আশাবাদী গণস্বাস্থ্য : র‌্যাপিড টেস্টের পক্ষে-বিপক্ষে মত

রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২০

সেবিকা দেবনাথ : কোভিড-১৯ মোকাবিলায় শুরু থেকেই ব্যাপক হারে নমুনা পরীক্ষার ওপর জোর দিয়ে আসছেন বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিশেষজ্ঞরা। নিজেদের এমন বক্তব্যের পক্ষে তাদের যুক্তি হলো- নমুনা পরীক্ষা বাড়ানোর মধ্য দিয়ে কমিউনিটি সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব। সেই সঙ্গে কমানো সম্ভব হাসপাতালে রোগীদের ভোগান্তি। নিশ্চিত করা সম্ভব স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষাও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সারা বিশে^ কোভিড-১৯ শনাক্তে দুই ধরনের ল্যাবরেটরি পরীক্ষা অনুমোদন করেছে। একটি নাসারন্ধ্রের শ্লেষ্মা বা মুখগহŸরের লালা বা কাশির নমুনা নিয়ে আরটিপিসিআর (রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টজ পালিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন) পদ্ধতিতে ভাইরাসের আরএনএ শনাক্ত। অন্যটি হলো রক্তের নমুনা নিয়ে সেরোলজি বা আইজিএম এবং আইজিজি (ওমএ) এন্টিবডি নির্ণয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অবশ্য পিসিআর টেস্টের ওপর জোর দিয়ে আসছে। এর কারণ হিসেবে সংস্থাটির যুক্তি হচ্ছে, কেউ কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিসিআর টেস্ট করলে এর সঠিক ফলাফল পাওয়া যাবে। কিন্তু এন্টিবডি পরীক্ষা করালে সাতদিনের মধ্যে এর ফলাফল নেগেটিভ আসবে। তাই এর কোনো গুরুত্ব নেই। কিন্তু এর ভালো দিক হচ্ছে, এর মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে কত মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যেই সুস্থ হয়ে গেছেন অথবা সুস্থ হওয়ার পথে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত আরটিপিসিআর পদ্ধতিতে করোনা শনাক্ত চলছে। এ প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়লেও এখনো তা ব্যাপক হারে করা সম্ভব হয়নি। তাই এখন র‌্যাপিড এন্টিবডি টেস্টের ওপর জোর দিচ্ছেন অনেকে।

র‌্যাপিড টেস্ট কী : গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, র‌্যাপিড টেস্ট কোভিড-১৯ নির্ণায়ক কোনো টেস্ট নয়। যে কোনো ভাইরাস শরীরে আক্রমণ করলে, মানুষের দেহে সেই ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করার জন্য নিজে থেকেই তৈরি হয় প্রতিরোধী ক্ষমতা। বিজ্ঞানীরা যাকে এন্টিবডি বলে। চিকিৎসকদের মতে, যেসব এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি তেমন রেড জোনের বাসিন্দার র‌্যাপিড টেস্ট করলে জানা যাবে, ওই ব্যক্তির দেহে এন্টিবডি তৈরি হয়েছে কিনা। একটি বিশেষ এন্টিবডির অস্তিত্ব পাওয়া গেলে ধরে নেয়া হবে ওই ব্যক্তির শরীরে সংক্রমণ হয়েছে। তাই চিকিৎসকরা এই পদ্ধতিকে সম্ভাব্য কোভিড আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্তে একটি বাছাই পর্ব বা স্ক্রিনিং বলে দাবি করেছেন।

যেভাবে হয় এই টেস্ট : এই জন্য প্রয়োজন প্রেগন্যান্সি টেস্টের মতোই এক ধরনের ছোট্ট কিট। স্বাস্থ্যকর্মীরা ব্যক্তির হাতের আঙুল থেকে কয়েক ফোঁটা রক্ত সংগ্রহ করবেন এবং ওই কিটে প্রয়োগ করবে। এরপর নির্দিষ্ট একটি রাসায়নিক প্রয়োগ করা হবে। ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই পাওয়া যাবে ফলাফল। দ্রুত ফলাফল পাওয়া যায় এবং পরীক্ষার পদ্ধতি সহজ বলে সংক্রমণ বন্ধে এই পরীক্ষা কার্যকরী বলে বিজ্ঞানীদের দাবি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে তিন ধরনের স্ট্রেইন দিয়ে সংক্রমণ চলছে। কোন দেশে কোন কোন স্ট্রেইন দিয়ে সংক্রমণ চলছে তা বোঝার জন্য অবশ্যই জিনোম সিকুয়েন্স করে নির্ণয় করতে হবে। এরপর সেই জিনোম সিকুয়েন্সের পাওয়া রেজাল্টের ওপর ভিত্তি করে এন্টিবডি টেস্টিংয়ে কিট তৈরি করতে হবে। সে জন্য চীন কিংবা অন্যান্য দেশ থেকে বাংলাদেশে আসা র‌্যাপিড এন্টিবডি টেস্টের কিটের ব্যবহার সফল নাও হতে পারে। তবে তারা বলছেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আশার কথা দেশে জিনোম সিকুয়েন্সের ভিত্তিতে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র এন্টিবডি টেস্টিংয়ের জন্য ‘জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্লুট’ নামে কিট তৈরি করেছে। ফলে এর সফলতা অনেকটাই বেড়ে যাবে।

‘গণস্বাস্থ্য র‌্যাপিড ডট ব্লুট’ আবিষ্কারক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী ড. বিজন কুমার শীলের দাবি তাদের উদ্ভাবিত কিট অন্যদের চেয়ে আলাদা ও ইউনিক। তিনি বলেন, আমাদের এই কিটের বৈশিষ্ট্য হলো, এটা কোনো পজেটিভ কেসকে বাদ দেবে না। এটাই মূল সাফল্য। কারণ টেস্টে পজেটিভ কেস বাদ পড়লে করোনা ছড়িয়ে পড়ে। আর অন্যান্য র‌্যাপিড কিটে ব্লুাড দিয়ে করে। আমাদেরটা হলো ডট ব্লুট। রক্তের সিরাম থেকে করা হয়। খুবই সেনসিটিভ এবং ১৫ মিনিটে ফল পাওয়া যাবে। করোনার কারণে মানুষ এখন আতঙ্কিত। আর আতঙ্ক মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। আমাদের আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে হবে।

আর নিজের প্রতিষ্ঠানের কিটের ফলাফল ওয়ান্ডারফুল বলে মন্তব্য করেছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার গণস্বাস্থ্যকে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত সরবরাহ করা হয়। আমাদের উদ্ভাবিত কিট পরীক্ষায়ও যার ফলাফল পজেটিভ এসেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, কোভিড-১৯ শনাক্তকরণে দুই ধরনের টেস্টের মধ্যে আরটিপিসিআর সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দ্বারা সমর্থিত। এ পদ্ধতিতে ভাইরাল আরএনএ পজিটিভ হলে তা শতভাগ কোভিড-১৯ সংক্রমণ নিশ্চিত করে। অন্যদিকে র‌্যাপিড টেস্টের সফলতা মাত্র ৫ থেকে ৩০ শতাংশ। ব্যক্তি করোনায় সংক্রমিত থাকা সত্ত্বেও ফলস নেগেটিভ রেজাল্ট আসতে পারে। এটি একটি বড় সমস্যা। তবে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র যে কিট উদ্ভাবন করেছে সেটি যদি সরকার অনুমোদন দেয় তবে আক্রান্তদের শনাক্তে আমরা তাদের কিট ব্যবহার করতে পারব।

করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্তে দেশে র‌্যাপিড টেস্টের পক্ষে মত দেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, এই পদ্ধতির মাধ্যমে আমরা যদি আক্রান্তদের শনাক্ত করতে পারি তাহলে পরবর্তীতে পিসিআর পরীক্ষার মাধ্যমে তারা করোনা আক্রান্ত কিনা সেটি নিশ্চিত হতে পারব। র‌্যাপিড টেস্টে ‘ফলস নেগেটিভ’ রেজাল্ট আসতে পারে এই কথাটি অনেকেই বলে থাকেন। আমি বলতে চাই পিসিআর টেস্টের ক্ষেত্রেও এই একই রেজাল্ট আসতে পারে। আমাদের উচিত এখন বেশি বেশি রোগী শনাক্ত করা। আর র‌্যাপিড টেস্টের মাধ্যমেই তা সম্ভব।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সীর মতে, দেশে এখন হয়তো ১০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষের শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে তা পরীক্ষা না করে বলা যাবে না। এর জন্য পরীক্ষা করা জরুরি। তবেই বোঝা যাবে দেশে এন্টিবডি পজিটিভ কতজন রয়েছেন। তবে এ জন্য ভালো মানের এন্টিবডি টেস্ট দরকার।

র‌্যাপিড টেস্টের পক্ষে মত দিয়েছেন নর্দার্ন ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. বুশরা তানজীম। তিনি মনে করেন, বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রচলিত দুধরনের টেস্টই শতভাগ সফল বা ব্যর্থ নয়। কিছু সুবিধা এবং অসুবিধাও এই দুধরনের টেস্টের ক্ষেত্রেই রয়েছে। বাংলাদেশে করোনা শনাক্তকরণ শুধু আরটিপিসিআর টেস্টের মাধ্যমেই হচ্ছে। যা দেশের প্রায় ১৭-১৮ কোটি জনগণের জন্য খুবই অপ্রতুল। তিনি বলেন, ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের বাজারগুলোতে প্রতিদিনই প্রচুর মানুষের সমাগম হচ্ছে। এতে করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত আক্রান্তদের টেস্টের সুবিধা আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। তাদের অনেকের লক্ষণ দেখা দিলেও বাড়িতে চিকিৎসা নিয়ে ভালো হয়ে যাচ্ছেন। কেউ বা করোনার লক্ষণ নিয়ে মারা গেলেও থেকে যাচ্ছে হিসাবের বাইরে। এই সমস্যার সমাধানে গ্রামেই করোনার টেস্ট চালু করা দরকার এবং তা শুধু র‌্যাপিড টেস্টের মাধ্যমেই সম্ভব। এছাড়া বেশিরভাগ ল্যাবরেটরিগুলোতে যেখানে করোনা টেস্ট হচ্ছে সেখানে রোগীর উপসর্গের মধ্যে জ্বর, কাশি থাকলেই টেস্ট হচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগ সাধারণ জনগণের মধ্যে উপসর্গহীন ব্যক্তি কিংবা জ্বর ছাড়া করোনার অন্যান্য উপসর্গ থাকলেও তারা টেস্ট করার সুযোগ পাচ্ছেন না। কাজেই প্রতিদিন করোনা আক্রান্তের যে তথ্যটা পাচ্ছি সেটি দেশের প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাচ্ছে না। এসব সমস্যা রোধে র‌্যাপিড টেস্টের কোনো বিকল্প নেই।

তবে দেশে করোনা প্রাদুর্ভাব শুরু থেকেই র‌্যাপিড টেস্টের বিপক্ষে মত দিয়ে আসছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা এবং সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোস্তাক হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, এই টেস্টের মাধ্যমে ‘ফলস রেজাল্ট’ আসে। এই পদ্ধতি বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থাও অনুমোদন করেন না। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা যা অনুমোদন করে না তা আমরা অনুমোদন করি না। বিশে^র কয়েকটি দেশ যেমন ভারত, সুইডেন, ফ্রান্স এই পদ্ধতি চালু করলেও তারা সবাই তা বন্ধ করে দিয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায় এটি কোনো সফল পদ্ধতি নয়।

দেশের দুর্যোগপূর্ণ এই সময়ে কিট উদ্ভাবন করায় গণস্বাস্থ্যকে ধন্যবাদ জানান এই রোগতত্ত্ববিদ। তিনি বলেন, বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সরকার যদি গণস্বাস্থ্যের উদ্ভাবিত কিটকে অনুমোদন দেয় তবে সেটি অবশ্যই আমাদের দেশের জন্য গর্বের। এতে আমরা উপকৃতই হব।

বিখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহরও একই মত। তবে তিনি মনে করেন এই টেস্টে কোনো ক্ষতি নেই। মানুষের দেহে এন্টিবডি আছে কিনা তা দেখা যেতেই পারে। কিন্তু এন্টিবডি কোনো ‘ডায়াগনস্টিক টুল’ না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইইডিসিআরের এক কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেন, পিসিআর পদ্ধতিতেও অনেক সময় ভুল রিপোর্ট আসে। দক্ষ টেকনিশিয়ান দিয়ে এই পরীক্ষাটি না করা হলে ভুল রেজাল্টও আসে। করোনা টেস্ট না হওয়ার চেয়ে ভুল টেস্ট অনেক বেশি ভয়ঙ্কর।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj