আগাম বন্যার শঙ্কা : সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটা শুরু

রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২০

জাকির হোসেন, সুনামগঞ্জ থেকে : আগাম বন্যার শঙ্কার মধ্যে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। তবে মাড়াই ও ধান শুকানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষক। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে ধান মাঠেই নষ্ট হওয়ার শঙ্কায় দিন কাটছে কৃষকের। এদিকে ধান দ্রুত কাটার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে কৃষিশ্রমিকদের উৎসাহ দেয়া হচ্ছে।

হাওরাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জের একমাত্র ফসল বোরো ধান কাটতে কৃষিশ্রমিকের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও নেমেছেন। পাকা ধান ঘরে তোলার যুদ্ধে নেমেছেন লাখো মানুষ। জেলার বাইরে থেকে প্রায় ১৭ হাজার শ্রমিক আসায় ভালোভাবেই এগিয়ে চলেছে ধান কাটার কাজ। তবে ব্রি ২৮ জাতের ধান পুরোদমে কাটা শুরু হলেও ব্রি ২৯ জাতের ধান এখনো আধা পাকা অবস্থায় রয়েছে। এসব ধান কাটতে আরো সপ্তাহখানেক সময় লাগবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী ২৬ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে। বাড়বে সুরমা নদীর পানি। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক।

সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলার হাওরে এবার বোরোর আবাদ হয়েছে দুই লাখ ১৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ লাখ টন। আবহাওয়া দপ্তরের খবর অনুযায়ী ২২ থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত ২২০ মিলিলিটার বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা। ইতোমধ্যে শুরুও হয়েছে বৃষ্টিপাত। বৃষ্টি শুরু হওয়ায় জমি থেকে কাটা ধান এবং জমিতে থাকা পাকা ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। মাড়াই করা ধান বৃষ্টির জন্য শুকানো যাচ্ছে না। আবার আগাম বন্যার শঙ্কায় জমিতে থাকা ধানও দ্রুত কাটার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদারকি করা হচ্ছে। জেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ শতাংশ ধান কাটা হয়ে গেছে। দ্রুত ধান কাটার সুবিধার্থে জেলায় ৪০টি হারভেস্টার, ১১২টি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটা হচ্ছে।

আগাম বন্যার শঙ্কায় একদিকে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান কাটা হচ্ছে, অন্যদিকে ধান কাটার শ্রমিকসহ ছাত্র-শিক্ষক, স্কাউটস, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, পুলিশ, সমাজকর্মী, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাংসদ সবাই হাওরে যাচ্ছেন। ধানও কেটে দিচ্ছেন তারা।

জেলার দিরাই উপজেলার রাঙ্গামাটি হাওরের কৃষক নিতাই পাল জানান, তার অধিকাংশ ধান কাটা হয়ে গেছে। তিনি বলেন, জমিতে এখনো ধান আছে। বন্যার পূর্বাভাসে কিছুটা চিন্তায় আছি। কাটা ধানগুলো শুকাতে পারছি না। কারণ প্রতিদিন সকালে বৃষ্টি হচ্ছে।

তাহিরপুর উপজেলার কৃষক বাবুল মিয়া জানান, ‘আমরা ২৯ জাতের ধান বেশি করছি। ওখনও ধান পাকছে না। আরো ৫-৭ দিন লাগবে ধান কাটতে। এর মাঝে যদি বন্যা আয় তাইলে তো আমরা দিশেহারা হই যাইমু’।

সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি ধূর্জটি কুমার বসু বলেন, ‘গত কয়েক দিন থেকেই বিষয়টি লক্ষ্য করছি। হাওরে নানা শ্রেণি-পেশার লোকজন যাচ্ছেন। এতে নিশ্চয়ই আমাদের কৃষক ভাইয়েরা উৎসাহ পাবেন। আমাদের নিজেদের স্বার্থেই কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে। কৃষকরা না হাসলে আমরা হাসতে পারব না।’

সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকাসহ পুরো জেলায় ধান কাটা শুরু হয়েছে। সুনামগঞ্জে অন্যান্য জেলা থেকে প্রায় ৫ হাজার ধান কাটা শ্রমিক এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী সরকারি ভর্তুকিতে এবার সুনামগঞ্জে আরো ৩৩টি ও নেত্রকোনায় ৪০টি ধান কাটার মেশিন পাঠিয়েছেন। এসব মেশিনের অধিকাংশ ব্যবহার হচ্ছে।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, ‘কাটলে হাওরে ধান মিলবে সরকারি ত্রাণ’- এই ¯েøাগান সামনে রেখে আমরা পুরোদমে জেলায় ধান টাকা শুরু করেছি। প্রধানমন্ত্রী সুনামগঞ্জের হাওরকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন ৪০টি কমবাইন্ড হারভেস্টার মেশিন উপহার দিয়েছেন। এই ৪০টিসহ মোট ১১২টি মেশিন দিয়ে সব উপজেলায় ধান টাকা শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত হাওরে ১ লাখ ৬১ হাজার হেক্টর জমির মোট ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে ৪২ ভাগ পাকা ধান কাটা হয়েছে। আমরা আশা করছি, আগাম বন্যার আগেই বেশিরভাগ কৃষক পাকা ধান কাটতে সক্ষম হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সফর উদ্দিন বলেন, এবার আমাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অধিক ফলন হয়েছে। আবহাওয়া অনুক‚লে থাকলে কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj