অর্থনীতি সচলে পর্যায়ক্রমে খুলবে কলকারখানা : পরিবহন চালুর ইঙ্গিত, ফের বাড়ল ছুটি

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২০

কাগজ প্রতিবেদক : মানুষের জীবনের নিশ্চয়তার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকেও বাঁচিয়ে রাখতে চায় সরকার। আর এ কারণেই করোনার সংক্রমণ ঝুঁকি জেনেও দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় ধাপে ধাপে লকডাউন তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গতকাল চতুর্থ দফায় ছুটি বাড়ালেও দুই শর্তে কারখানা খোলার অনুমতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। একই সঙ্গে সরকারের ১৮টি অফিসও সচল রাখার কথা জানানো হয়েছে প্রজ্ঞাপনে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগের মতোই বন্ধ থাকবে। এর মধ্যে ৫ মে পর্যন্ত মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ঈদ পর্যন্ত বন্ধ থাকবে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী সময়ে শিল্প-কারখানা, কৃষি এবং উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলো এবং পরিবহন পর্যায়ক্রমে উন্মুক্ত করা হবে। এসব বিষয় উল্লেখ করে আগের ‘ছুটির’ ধারাবাহিকতায় ২৬ থেকে ৩০ এপ্রিল এবং ৩ থেকে ৫ মে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে তার সঙ্গে ১ ও ২ মে’র সাপ্তাহিক ছুটি সংযুক্ত করে গতকাল বৃহস্পতিবার আদেশ জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

এদিকে সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতেই ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক এলাকায় ব্যাংক পরিষেবার আওতা আরো দুই ঘণ্টা বাড়িয়ে লেনদেনের সময় ৪ ঘণ্টা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্যদিকে সপ্তাহে দুদিন আদালত চালু থাকবে বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ সরকারকে পরামর্শ দিয়ে বলেছেন- দিন ১৫-এর মধ্যে করোনার সংক্রমণ পরিস্থিতি অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আয়ত্তে থাকুক বা না থাকুক সামাজিক দূরত্ব মেনেই চলাচল করতে হবে। এছাড়া চলমান লকডাউনেও মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে। তবে যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তারা ঠিকই আইসোলেশনে বা হাসপাতালে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও সামাজিক দূরত্ব পদ্ধতি পালন করে কলকারখানা, অফিস-আদালত সীমিতভাবে চালু করে দেখা যেতে পারে। এতে যদি দেখা যায় করোনার থাবা সামাল দেয়া সম্ভব তাহলে ঈদের পর পর পুরোদমে সবকিছু চালু করা হতে পারে। মূলত, তার এমন পরামর্শ পেয়েই সরকার অর্থনীতির চাকা সচলের কাজে নেমে পড়েছে।

এর দুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে বলেছিলেন, পরিস্থিতি অনুক‚লে থাকলে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য নির্দেশিকা কঠোরভাবে মেনে শ্রমিকদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারলে রোজার মাসের মধ্যে সীমিত আকারে কিছু গার্মেন্টস ও শিল্প-কারখানা চালু করা যেতে পারে। তিনি এও বলেছিলেন, সামনে রোজা, আমরা সবাইকে একেবারে বন্ধ করে রাখতে পারব না। আমাদের কিছু কিছু জায়গা আস্তে আস্তে উন্মুক্ত করতেই হবে। মূলত, প্রধানমন্ত্রীর এমন অভিমত পেয়েই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চতুর্থ দফা ছুটি বাড়ানোর পাশাপাশি সীমিত পরিসরে কোন কোন সেক্টর চালু করা যায় তা নিয়ে কাজ শুরু করে। সেই কাজ শেষে গতকাল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ নতুন এই সিদ্ধান্তকে সঠিক জানিয়ে বলেন, দেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন অচল থাকলে মানুষকে সেবা দেয়ার সামর্থ্য থাকবে না সরকারের। সে জন্য যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো চালু করে দেয়া উচিত। ’৭১-এর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, তখন কিন্তু আমরা কোয়ারেন্টাইনে চলে যাইনি। অস্ত্র হাতে নিয়ে তাদের প্রতিহত করেছিলাম। সুতরাং করোনা ভাইরাস নামক এ শত্রুর ভয়ে কোয়ারেন্টাইনে না থেকে তাকেও আমরা প্রতিহত করব অস্ত্র হাতে নিয়ে। তার মতে, এ যুদ্ধ প্রতিহতে দরকার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। মাস্ক ও হ্যান্ড গøাভস পরা, সঠিক নিয়মে হাত পরিষ্কার করা, নির্ধারিত দূরত্ব মেনে চলা ইত্যাদি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমরা এত দুর্বল জাতি নই যে ঘরে বসে থাকতে হবে।

বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান বলেন, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় মাসব্যাপী ছুটিতে কলকারখানাসহ সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে আছে। ফলে গুনতে হচ্ছে লোকসান। এভাবে ছুটি চলতে থাকলে আমাদের এ শিল্প শেষ হয়ে যাবে। কারখানা মালিকদের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকরাও না খেয়ে মরবে। তাই এ মুহূর্তে শিল্প-কারখানা খোলার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার তাকে সাধুবাদ জানাই। তিনি বলেন, একটা নির্দিষ্ট সময় পরে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চলে যাবে। কিন্তু সব কিছু বন্ধ করে রাখলে দেশ আগামীতে কঠিন বিপদের মুখে পড়বে। আমাদের প্রতিদ্ব›দ্বী দেশগুলোর হাতে সব চলে যাবে। তাই যতটা সম্ভব স্বাস্থ্যবিধি মেনে পর্যায়ক্রমে কারখানা চালুর কথা বলেন তিনি।

শর্ত সাপেক্ষে কারখানা খোলার অনুমতি : শর্ত সাপেক্ষে সব কলকারখানা খোলার অনুমতি দিয়েছে সরকার। শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে ওষুধ, উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পসহ সব কারাখানা খোলা রাখা যাবে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি-৪ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনের ২ (ঙ) নং শর্তে বলা হয়েছে, ‘ওষুধ, উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পসহ সকল কলকারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে চালু রাখতে পারবে।’ তবে কবে থেকে কলকারখানা খোলা রাখা যাবে সে বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে কিছু বলা হয়নি।

এছাড়া প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি থাকাকালে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা যাবে না। এ সময় সীমিত আকারে ১৮টি মন্ত্রণালয় খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এসব সিদ্ধান্তের বিষয়ে পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। দুই প্রজ্ঞাপনে একটিতে ছুটি বাড়ানোর সঙ্গে নতুন কিছু শর্ত যোগ করা হয়েছে। অন্যটিতে সীমিত আকারে যে ১৮টি মন্ত্রণালয় খোলা থাকবে সে বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে জরুরি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য অফিস ও পরিবহন ছুটির আওতামুক্ত থাকবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

ছুটিতে যা চলবে : ছুটির সময়ে জরুরি পরিষেবা, যেমন- বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, বন্দরসমূহের (স্থলবন্দর, নদীবন্দর ও সমুদ্রবন্দর) কার্যক্রম, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, টেলিফোন ও ইন্টারনেট, ডাক সেবা এবং এ সংশ্লিষ্ট সেবা কাজে নিয়োজিত যানবাহন; সড়ক ও নৌপথে সকল প্রকার পণ্য পরিবহনের কাজে নিয়োজিত যানবাহন (ট্রাক, লরি, কার্গো ভেসেল প্রভৃতি) চলাচল করবে। এছাড়া কৃষিপণ্য, সার, কীটনাশক, খাদ্য ও শিল্প পণ্য, রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের মালামাল, কাঁচাবাজার, খাবার, ওষুধের দোকান, হাসপাতাল ও জরুরি সেবা এবং এসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ক্ষেত্রে এ ছুটি প্রযোজ্য হবে না। একই সঙ্গে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও কর্মী এবং ওষুধসহ চিকিৎসা সরঞ্জামাদি বহনকারী যানবাহন ও কর্মী, গণমাধ্যমে (ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া) নিয়োজিত কর্মীরা এ ছুটির আওতাবহির্ভূত থাকবে।

ছুটিতে ১৮ অফিস খোলা : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফা জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ১৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম ঢাকা ও সারাদেশে সীমিত পর্যায়ে খোলা থাকবে। এই অফিসগুলো হলো- প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, কৃষি, বাণিজ্য, খাদ্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, জননিরাপত্তা বিভাগ, সুরক্ষা সেবা বিভাগ, তথ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন, সমাজ কল্যাণ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনে আরো বলা হয়, অন্য সব সরকারি অফিসের কর্মকর্তারা এ সময়ে আবশ্যিকভাবে নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করবেন।

মাধ্যমিকের ৫ মে ও প্রাথমিকের ছুটি ঈদ পর্যন্ত : করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকার আগামী ৫ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি বাড়িয়েছে। এই সময়ের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা যাবে না। সরকারের এই ছুটির সঙ্গে মিল রেখে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগামী ৫ মে পর্যন্ত বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে আগামী ঈদ পর্যন্ত সব প্রাথমিক বিদ্যালয় ছুটি ঘোষণা করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

চলতি বছরের শিক্ষাপঞ্জি অনুসারে আগামী ২৫ এপ্রিল থেকে ৩০ মে পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রোজা ও ঈদের ছুটি রয়েছে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে গত এক মাসেরও বেশি সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ৫ মে পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ছুটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ২৫ এপ্রিল থেকে ৬ জুন পর্যন্ত রোজা, ঈদ ও গ্রীষ্মকালীন ছুটি রয়েছে। তাই তারা সাধারণ ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করেই ঈদ পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করেছে। তবে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে আগামী ৩০ মে অথবা ১ জুন থেকেই বিদ্যালয়গুলো খুলতে চায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, সরকারের সাধারণ ছুটির সঙ্গে মিল রেখে আগামী ৫ মে পর্যন্তই আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। ইতোমধ্যে পড়ালেখায় অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। তাই ২৫ মে থেকে রোজা ও ঈদের ছুটি শুরুর কথা থাকলেও তা আমরা এখনই ঘোষণা করছি না। আমরা ৫ মে পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করব। এরপর সরকার আর ছুটি না বাড়ালে আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত জানাব।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ফসিউল্লাহ বলেন, ২৫ মে থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে রোজা ও ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর আগামী ৫ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি রয়েছে। তাই শিক্ষাপঞ্জি অনুসারে আগামী ঈদ পর্যন্তই ছুটি কার্যকর হবে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj