করোনা মোকাবিলায় দায়িত্বশীল আচরণ সবারই সবার স্বার্থে

সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২০


এটি এখন বাস্তবতা যে করোনা ভাইরাস বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মানুষকে আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্ক আশঙ্কায় ফেলেছে, যা অতীতে কখনো এমন কোনো দৈবদুর্বিপাক, মহামারি বা দুর্যোগ এভাবে মানুষকে এতটা ভয়ের কাতারে বাঁধতে পারেনি। মানুষের মাধ্যমে ভয়ানক প্রকৃতির এই ভাইরাস সংক্রমিত হয় বলে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির এবং সামাজিক সংযোগ শুধু নিষিদ্ধই হচ্ছে না, করোনায় আক্রান্তের প্রতি সহানুভূতি ও চিকিৎসাসেবা দেয়ার ব্যাপারটিও স্পর্শকাতরতার কাদায় মাখামাখি হয়ে মানবতার প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যে যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন করোনার ভয় সবাইকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ব্যক্তি স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য করোনা যেমন ভয়াল প্রতিপক্ষ, মানুষের জীবন-জীবিকা তার আর্থ-সামাজিক অবস্থান, দেশ ও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য করোনা ব্যাপক হুমকি প্রতীয়মান হচ্ছে। পুঁজিবাদ, বিশ্বায়ন, মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারণা এবং এমনকি মেকি গণতন্ত্র অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে বলে পণ্ডিতরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। তাই সবার উপলব্ধিতে আসছে- মহামারি করোনা যেন যুগ যুগ ধরে মানবতার অবমাননা, বৈষম্য, লোভ, লালসা, মিথ্যাবাদিতা ও অহমিকার যে পাপাচার বিশ্বকে গ্রাস করছিল তার সমুদয় দূর করতে গোটা বিশ্বময় একটা প্রবল ঝাঁকুনি দিতেই এসেছে, আত্মশুদ্ধি ও অনুশোচনার শিক্ষা নিয়ে শুধু দুহাতকে নয়, বিবেককে বারবার ধৌত করার দায়িত্বশীল আচরণের চেতনা জাগ্রত হচ্ছে।

করোনার উৎস, অতি সংক্রমণের প্রসার, প্রসার প্রতিরোধ এবং ব্যাপক প্রাণহানির প্রেক্ষাপট নিয়ে বিশ্ব শক্তিসমূহের মধ্যে কোনো ঠাণ্ডা যুদ্ধ পরিস্থিতি আছে কিনা, মানবিক বিপর্যয় রোধে তাদের কারো কারো দৃশ্যমান ব্যর্থতার পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য বা অভিসন্ধি আছে কিনা তা নিয়ে সমাজ, অর্থ ও রাজনীতি বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে কানাঘুষা শুরু করে দিয়েছেন। মার্কিন ভাষাতত্ত্ববিদ-দার্শনিক নোয়াম চমস্কি এই সেদিন সোজাসাপ্টা বলেই ফেলেছেন ‘চীনের বাইরে দেশগুলোর কাছে করোনার ভয়াবহতার তথ্য আগে থেকে থাকা সত্ত্বেও (‘ঘড়ঃযরহম ধিং ফড়হব. ঞযব পৎরংরং ধিং ঃযবহ সধফব ড়িৎংব নু ঃযব ঃৎবধপযবৎু ড়ভ ঃযব ঢ়ড়ষরঃরপধষ ংুংঃবসং ঃযধঃ ফরফহ’ঃ ঢ়ধু ধঃঃবহঃরড়হ ঃড় ঃযব রহভড়ৎসধঃরড়হ ঃযধঃ ঃযবু বিৎব ধধিৎব ড়ভ’.) রাজনৈতিক ভেদবুদ্ধির ফেরে কিছুই করা হয়নি, নইলে করোনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেত।’

সবাইকে সচেতনভাবে, দায়িত্বশীলতার সঙ্গে প্রতিরোধমূলক যা যা উপায় অবলম্বন করা দরকার তাতে শামিল করতে পারলেই করোনার ব্যাপক বিস্তার রোধ ও ক্ষয়ক্ষতি কমানো বা থামানো যাবে। করোনা সংক্রমণ ঠেকাবার সংগ্রামে ব্যর্থতা মানে মানবিক বিপর্যয়- যেমন ঘটেছে চীনে, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্রে। এরা সবাই উন্নত বিশ্ব, সংক্রমণ ঠেকানোর সক্ষমতা সরঞ্জাম অর্থ তাদের আছে তা সত্ত্বেও। বাংলাদেশে আগত প্রবাসীরা প্রযোজ্য কোয়ারেন্টাইন পরিপালন ছাড়া সমাজের সঙ্গে মিশে যাওয়ায়, সময়মতো লকডাউন না করে ‘ছুটিতে’ দলবেঁধে বাড়ি যাওয়া-আসার সুযোগ থেকেই ‘সামাজিক দূরত্ব’ সৃষ্টির মতো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কর্মসূচিতে কঠোর হতে হচ্ছে ক্রান্তিকালে। এর আগে ‘পূর্ব প্রস্তুতি না থাকায়’ আক্রান্ত চিহ্নিতকরণে পরীক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থার অপ্রতুলতায় সংক্রামকদের শনাক্তকরণে বিলম্ব ঘটেছে। যথাসময়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা সামগ্রী নিশ্চিত না হওয়ায় ইতোমধ্যে রোগীর চিকিৎসাসেবা শুশ্রƒষা ও সমানুভূতি সহানুভূতি পাওয়ার এমনকি মৃত্যুর পর সমাহিত হওয়ার সার্বজনীন অধিকার বঞ্চিত হওয়ার ভয় তৈরি হওয়ায়, করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পরীক্ষা করা বা করানোয় অনীহা, রোগীর তথ্য প্রকাশ না করার প্রবণতা বিদ্যমান থাকায় অত্যন্ত ছোঁয়াচে করোনা ভাইরাস সংক্রমণেরই বিস্তার ঘটার ভয় বেড়েই চলেছে। সংক্রমিত রোগী শনাক্তকরণ পদ্ধতিকে ব্যাপক, গণমুখী ও সহজসাধ্য করা, সম্ভাব্য সংক্রমণকারীদের কর্তৃপক্ষীয় কঠোর কোয়ারেন্টাইনে, আইসোলেশনে এবং গণচিকিৎসা সেবাদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষীয় দায়িত্বশীলতার অনিবার্যতা দেখা দিয়েছে।

করোনায় মানসিক সুস্থতা অতীব জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন পরিবেশ থেকে মানবিক আচরণ। দেশে-বিদেশে করোনা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা ও ক্ষয়ক্ষতির বেহাল চিত্র দেখে আস্থাহীনতায় আতঙ্ক, আশঙ্কা বেড়েই চলেছে যা মানসিক অশান্তির কারণ। এ সময় মানসিক শান্তি বা মনের বল করোনার মতো ভয়াবহ মহামারি মোকাবিলার জন্য জরুরি। চীনের বাইরে বাংলাদেশসহ অনেক দেশে যথাসময়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ ও তৎপরতায় বিলম্ব ঘটায়, ক্ষেত্রবিশেষে সমন্বয়হীনতা দৃশ্যমান হয়ে ওঠায় আস্থার সংকট তৈরি হবে না যদি কঠিন বাস্তবতায় করোনা মোকাবিলায় গৃহীত ব্যবস্থার স্বচ্ছতায় ও আন্তরিক প্রয়াস প্রচেষ্টায় উন্নতি দৃশ্যমান হয়। কাণ্ডারীকে হুঁশিয়ার করে দিতে নজরুলের ছিল সেই আহ্বান, ‘ওরা হিন্দু না মুসলিম? এই জিজ্ঞাসে কোন জন? কাণ্ডারী বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার’। গৃহীত সব পদক্ষেপে, খাদ্য সাহায্য বিতরণ ও আর্থিক প্রণোদনা বণ্টন বিতরণে দুর্নীতি, পক্ষপাতিত্ব বা বিচ্যুতির পরিবর্তে সবাইকে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে আস্থা ও জাতীয় ঐক্য গড়া প্রয়োজন।

প্রাচীনকাল থেকেই দেশকাল পাত্রভেদে মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে আসছে। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন করতে সবার ভালোর জন্য জোরেশোরেই চলছে ‘সামাজিক দূরত্ব’ তৈরির কর্মসূচি। এটিকে ছোঁয়াচে রোগ করোনার বিস্তৃতি প্রতিরোধের মোক্ষম উপায়ও। কিন্তু মনে রাখতে হবে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী মহামারি নিয়ন্ত্রণে, মানুষকে উদ্ধারে সামাজিক সংহতির ভূমিকাই অগ্রগণ্য। ১৮৪৪ সালে কুষ্ঠ রোগীদের পরিবার ও সমাজ বিচ্ছিন্ন করে দ্বীপান্তরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ক্যানাডার পূর্ব উপক‚লীয় রাষ্ট্র নিউ ব্রান্সউইক। ইতিহাসের পাতায় রয়েছে দারুণ অমানবিক অনুরূপ অনেক ঘটনা। করোনা বিশ্বমানবতাকে, সে রকম একটা সংকটের সামনে দাঁড় করিয়েছে।

চীনের মতো একটি ‘নিয়ন্ত্রিত সমাজ সংস্কৃতি ও অর্থনীতির বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পুঁজিবাদী-ভোগবাদী উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক অ্যাডাইসিভ মিশ্রিত রাজনীতির রসে ভরা স্থ‚ল (অবিস) সমাজ ও পেট মোটা অর্থনীতিতে কিংবা ইতালি স্পেন ফ্রান্সের মতো তথাকথিত ওয়েলফেয়ার সমাজে পানপ্রিয় জাতির কাছে সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি একই আবেদন বা অবদান রাখতে পারে না। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষীয় সংস্কৃতিতে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি ও সামাজিক বন্ধনরীতি যেখানে সুদৃঢ়। করোনা মোকাবিলায় আক্রান্তের সেবা শুশ্রƒষায় চিকিৎসাকর্মীর সমানুভূতি, পারিবারিক নৈকট্য, সামাজিক সহানুভূতি যেখানে বিশেষ টনিক হিসেবে কাজ করবে। গোটা পরিবার এমনকি পাড়া-প্রতিবেশীকে নির্বাসনে (কোয়ারেন্টাইন) নিয়ে সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য রোগীকে একঘরকরণের (আইসোলেশন) সামাজিক ভয় না ঢুকিয়ে বরং সবাইকে ‘প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ এ ধরনের উপলব্ধিজাত সহানুভূতি সমাদরের হেতুতে যদি পরিণত করানো যায় তাহলে ভয় ও দুশ্চিন্তা কেটে যাবে। শ্রমজীবী প্রবাসীরা দেশের জন্য রেমিট্যান্স আনেন, তারা দেশের সম্পদ বিদেশে নিয়ে যান না, তারাই বরং বিদেশের সম্পদ দেশের জন্য আনেন অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করে। করোনার ক্রান্তিকালে কর্মহীন হয়ে করোনার হাত থেকে বাঁচার তাগিদে মৌলিক অধিকারে তারা দেশে স্বজনের কাছে ফিরেছেন, কিন্তু দেশে পৌঁছিয়েই তাদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় বাধ্যতামূলক ‘কোয়ারেন্টাইনে’ রাখার স্বাগত সান্ত¡নার পরিবেশে পর্যাপ্ত ও প্রযোজ্য প্রযতœ দেয়া হলে তারা কোয়ারেন্টাইন এড়িয়ে সবার মাঝে মিশে যেতে পারতেন না, পরে ‘অপরাধী’ সাব্যস্ত হয়ে জরিমানা গুনতে হতো না। এখনো দেশ-বিদেশ থেকে আগতদের খুঁজে বেড়াতে হচ্ছে, তাদের বাসায় বাড়িতে লাল পতাকা টাঙিয়ে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে, আক্রান্তদের এলাকা লকডাউন করতে হচ্ছে। করোনায় সংক্রমিত হওয়ার সন্দেহে এবং প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তাকে কার্যকর করতে সবাইকে সরকারি খরচে আলাদা থাকা খাওয়া ও ‘একঘরে’ হয়ে অবস্থানের ব্যবস্থাসহ চিকিৎসা নিশ্চিত করলে সেটিই মানবিক ও সামাজিকভাবে যৌক্তিক। চীন চটজলদি হাজার হাজার বেডের হাসপাতাল তৈরি করেছিল করোনা প্রতিরোধের জন্য। স্বাস্থ্য ও জীবিকা পরস্পরের হাত ধরে চলে। তাই করোনা মহামারি থেকে জনগণকে রক্ষায় স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে হবে। এখানে দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘ওরা’ না ‘আমরা’ এর পরিবর্তে সবাই মিলে ‘আমরা’ বা ‘আমাদের’ হওয়া বাঞ্ছনীয়।

করোনায় মৃত্যু হয়েছে কিনা মৃত্যুর পর তার পরীক্ষা করা এবং তার ভিত্তিতে তার পরিবার এমনকি তার গ্রামকে লকডাউন করা, তার স্বাভাবিক জানাজা ও দাফন কাফন নিয়ে বিতর্ক ও ভয় তৈরি হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। এখন জানা গেছে করোনায় মৃত ব্যক্তির থেকে ভয় নেই জীবাণু ছড়ানোর।

প্রাণঘাতী ভাইরাস করোনাকে স্বাস্থ্যগত সমস্যা ও সংকট হিসেবে দেখার ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই, কিন্তু করোনার অভিঘাত মূলত যে অর্থনীতিতে সে বিষয়টি দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। করোনার জন্ম ও বিকাশের এবং বিশ্বব্যাপী আঘাতের মূল প্রেরণা যে অর্থনৈতিক মোড়লিপনার খাত ও ক্ষেত্র দখল, পুঁজিবাদ ও বিশ্বায়ন-মুক্তবাজার ব্যবস্থায় চপেটাঘাত, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পথ পরিষ্কার করা এবং নব্য সামন্তবাদী পরাশক্তির উদ্ভব তা বুঝতে আর সময় নিচ্ছে না।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj