ধরে বাংলাদেশেও চলছে অঘোষিত লকডাউন। তবে ওই ছুটি শুরুর আগেই দেশের রাজস্ব আহরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছিল। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। এদিকে মার্চের শুরু থেকেই পুরোপুরি লকডাউন হতে শুরু করে ইউরোপ ও আমেরিকার বেশির ভাগ দেশ, যা বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রধান বাজার। আর ২৬ মার্চ থেকে তো স্থবিরই হয়ে আছে পুরো দেশ। কলকারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় বন্ধ আছে আমদানি-রপ্তানি। শপিং সেন্টার, দোকানপাটও খোলার অনুমতি নেই। ফলে মুখ থুবড়ে পড়েছে রাজস্ব আদায়।

সূত্র জানায়, দেশ পরিচালনার সিংহভাগ অর্থের জোগান দেয় এনবিআর। রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে যা সংগৃহীত হয়। বিশ্বে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ শুরুর পর থেকেই রাজস্ব আদায় কমতে শুরু করে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ করোনা ভাইরাস ব্যাপকতা পাওয়ার আগেই ৮ মাসে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার থাবায় মার্চ ও এপ্রিলে রাজস্ব আদায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। আগামী মে-জুনেও এ থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ফলে এ বছর বাজেট ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছুঁয়ে ফেলতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশ পরিচালনায় সরকারের প্রধান খাত হচ্ছে রাজস্ব আদায়। রাজস্ব আদায়ে বিরূপ প্রভাব পড়লে সব জায়গায় এর প্রভাব পড়ে। তাই কোভিড-১৯ মোকাবিলায় অর্থায়ন নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে সরকারকে। তবে এখনো কিছু সুযোগ রয়েছে সরকারের হাতে, সরকার যদি সেইসব সুযোগ কাজে লাগায় তাহলে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সহজ হবে। এডিপি বরাদ্দ ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। সরকার চাইলে বাকি ৫০ শতাংশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রকল্প বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ খাত ছাড়া বাকিগুলো বাতিল করতে পারে। এছাড়া প্রচুর বিদেশি দাতা সংস্থা কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বাংলেদেশের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। এগুলো কাজে লাগিয়ে বাজেটের ঘাটতি মেটানো সম্ভব। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, সামনের সময়ে বাজেট ঘাটতি বাড়বে। তাই এই ঘাটতি মেটাতে সরকারের অর্থায়নের বিকল্প চিন্তা করা উচিত। ভর্তুকি বাজেটে সরকার সাশ্রয় করতে পারে। কারণ ইতোমধ্যে এক্সপোর্ট নেগেটিভে চলে আসছে। তাই ভর্তুকির অর্থ সরকারের সাশ্রয় হবে। এছাড়া বিদেশি ঋণের সুদ এক বছর স্থগিত রাখতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে আবেদন করতে হবে। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের যে ক্যাপসিটি চার্জ দেয়া হয়, তা আপাতত স্থগিত করতে পারে, আন্তর্জাতিক আইন মেনে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ভোরের কাগজকে বলেন, ইতোমধ্যে সরকার এডিপির কিছু প্রকল্পের দেশীয় অর্থায়ন সরানোর একটা উদ্যোগ নিচ্ছে। যা খুবই ইতিবাচক। এই সময়ে সরকারে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, করোনা পরবর্তী বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এগোতে পারে। সেক্ষেত্রে যেসব প্রকল্প এই সময় না হলেও চলবে এসব জায়গা থেকে সরে আসা উচিত। আর এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আগামী বাজেট ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করতে পারে সরকার। এছাড়া বৈদেশিক উৎস থেকে আসা অর্থায়ন করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে কাজে লাগানো উচিত। এভাবেই ঘাটতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj