কলকাতা ত্রয়ী : সত্যজিতের চলচ্চিত্রে শহরের নানা রূপ

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২০

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নকশালবাড়ি গ্রামের কৃষকদের ওপর স্থানীয় ভূস্বামীদের অত্যাচার-নিপীড়নের পরিপ্রেক্ষিতে সূচনা হয়েছিল নকশাল বিদ্রোহ। যা ‘নকশাল আন্দোলন’ নামে পরিচিত। এ আন্দোলনের মূল প্রবক্তা ছিলেন চারু মজুমদার। কলকাতার ছাত্র সংগঠনগুলোর ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল এই নকশাল আন্দোলন। যদিও ১৯৭০ সালের দিকে এ আন্দোলন অভ্যন্তরীণ দ্ব›েদ্ব কয়েকটি বিরোধী শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। বাংলা সাহিত্য চলচ্চিত্রে নানাবিধ প্রভাব রয়েছে এ আন্দোলনের। তেমনই এক প্রচ্ছন্ন প্রভাব আমরা দেখতে পাই সত্যজিৎ রায়ের কলকাতা ত্রয়ীতে। তার পরিচালিত প্রতিদ্ব›দ্বী (১৯৭০), সীমাবদ্ধ (১৯৭১) ও জন-অরণ্য (১৯৭৫) এই তিনটি ছবিকে একত্রে কলকাতা ট্রিলজি বা ত্রয়ী বলা হয়। কলকাতা ত্রয়ীর সমস্ত চলচ্চিত্রগুলোর পেছনে ছিল শহর কলকাতা। গত ২৩ এপ্রিল ছিল কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের প্রয়াণ দিবস। এ উপলক্ষে ভোরের কাগজ পাঠকদের জন্য রইল এই লেখাটি। লিখেছেন মুহাম্মাদ আলতামিশ নাবিল

প্রতিদ্ব›দ্বী (১৯৭০)

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রচিত উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র ‘প্রতিদ্ব›দ্বী’। চলচ্চিত্রটির মুখ্য চরিত্র সিদ্ধার্থের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ধৃতিমান চট্টোপ্যাধায়। কলকাতা ত্রয়ীর মধ্যে কেবলমাত্র প্রতিদ্ব›দ্বীতেই নকশাল আন্দোলনের পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের প্রভাব রয়েছে সবচেয়ে বেশি। ছবির শুরুতে নেগেটিভ ফিল্টার ভিডিও টোনে আমরা দেখতে পাই সিদ্ধার্থের বাবাকে হারানোর দৃশ্য। এরপরই দেখা যায় সংসার চালানোর জন্য তার চাকরি পাওয়ার প্রাণান্তকর দৌড়ঝাঁপ। কোনো এক চাকরির সাক্ষাৎকারে সিদ্ধার্থকে জিজ্ঞাসা করা হয়, এই শতাব্দীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা কী? সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি বলেন, ভিয়েতনামের যুদ্ধ যেখানে তারা শুনতে চেয়েছিল চাকরিপ্রার্থী মানুষের প্রথম চাঁদে যাওয়ার ঘটনাটিকেই আলোকপাত করবেন। সিদ্ধার্থের মতো বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে মানুষ তো একদিন না একদিন চাঁদে যেত, তবে ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিকে শুধু মনোবল দিয়েই হটিয়ে দিল তা অবাক করার মতোই ঘটনা। তিনি বিপ্লবী কিনা সে সন্দেহ প্রকাশ হওয়ায় চাকরিটি শেষ পর্যন্ত সিদ্ধার্থের হয়নি। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি নকশাল আন্দোলনের প্রতি দুর্বলতাকে ইঙ্গিত করলেও আত্মকেন্দ্রিক সিদ্ধার্থের কাছে, আন্দোলনের কাছে চাকরি নিয়ে দুমুঠো খেয়েপরে বেঁচে থাকাটাই আসল। কিন্তু অন্য আরেকটি ইন্টারভিউতে একদল চাকরিপ্রার্থীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখে ইন্টারভিউ বন্ধ করে চাকরির কর্তাদের মধ্যাহ্নভোজ করার বিষয়টিতে সিদ্ধার্থের চাকরিদাতাদের মারতে উদ্যত হওয়ার দৃশ্য তাকে আবারো বিপ্লবী হিসেবেই প্রকাশ করায়। শেষদিকে ক্রমাগত প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত হয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে কলকাতা ছাড়ে সে। মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের একটা ছোট চাকরি নিয়ে কলকাতার বাইরে চলে যেতে দেখা যায় তাকে। শহরের কোলাহল থেকে বেরিয়ে মফস্বলের পাখির ডাক শুনতে শুনতে ছবি শেষ হয়।

শোনা যায় রাজনীতি বিষয়টাকে অপছন্দের চোখে দেখতেন সত্যজিৎ রায়। এই নকশাল আন্দোলনকে আরো বেশি অপছন্দ করতেন। তাই এটাকে তিনি অভিহিত করেছেন বামপন্থিদের ভেতরকার দ্ব›দ্ব হিসেবে।

সীমাবদ্ধ (১৯৭১)

এ ছবির প্রধান চরিত্র শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জি যে কিনা তরুণ বয়সে যোগ্যতা আর ভাগ্যের বলে একটি বহুজাতিক কোম্পানির ডিরেক্টর পদে অভিষিক্ত হন। চরিত্রগত দিক দিয়ে প্রতিদ্ব›দ্বী সিদ্ধার্থের থেকে পুরোপুরিই আলাদা সীমাবদ্ধের শ্যামলেন্দু। কলকাতা শহরের বেকারদের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এক নাম সিদ্ধার্থ, অপরদিকে তারই সমসাময়িক শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জি একটি সফলতার গল্প। তবে সিদ্ধার্থ নিজের নীতিবোধের সাথে আপস না করতে পারলেও, সীমাবদ্ধের শ্যামলেন্দু চাকরিতে উন্নতির লোভে হীন কাজ করতেও দ্বিধাবোধ করে না। মধ্যবিত্ত থেকে ক্রমশ উচ্চবিত্ত হওয়ার দিকে এগুনো শ্যামলেন্দুর মতো সামাজিক স্ট্যাটাস প্রাপ্তির লোভ তার স্ত্রী দোলনচাঁপারও রয়েছে। তাই তাদের একমাত্র পুত্র রাজাকে ছোট বয়সে পাঠিয়ে দেয় বোর্ডিংয়ে। এমনকি শ্যামলেন্দুর বয়স্ক মা-বাবারও ঠাঁই হয় না তাদের আধুনিক বড় বাড়িতে। মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস সীমাবদ্ধ অবলম্বনে একই নামে এই চলচ্চিত্রটি নির্মিত। এটি সত্যজিৎ রায় নির্মিত কলকাতা ত্রয়ী সিরিজের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র। ছবিটিতে মুখ্য চরিত্র শ্যামলের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বরুণ চন্দ ও টুটুল চরিত্রে শর্মিলা ঠাকুর। ছবিটির নাম দিয়ে সত্যজিৎ লিমিটেড (সীমাবদ্ধ) কোম্পানিকে নয়, বরং একজন ব্যক্তির কলকাতার শহুরে সমাজের উঁচু স্তরে যেতে উন্নতি মানসিকতার সীমাবদ্ধতা বা অভাবের গল্পই বলেছেন।

জন-অরণ্য (১৯৭৫)

ছবিটি শুরু হয় একটি পরীক্ষাকেন্দ্রের দৃশ্যের মাধ্যমে যেখানে চলছে নকলের মহোৎসব! শিক্ষকরা মুখ বেজার করে ভীত ভঙ্গিতে পরীক্ষা নিয়ে যাচ্ছে। সত্যজিৎ রায় এই দৃশ্যটি দিয়ে তৎকালীন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অনুসারী ছাত্রদের দৌরাত্ম্যকে সূ²ভাবে ইঙ্গিত করেছেন। সীমাবদ্ধের মতো জন-অরণ্যের কাহিনীও নেয়া হয়েছে মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের আরেকটি উপন্যাস অবলম্বনে। জন-অরণ্য চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র সোমনাথ। গণনকলের বাজারে ভালো পরীক্ষা দিয়েও তার ভাগ্যে জোটে গড়পড়তা এক পাস মার্কস। শুরু হয় সোমনাথের হতাশা। ওদিকে প্রেমিকার বিয়ে হয়ে গেলে সেই হতাশার মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। চাকরিপ্রার্থী হিসেবে ইন্টারভিউ বোর্ডে ‘চাঁদের ওজন কত’ এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে শেষমেশ বুঝতে পারে তাকে দিয়ে আর চাকরি হবে না। পূর্ব পরিচিত হিরালালবাবু তাকে অনুপ্রেরণা দেয় চাকরি ছেড়ে ব্যবসার পথ বেছে নিতে। ক্যাপিটাল ছাড়া অর্ডার-সাপ্লাইয়ের ব্যবসা অর্থাৎ দালালি যাকে ইংরেজিতে বলে মিডলম্যানের কাজে নেমে যায় সে। জন-অরণ্যে সোমনাথের অর্ডার-সাপ্লাই বোঝার দৃশ্যগুলো ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষার্থীদের জন্য সত্যিকার অর্থে অনেক তথ্যবহুল। সোমনাথের প্রথম অর্ডার-সাপ্লাই ব্যবসা শুরু হয় কোনো এক অফিসে স্টেশনারি সাপ্লাইয়ের মাধ্যমে। মেধাবী হওয়ায় ব্যবসাটা অল্পদিনে ভালোই রপ্ত করে ফেলে। হাতে আসে গার্মেন্টসের বড় একটা অর্ডার পাওয়ার সুযোগ যেটি পেতে তাকে আশ্রয় নিয়ে হয় উৎকোচের। নিয়তির করুণ পরিণতিতে সেই গার্মেন্টসের বড়কর্তার হাতে সে এক রাতের জন্য তুলে দেয় তারই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বোনকে। সীমাবদ্ধের মতো জন-অরণ্যের প্রধান চরিত্র ছবির শেষে চূড়ান্ত সফলতা পায়। কিন্তু বিকিয়ে দিয়ে আসে নিজের নৈতিকতাকে। ছবির প্রধান চরিত্র সোমনাথ রূপে অভিনয় করেন প্রদীপ মুখোপ্যাধায়। যার হাত ধরে তার এই দালালি ব্যবসা সেই বিশুদা চরিত্রে অভিনয় করেন উৎপল দত্ত। ছবিতে পরিচালক কলকাতা শহরকেই বর্ণনা করেছেন অরণ্য হিসেবে। সত্যজিৎ রায়ের মতো নির্মাতা মৃণাল সেনও বানিয়েছিলেন আরেক কলকাতা ট্রিলজি। ‘ইন্টারভিউ’ আর ‘কলকাতা ৭১’ চলচ্চিত্র দুটি মুক্তি পায় ১৯৭১ সালে এবং ‘পদাতিক’ মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালে।

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj