নিম্নমানের মাস্ক ও পিপিইর মাশুল দিচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা!

রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২০

** সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের একটি মহলের প্রশ্রয়ে অসাধুচক্র এই দুর্নীতিতে জড়িত **

কাগজ প্রতিবেদক : কোভিড-১৯ আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবায় জড়িতদের এন-৯৫ মাস্কসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) ব্যবহার বাধ্যতামূলক বলে শুরু থেকেই বলে আসছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা। করোনা থেকে বাঁচতে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বেড়েছে মাস্কের ব্যবহার। ব্যাপক চাহিদার সুযোগ নিয়ে নামি-দামি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামে মানহীন, নকল মাস্ক ও পিপিই নিয়ে চলছে অমানবিক ব্যবসা। সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের শক্তিশালী একটি মহলের প্রশ্রয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করেছে নকল ও নি¤œমানের মাস্ক। এরই মধ্যে জেএমআই নামে একটি প্রতিষ্ঠান সরকারকে নকল মাস্ক সরবরাহ করে চিকিৎসাকর্মীদের চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এই মাস্ক কেলেঙ্কারির তদন্তের নির্দেশও দিয়েছে সরকার।

দেশে করোনা পরিস্থিতির শুরুর দিকে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের বাজার থেকে মাস্ক কিনে ব্যবহার করতে হয়েছে, যা তাদের করোনা ঝুঁকিতে ফেলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাইরাস প্রতিরোধের ক্ষমতা অনেক মাস্ক রাখলেও এন-৯৫ বা তার সমমানের মাস্কে যে কাপড় ব্যবহার করা হয় তা অনেক ধরনের ভাইরাস থেকে রক্ষা করে। চিকিৎসকদের যদি আসল এন-৯৫ মাস্কের সরবরাহ নিশ্চিত না করা যায় তাহলে স্বাস্থ্য খাতের প্রস্তুতি যতই থাকুক না কেন তা কোনো কাজেই আসবে না। যারা সেবা দেবে তাদের ঝুঁকিতে ফেলে শেষ রক্ষা হবে না।

বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ) তথ্য অনুযায়ী দেশে এই পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ২৮৭ জন চিকিৎসক। নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীসহ এ সংখ্যা ৫শরও বেশি। চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের অভিযোগ, এন-৯৫ মাস্কের নামে তাদের যা দেয়া হয়েছে তাতে ধুলা কিছু আটকালেও কোনো ভাইরাস আটকাবে না। খালি চোখে দেখলেও বোঝা যায় ওই মাস্ক পুরোপুরি ভুয়া। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যে কয়েকজন চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তাদের প্রায় সবাই আক্রান্ত হয়েছেন নি¤œমানের মাস্ক ব্যবহার করে রোগীর সেবা দেয়ায়। বিডিএফের প্রধান সমন্বয়ক ডা. নিরুপম দাশ জানান, মানসম্মত পিপিই ও মাস্ক না দেয়ায় একের পর এক চিকিৎসক করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন। এতে অন্যান্য চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীসহ রোগীরাও সংক্রমিত হবেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুুক শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসক ভোরের কাগজকে বলেন, কেন্দ্রীয় ওষুধাগার (সিএমএসডি) থেকে সারাদেশে যেসব পিপিই ও মাস্ক সরবরাহ করা হয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই গুণগত মানসম্পন্ন নয়। এসব সুরক্ষা সামগ্রী পরে স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেকে নিরাপদ ভেবে চিকিৎসা দিতে গিয়ে নিজেরাই আক্রান্ত হচ্ছেন। এন-৯৫ মাস্ক নিয়ে যে সমস্যার তৈরি হয়েছে তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে যুক্ত হয়ে স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন সিএমএসডি পরিচালক। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় শুধু বাংলাদেশ নয়; বিশে^ই এন-৯৫ মাস্কের সংকট রয়েছে। খুব শিগগিরই এক লাখ মাস্ক আনা হবে। এ কথার মানে কী? তার মানে এতদিন আমাদের যে সব মাস্ক দেয়া হয়েছে তা এন-৯৫ মাস্ক নয়। সরকারের পক্ষ থেকেই যখন স্বীকার করা হয়েছে তখন তো আর বলার কিছু থাকে না। এখন তাহলে যারা নি¤œমানের মাস্ক সরবরাহ করে এন-৯৫ বলে চালিয়ে আমাদের চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে, তাদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হোক। কিন্তু সে লক্ষণও তো দেখছি না।

এর আগে যখন এন-৯৫ মাস্কের ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে তখন এই সিএমএসডি পরিচালক মাস্ক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে নোটিস করার কথা জানান। জেএমআই নামের ওই প্রতিষ্ঠানটি একটি ব্যাখ্যা দিয়ে বলে, ভুলবশত তারা এন-৯৫ মাস্কের বাক্সে সাধারণ মাস্ক সরবরাহ করেছে। তবে সাধারণ মাস্কের মূল্যই নেয়া হয়েছে। জানা যায় দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানই এন-৯৫ মাস্ক তৈরির অনুমতি পায়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে দেশব্যাপী কয়েক লাখ পিপিই বিতরণের যে হিসাব দেয়া হয় তাও সত্য নয় বলে অভিযোগ করেন চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা। কেননা অনেক হাসপাতালের পিপিইর মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী জানান, সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় সারাদেশে ১১ লাখেরও বেশি পিপিই বিতরণ করা হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে চিকিৎসক, নার্সসহ মোট ৮৫ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী কর্মরত আছেন। সরকার যে হিসাব দিচ্ছে তাতে একেকজন স্বাস্থ্যকর্মীর ১২/১৩ সেটেরও বেশি পিপিই পাওয়ার কথা। কিন্তু তা তো তারা কেউ পায়নি। এসব পিপিই কাদের দেয়া হয়েছে তা খুঁজে বের করা প্রয়োজন। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, রোগীদের সেবা দেয়ার জন্য চিকিৎসকদের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত না করে তাদের ওপর সব কিছুর দায় চাপানো হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুুক স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের এক নেতা ভোরের কাগজকে বলেন, করোনা চিকিৎসায় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের ব্যর্থতার মাশুল দিতে হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীদের। অথচ বেসরকারি হাসপাতাল মালিক ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরকার কিছুতেই পেরে উঠছে না। বেসরকারি হাসপাতাল মালিক কর্তৃপক্ষ সরকারের পাশে আছে বললেও তারা এই দুর্যোগকালীন সময়ে গা বাঁচিয়েই চলছে। বসুন্ধরা, আকিজ গ্রুপসহ বিভিন্ন গ্রুপ এবং বেসরকারি হাসপাতাল মালিক কর্তৃপক্ষ কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতাল নির্মাণ করছে। কিন্তু এসব হাসপাতালের কাজ কবে শেষ হবে তা বলা মুশকিল।

এনজেন্ডার হেলথ বাংলাদেশের দেশীয় কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ডা. শেখ নাজমুল হুদা ভোরের কাগজকে বলেন, এসব নি¤œমানের মাস্ক ও পিপিইর কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে স্বাস্থ্যকর্মীদের। এর মধ্যে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে যে নার্সরা কাজ করছেন তাদের অবস্থা করুণ। করোনা আক্রান্ত ওই নার্সদের দায়িত্ব নিচ্ছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। দেখা গেছে, যারা করোনা আক্রান্তদের সেবা দিয়েছে তাদের চেয়ে যারা সাধারণ রোগীর সেবা দিয়েছে তারাই করোনাতে বেশি সংক্রমিত হয়েছেন। এর কারণ হচ্ছে করোনা চিকিৎসায় যারা সরাসরি জড়িত তাদের যতটা গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সাধারণ রোগীদের যারা সেবা দিচ্ছেন তাদের তেমন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। এটি ঠিক নয়। সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা নেয়ার পর তাদের নমুনা পরীক্ষা করে জানা যাচ্ছে তারা করোনা আক্রান্ত। তাই মানসম্মত পিপিই ও এন-৯৫ মাস্ক সব স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য নিশ্চিত করতে হবে।

এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ এবং সিএমএসডি পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহর সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেন, আমাদের বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আছে। বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রীও বলেছেন, করোনা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য কারো বক্তব্য বা বিবৃতি গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj