করোনা : শতজনমের চিন্তা-বিশ্বাস তছনছ

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২০


মসজিদ-মন্দিরে না গেলে ধর্ম থাকে? অফিসে না গেলে চাকরি? হাটবাজারে না গেলে সদাই মেলে? শিক্ষাঙ্গনে না গেলে শিক্ষা গ্রহণ?- সব প্রশ্নের জবাবই এখন ‘হ্যাঁ’। এ ধরনের আরো অনেক প্রশ্ন সামনে এনেছে ঘাতক ভাইরাস করোনা। প্রশ্নের সঙ্গে নিশ্চিত করেছে ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব। মাস কয়েক আগের বাস্তবতায় তা অভাবনীয়। অবিশ্বাস্য।

করোনায় একদিকে মৃত্যুর মিছিল, আরেকদিকে দেশে দেশে গোলাবারুদের শব্দ বন্ধ। তা যুদ্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াই গোটা দুনিয়াকে থমকে দিয়েছে। বন্ধ করে দিয়েছে হত্যা উৎসব। নতুন নতুন মারণাস্ত্র আবিষ্কারের খবর নেই। এক দেশের যুদ্ধবিমানকে অন্য দেশের আকাশসীমায় ঢুকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনাও নেই। যুদ্ধের চেয়েও ভয়ানক অবস্থার এ তলানি থেকে বিশ্ব কবে নিস্তার পাবে, সেই নিশানা না থাকলেও অপ্রতিরোধ্য গতিতে চিন্তা-বিশ্বাসকে ধসিয়ে দিয়েছে।

ক’দিন আগেও মানুষ যা মনে করত এখন তা মনে করে না। ভাবে না। লোকালয়ে কারো সঙ্গে দেখা হলে হ্যান্ডশেক-মোলাকাত, কোলাকুলিতে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়- তা ক’দিন আগেও ভেবেছে কেউ? অথবা ভাবলেও মুখে আনা সম্ভব হতো? এমন কথা বললে তেড়ে আসা লোকের অভাব হতো না। লোকালয়ের পাশাপাশি বিশ্বাস পাল্টেছে ধর্মালয় নিয়ে। ধর্ম নিয়েও। মক্কা-মদিনা, গয়া-কাশি নিয়ে বিশ্বাস-ভাবনার উথাল-পাতাল। মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডায় না গিয়েও ইবাদত, পূজা, প্রার্থনা করা যায়- বিশ্ববাসীর সেই বিশ্বাস তছনছ করে দিয়েছে ভাইরাসটি।

বিশ্বের প্রকৃতিকেও শান্ত-সুবোধ করে দিয়েছে এই ক্ষুদ্র আণুবীক্ষণিক করোনা। বলা হয়ে থাকে মহামারি, আগুন, দুর্ভিক্ষ বরাবরই অনন্য নিরপেক্ষ। ধনী-গরিব সবাইকে এক চোখে দেখে। কাউকে ছাড় দেয় না। লোকালয়-দেবালয় ভেদাভেদ করে না। প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস তা আরেকবার দেখিয়ে ছাড়ছে গোটা বিশ্বকে। এর শেষ কোথায়? কেউ জানে না। কথাবার্তা সবই ধারণানির্ভর। আরো কিছু নানামুখ থেকে শোনা হাওলাতি কথা। এই অণুজীবটিকে রুখতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে মহাবিশ্বের বড় বড় মাথা, বড় বড় বিজ্ঞানী। নাস্তানাবুদ হচ্ছে বিশ্ব মোড়ল পরাক্রমশালী দেশগুলো। সেই ভাবনা-বিশ্বাসেও চিড় ধরিয়েছে ভাইরাসটি। বিশ্বজুড়ে শত্রু-মিত্রের এতদিনের ধারণা আরো বদলে যাওয়ার লক্ষণ বিদ্যমান। যাদের হুঙ্কারে, পরমাণু অস্ত্রের ঝংকারে বিশ্ব ছিল প্রকম্পিত, যাদের দাপটে, ভয়ে নেতিয়ে থাকত তৃতীয় বিশ্বসহ দুনিয়ার অনগ্রসর রাষ্ট্রগুলো। সামনে শক্তির আরো পরিবর্তনের লক্ষণ স্পষ্ট। কেউ কেউ একে চেনা যুগের সমাপ্তি এবং নতুন যুগের সূচনা ভাবছেন।

ভাইরাসটি অনেক সামাজিক মূল্যবোধও পাল্টে দিয়েছে। আরো দেবে। করোনা সূ²গতিতে হাটবাজার, কেনাকাটার ধারণা পাল্টে দিয়েছে। ব্যাপকভিত্তিক এক অনলাইন যুগে ঢুকে গেছে সাধারণ মানুষও। ‘ই-কমার্স’ বুঝতে শুরু করেছে অল্পশিক্ষিত লোকও। তেল-সাবান, চাল-ডাল থেকে মসলা, স্যান্ডো গেঞ্জি থেকে পারফিউম পর্যন্ত লকডাউনে থাকা বাড়ি-ঘরে সাপ্লাই মিলছে। ছোট-বড় দোকান এবং ‘মল’গুলোর জন্য এটা দুঃসংবাদ। এতদিনের চিরায়ত ধাঁচের বিশাল আকৃতির অফিসের ধারণায়ও পরিবর্তন এসেছে। ঘরে বসে অফিস করার চর্চা অভাবনীয়ভাবে চলছে বাংলাদেশেও। মাস কয়েক আগেও এটি ছিল গাঁজাখুরি কাণ্ড। সামনের দিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে অফিসে আগের মতো মুখোমুখি-পাশাপাশি বসার কালচারে লাগাম পড়তে পারে। দূর-দূরান্তে যাতায়াত বা সমাবেশের বদলে স্কাইপ, ভিডিও কনফারেন্সিং ক্রিয়াকর্ম জনপ্রিয় হয়ে ওঠার নমুনাও স্পষ্ট। শিক্ষাক্ষেত্রে করোনার কারণে চলমান অচলাবস্থা কাটাতেও অনলাইন ভাবনার পরামর্শ আসছে বিভিন্ন মহল থেকে। এরই মধ্যে কিছু দেশে শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটা অনলাইন জগতে ঢুকে পড়েছে। বিদেশের অধিকাংশ স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এখন চলছে অনলাইনে। ক্লাস করাচ্ছে, মূল্যায়ন করছে। বাংলাদেশও পা দিয়েছে ভার্চুয়াল শিক্ষায়। বিটিভিতে বিভিন্ন শ্রেণির ক্লাস নেয়া হচ্ছে। কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও অনলাইনে ক্লাস নেয়া শুরু করেছিল। এতে বাদ সেধেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-ইউজিসি। তারা হঠাৎ প্রজ্ঞাপন দিয়ে বসল অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো যাবে না। এতে ব্যবস্থাটা থমকে গেলেও সামনে নতুন চিন্তা ও সিদ্ধান্তের দেখা মিলতে পারে।

অনলাইনে চিকিৎসাও বাড়তে পারে। ডাক্তারদের কেউ কেউ করোনা পরিস্থিতিতে অনলাইনে ওষুধ-পথ্য মিলিয়ে চিকিৎসাপত্র দিচ্ছেন। রাজধানীর কোনো কোনো ডায়গনস্টিক সেন্টার রক্ত, মল-মূত্রের স্যাম্পল নেয়া শুরু করেছে। তাদের হোম ডেলিভারি রিপোর্ট দেখে চিকিৎসা চর্চা হচ্ছে। একাডেমিক রাজ্যে মেডিকেল শিক্ষার গুরুত্ব নতুন করে বাড়বে। আর মেডিকেল শিক্ষার্থীরা বেশি ঝুঁকবে বংশগতিবিদ্যা, জীববিদ্যা, সংক্রামক রোগ নিয়ে পড়াশোনায়। করোনা ভাইরাস বিশ্বকে ভোগ ও জীবনযাপনের ধরন পাল্টাতে বাধ্য করছে। বাংলাদেশে যার নমুনা এবারের রমজানেও। যে কারো পক্ষেই বোঝা সম্ভব যে, ভাইরাসের তোড়ে দেশে স্বাস্থ্য সচেতনতার নতুন তরঙ্গ তৈরি হয়েছে। এর জেরে খাবারের ব্যাপারে এরই মধ্যে মানুষের সতর্কতা-সচেতনতা বেড়েছে। এর সুবাদে সামনের দিনগুলোতে অরগানিক ফুডের বাজার জমজমাট হবে। সুস্থভাবে বেশি বেঁচে থাকার আশায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন খাদ্যের দিকে মানুষের আগ্রহ না বেড়ে উপায় নেই। এ ক্ষেত্রে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাঁকখোর পূর্বাভাস বেশ প্রাসঙ্গিক। ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাবের পরপরই তিনি বলেছিলেন, এ সময়টা আমাদের অনেক কিছু শেখাবে। অনেক দৃঢ় বিশ্বাসে ফাটল ধরবে এবং প্রত্যয় নড়বড়ে হয়ে যাবে। অক্ষরে অক্ষরে ফলছে ম্যাঁকখোর কথা। করোনা দেশে দেশে ঝাঁকুনির সঙ্গে গোটা বিশ্বকেও পাল্টানোর তাড়না তৈরি করেছে। কারো চাপে-তাপে নয়, নিজের স্বার্থেই বদলে যাওয়ার বিকল্প দেখাতে পারছেন না কেউ।

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj