সরকারকে একই সঙ্গে মানবিকতা ও কঠোরতা দেখাতে হবে

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২০


করোনা ভাইরাস তার মরণ কামড় হেনেই চলেছে। করোনা মোকাবিলায় কোনো দেশই পুরো সফলতা দেখাতে পারেনি। এ পর্যন্ত মৃত্যু রুখতে পেরেছে দুয়েকটি দেশ। তবে যেসব দেশ করোনাকে খাটো করে দেখেছে, একে প্রতিরোধের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি, নাস্তানাবুদ হচ্ছে সেসব দেশই বেশি। অর্থনৈতিকভাবে উন্নত এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে সমৃদ্ধ দেশগুলোও করোনা প্রতিরোধে সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। পৃথিবীতে স্বাস্থ্য খাত তথা জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি যে দুয়েকটি ছোট দেশ ছাড়া কারো কাছেই বেশি গুরুত্ব পায়নি, সেটা স্পষ্ট হলো করোনা হানা দেয়ায়। করোনার ঝড়ো হাওয়া পৃথিবীটাকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নত না করে, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ না বাড়িয়ে কোনো দেশ যে প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হতে পারে না, সামরিক শক্তি যে কোনো দেশের আপৎকালীন রক্ষাকবজ নয়, সেটাও সম্ভবত অনেকের বিবেচনায় এসেছে।

চিকিৎসা খাতে বেসরকারি উদ্যোগও যে কতটা ভঙ্গুর সেটাও এবার অনেক দেশেই দেখা গেছে। বিপদের সময় বেসরকারি হাসপাতালগুলো নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। কোনো কোনো দেশে তাই বাধ্য হয়ে কিছু বেসরকারি হাসপাতাল সরকার অধিগ্রহণ করেছে। এটা প্রমাণ হয়েছে যে, সবাইকে মোটামুটি মানের চিকিৎসাসেবা দিতে হলেও সরকারি চিকিৎসা কাঠামোকেই পরিপুষ্ট করতে হবে, শক্তিশালী করতে হবে।

আমাদের দেশে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কিছু ত্রুটি-দুর্বলতা আছে। কেনাকাটায় চুরি-ডাকতির খবরও জানা যাচ্ছে। তারপরও করোনাকালে সরকারি ব্যবস্থাই অধিক কার্যকর বলে প্রতীয়মান হয়েছে। সময় পেয়েও আমাদের সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে সক্ষম হয়নি বলে সমালোচনা আছে। চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা সরঞ্জাম, ভেন্টিলেটর, রোগ পরীক্ষার ব্যবস্থা- সব কিছুতেই ঘাটতি আমাদের। অন্যসব দেশে, এমনকি আমেরিকাতেও এসবের অভাব আছে। আমাদের দেশে বাড়তি সমস্যা হলো দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং সমন্বয়হীনতা। আমাদের দেশে কয়টি ভেন্টিলেটর আছে, তার মধ্যে সচল আছে কয়টি, সে তথ্যও আমাদের কর্তাব্যক্তিদের কাছে নেই। দেশে সাধারণভাবে কত রোগীর ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দরকার হয়, তাও হয়তো আমরা জানি না। তাই ভেন্টিলেটরের গুরুত্ব এতদিন অনুভূত হয়নি।

আমাদের বড় সমস্যা, আমরা কোনো ক্ষেত্রেই ন্যায্যতা বা সমতার নীতি অনুসরণ করি না। যাদের আছে, তাদের আরো দেয়ার চিন্তা আমাদের মাথায় প্রথম আসে। যাদের কিছু নেই, তাদের পাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আসে দ্বিতীয় ধাপে। সমাজের অবহেলিত, বঞ্চিত এবং দুস্থ মানুষদের জন্য বর্তমান সরকারের নানা ধরনের সুরক্ষা কর্মসূচি রয়েছে। নগদ অনুদানসহ নানা সহায়তার আওতায় আছে লাখ লাখ মানুষ। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা যে তুলনামূলকভাবে অগ্রগতির ধারায় তার স্বীকৃতি দেশের বাইরে থেকেও পাওয়া গেছে। আমরা নি¤œমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি। মধ্যম আয়ের দেশের পথে হঁাঁটছি। কিন্তু করোনা প্রতিরোধের জন্য কয়েক দিনের লকডাউনেই আমাদের যে বেহাল অবস্থা, তা কিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। আমাদের দেশে উপার্জনহীন মানুষের সংখ্যা কম নয়। স্বল্প উপার্জন করা বা দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের সংখ্যাও হাতে গোনার বাইরে। অসময়ের জন্য কোনো সঞ্চয় নেই- এমন মানুষও কম নয়। এসব মানুষ সরকারের কোনো হিসাবের মধ্যে আছে বলে মনে হয় না। ফলে দুয়েক দিন যেতে না যেতেই না খেয়ে থাকার বিষয়টি প্রবলভাবে সামনে চলে এসেছে। সরকার ত্রাণ দিচ্ছে। অন্যরাও কিছু দিচ্ছে। কিন্তু ব্যক্তিগত সহায়তা রাষ্ট্রীয় কর্তব্যের বিকল্প হতে পারে না।

সরকার আশ্বস্ত করছে বারবার যে দেশে কোনো খাদ্য সংকট নেই, কেউ না খেয়ে মরবে না। তারপরও হাহাকার কমছে না। দুর্ভিক্ষের আশঙ্কাও কোনো কোনো মহল থেকে করা হচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার প্রতিবেদনেও করোনার কারণে বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে। আধপেটা খেয়ে থাকে, ক্ষুধা পেটে রেখে ঘুমাতে যায়- এমন মানুষের সংখ্যা গত বছর ছিল বিশ্বব্যাপী ছিল ১৩ কোটি ৫০ লাখ। করোনার জেরে চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হতে পারে।

বাংলাদেশে কি খাদ্য সংকট দেখা দেবে? মানুষকে কি অনাহারে থাকতে হবে? না খেয়ে মৃত্যুর ঘটনা কি ঘটবে? সরকারি তরফ থেকে জোর দিয়েই বলা হচ্ছে যে, দেশে দুর্ভিক্ষাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা অমূলক। কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, বড় দুর্যোগের সময় খাদ্য সংকট হওয়া স্বাভাবিক। তবে সর্বোচ্চ সক্ষমতা নিয়ে বন্যা আসার আগে হাওরের ধান কাটার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রধান খাবার চালের উৎপাদন এবার বেশ ভালো হয়েছে। মজুতও যথেষ্ট পরিমাণে আছে। সরকার বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে গরিব মানুষদের চাল দেয়ার কাজ অব্যাহত রেখেছে। প্রয়োজনে তা বাড়ানো হবে।

ধানসহ অন্য সব কৃষি ফলন (বিভিন্ন ধরনের সবজি) যদি ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে দিকে যদি কড়া মনোযোগ রাখা যায় তাহলে দেশে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কায় এখনই অস্থির হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারকে সর্বাত্মকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। কৃষক যাতে উৎপাদিত পণ্যের ঠিক দাম পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষককে যদি এই দুঃসময়েও পানির দামে ধান বিক্রি করতে হয়, মধ্যস্বত্বভোগী, ফড়িয়ারা যদি এবারও মুনাফা বাণিজ্যে নামে তাহলে সেটা ভবিষ্যতের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কৃষিজাত পণ্যের বাজারজাতকরণ, সরবরাহ ব্যবস্থা যাতে বিঘ্নিত না হয় সেদিকেও রাখতে হবে কঠোর নজরদারি।

কেউ কেউ এমন আশঙ্কা করছেন যে, বাজারে খাদ্যসামগ্রী থাকলেও আয়-রোজগার না থাকায় অনেকেরই তা কেনার সামর্থ থাকবে না। মানুষের কর্মহীনতা নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে। এটা একটা গুরুতপূর্ণ বিষয়। আয়হীন কয়েক কোটি মানুষের হাতে নগদ টাকা দেয়ার পরিকল্পনা থাকতে হবে। সরকারের সামর্থ্যরে মধ্যেও সীমাবদ্ধতা আছে। আমাদের অঢেল রাষ্ট্রীয় সম্পদ নেই। তারপরও আছে সম্পদ ব্যবহারের সুষ্ঠু নীতিমালার অভাব। সরকারের জন্যও পরিস্থিতি কোনো বিবেচনাতেই অনুক‚ল নয়। সরকারকে তাই ঝেড়ে কাশতে হবে। কতটুকু সম্পদ আছে, কীভাবে তার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা যাবে তা কোনো রাখডাক না করে প্রকাশ করতে হবে। মানুষের কাছে সব তথ্য থাকলে কোনো সন্দেহ তৈরি হবে না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ পানি ঘোলা করার সুযোগ পাবে না।

সমস্যা অগ্রাহ্য করা যাবে না। সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগান দিতে হবে। প্রশ্ন হলো, এই অর্থ সরকার কোথা থেকে পাবে? ‘অংশীদারি অর্থনীতি’ বলে একটি কথা হালে চালু হয়েছে। বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লাভের একটি অংশ সরকার নিয়ে নেবে এবং তা গরিবদের মধ্যে ভাগ করে দেবে। এটা অবশ্য সহজ কাজ নয়। আমাদের দেশের বড় শিল্পপতি-ব্যবসায়ীরা সব সময় সরকারের কাছ থেকেই সুবিধা নেয়ার ফিকিরে থাকেন। তারা কর ফাঁকি দেয়ার নানা ফন্দি খোঁজেন। এখন বলবেন, আমাদের ব্যবসাই তো লাটে উঠেছে। লাভ কোথায় যে তার অংশ দেব? যদি এভাবে অর্থ সংগ্রহ একেবারেই সম্ভব না হয়, তাহলে সরকার ‘সম্পদ কর’ বসানোর কথা ভাবতে পারে। দেশে এখন অনেক কোটিপতি। শীর্ষ স্থানীয় সম্পদশালীদের ওপর তিন/চার শতাংশ হারে সম্পদ কর বসিয়ে সরকার আপৎকালীন অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। কোনো দেশের বিশেষ মডেল অনুসরণ না করে নিজেদের সংকট সমাধানে নিজেদেরই সৃজনশীল উদ্যোগ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। করোনা একদিকে স্বাস্থ্য সংকট, অন্যদিকে তা অর্থনৈতিক সংকটও বটে। এখন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণের স্বার্থে সরকারকে একদিকে মানবিক গুণের প্রকাশ দেখাতে হবে, অন্যদিকে পরার্থপরতার অর্থনীতি অনুসরণে বিত্তবানদের বাধ্য করতে প্রয়োজনে যতটুকু কঠোর হওয়া প্রয়োজন, ততটুকু কঠোরতাও দেখাতে হবে।

বিভুরঞ্জন সরকার : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj