প্রবন্ধ > করোনা ভাইরাসের দিনে : প্রেম রসায়নে ওগো সর্বজনপ্রিয়

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২০

আন্দালিব রাশদী

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিস্ময়কর উন্নতির যুগে মানুষের অসহায়ত্বকে নগ্নভাবে তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাধি করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো মহাপরাক্রমশালী দেশেও করোনা মৃত্যু এবং করোনা ভাইরাস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা অবিশ্বাস্য হারে বাড়ছে, তারাও হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন চাইছে ভারতের কাছে। হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের প্রধান উৎপাদনকারী কারখানা বেঙ্গল কেমিক্যালস এন্ড ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের প্রতিষ্ঠা করা। ১১৮ বছর আগে ৭০০ টাকা পুঁজি নিয়ে কলকাতার আপার সার্কুলার রোডে একটি ভাড়া বাড়িতে বেঙ্গল কেমিক্যালসের যাত্রা শুরু। এটিই ভারতের একমাত্র সরকার নিয়ন্ত্রিত ওষুধ উৎপাদনকারী যার প্রতিষ্ঠান ক্লোরোকুইন ফসফেট উৎপাদনের বিপুল সক্ষমতা রয়েছে। প্রতিদিন ২০০ ও ৪০০ মিলিগ্রাম পরিমাপের ১০ থেকে ১৫ লাখ ট্যাবলেট উৎপাদন সম্ভব। তবে কাঁচামালের দাম প্রতি কিলোগ্রাম ১৬০০-২০০০ রুপি থেকে বেড়ে ৪০০০০ রুপিতে পৌঁছেছে। আপাতত হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন-ই মরণব্যাধি কোভিড-১৯ থেকে পরিত্রাণের প্রধান ওষুধ।

বিশ্বব্যাধির এই সংকটকালে এই মহাপ্রাণ বাঙালি বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

তাম্রপত্রে উৎকীর্ণ রবীন্দ্রনাথেরই দুটি পঙ্ক্তি :

‘প্রেম রসায়নে ওগো সর্বজনপ্রিয়

করিলে বিশ্বের জনে আপন আত্মীয়।’

বিজ্ঞান গবেষক সমাজে তিনি ভারতীয় ‘রসায়নের জনক’।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তাঁর আক্ষেপ : একে লেখাপড়া বলে না, এ লেখাপড়া নয়, এ ইউনিভার্সিটিকে ফাঁকি। কেবল মুখস্থ আর উদরস্থ; পেটুকের মিষ্টান্ন ভক্ষণের মতো- এক পন সন্দেশ টপাটপ্ করে গেলা, তারপর গলায় আঙুল দিয়ে বমি। সব সময়টা ফাঁকি দিয়ে পরীক্ষা কাছে এলেই টপাটপ্ মুখস্থ ও উদরস্থ করার প্রয়াস; তারপর পরীক্ষা মন্দিরে গিয়ে একেবার বমি। আর পাশ হলে হকার চাচার দোকানে পুস্তক বিসর্জন।

‘আমি গ্রোগ্রাসে বই গিলতাম, আমার বয়স তখনো ১২ বছর হয়নি। ভোর ৩টা-৪টায় ঘুম থেকে উঠতাম- কোনো রকম ব্যাঘাত ছাড়া একটানা পড়া চালিয়ে যেতাম। নিউটন ও গ্যালিলিওর জীবন এবং তাদের অবদান আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছে।’

তাঁর প্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের কষ্টকর জীবন ও অভিজ্ঞতা বিজ্ঞানকে মানবকল্যাণের কাজে লাগাতে তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। গোল্ডস্মিথের ভিকার অব ওয়েকফিল্ড, শেক্সপিয়ারের জুলিয়াস সিজার ও হ্যামলেট, জর্জ এলিয়টের সিনস ফ্রম ক্ল্যারিক্যাল লাইফ; এদিকে বঙ্কিমচন্দ্রের বিষবৃক্ষ, প্রফুল্ল ব্যানার্জির বাল্মীকি ও তার যুগ, রামদাস সেনের কালিদাস ও তার যুগ, রাজেন্দ্র লাল মিত্রের বিবিধার্থ সংগ্রহ আর কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা ও সাময়িকী, সেই সঙ্গে ল্যাটিন ভাষা শেখা- অপার এক আনন্দ ও জ্ঞানের জগৎ তাঁর।

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন: দেশে দুর্ভিক্ষ বা বন্যা হয়েছে, আচার্য তৎক্ষণাৎ ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। কোনো হাসপাতাল বা অনাথ আশ্রম বা স্কুল-কলেজে টাকার অভাব, আচার্য তাঁর নিজের পুঁজি নিঃশেষ করে দান করলেন। কোনো ছোকরা এসে বললে, আমার মাথায় একটা ভালো মতলব এসেছে, ময়রার দোকান খুলব কিংবা ট্যানারি করব কিংবা কাপড়ের ব্যবসা করব, কিন্তু হাতে টাকা নেই। আচার্য তখনই মুক্তহস্ত হলেন।

শিল্প স্থাপনের জন্য অনেক লিমিটেড কোম্পানিতে টাকা দিয়েছিলেন, ডিরেক্টরও হয়েছিলেন। অনেক কোম্পানি ফেল করায় বিস্তর টাকা খুইয়েছেন, বদনামও পেয়েছেন কিন্তু ভ্রæক্ষেপ করেননি। কোনো কোম্পানি টাকা ধার করবে, অগ্র-পশ্চাৎ না ভেবে তিনি জামিন হয়ে দাঁড়াতেন। করোনা ভাইরাসের মরণকামড়ের দিনে এই বাঙালি বিজ্ঞানীই অগ্রস্মরণীয়।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj