গল্প > অপেক্ষা

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২০

অদ্বৈত মারুত

আহমাদ কায়সার এখনই আসছে, ফোনে এ কথা নিশ্চিত হওয়ার পরই নিচে নামি। আহমাদ কায়সারের সাথে সাক্ষাৎ ছাড়া নিচের নামার বিশেষ কোনো কারণ ছিল না আজ। প্রায় বারো দিন পর নামলাম। নানা মানুষের মুখ দেখে ভালো লাগছে। সবাই মাস্ক পরে আছে কিন্তু নতুন এক আপদ ভেবে কেউ মাস্ক মুখ থেকে নামিয়ে শুধু নাক ঢেকে রেখেছে, কেউ আবার নাকের নিচে শুধু মুখটা ঢেকে রেখেছে মাস্ক দিয়ে। নাহ, কারও ভেতর কোনো ভয়ডর নেই। আগের মতো পাশাপাশি বসে গল্প গুজব করছে যে যার মতো। কী নিয়ে যেন গল্প করতে করতে হাসিতে ফেটে পড়ল একজন। ‘তুই যা বলেছিস দোস্ত’- বলে পাশেরজনকে জড়িয়ে ধরল। ‘এই, কী করিস, কী করিস’ বলতে গিয়ে সে বন্ধুর হাসির কাছে পরাস্ত হয়ে শুকনো হাসি দিল মুখ চেপে। নাহ, বারো দিন পর হাসিখুশি মুখগুলো দেখে আজ খারাপ লাগছে না। বাঁচার আরেক উপাদান তো এই হাসিই। অথচ বারোটা দিন ধরে আমি হাসি না। হাসতে পারিনি মানে হাসিই আসেনি। পরিবারের সবাই মিলে টিভি দেখা হয় সেই গভীর রাত অব্ধি। শুধু খবর আর খবর। গত চব্বিশ ঘণ্টায় কোথায় কতজন মারা গিয়েছে, কতজন সুস্থ হয়েছে, নতুন আক্রান্ত হয়েছে কয়জন; সব মিলিয়ে মোট হিসাব শোনার এসব খবরের পাশাপাশি দেশে লাফিয়ে লাফিয়ে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হওয়া শুনে, মন্ত্রী, সন্ত্রী, সেপাই, পাইক-পেয়াদা আর বরকন্দাজদের এটার মজুত পর্যাপ্ত, ওটার কোনো সমস্যা নাই, সবকিছু প্রস্তুত- এই রকম বাগড়ম্বর মিথ্যাচার আর ভেতরে ভেতরে তাদের ব্যর্থ মুখ দেখে খুবই শঙ্কার মধ্যে পুরো পরিবার। এর মধ্যে হাসাহাসি করা কিছুটা কঠিন ব্যাপার। অবশ্য তামিল একটা ছবি দেখে একবার হাসি পেয়েছিল বটে কিন্তু প্রাণভরে হাসতে পারিনি। কারণ মাঝরাতে হা হা হা করে হাসলে সবাই জেগে যাবে। অদৃশ্য এক চেতনাবোধ উদয় না হলে তখন পারিবারিক জটিলতা দেখা দিতে পারত। মনে মনে এ কথা ভেবে এখন আবার হাসি পাচ্ছে। কিন্তু ওদের মতো হাসতে পারছি না। লোকজন কী ভাববে ভেবে হাসি গালের ভেতরেই মাড়ি চেপে রেখে আহমাদ কায়সারের জন্য অপেক্ষা করছি। সে এখনো পৌঁছায়নি। আরও দুই মিনিট লাগবে।

আমাদের এই এক জটিল সমস্যা। বাসা থেকে বের না হয়েই ফোনে বলে বসি- দোস্ত, নামো, তোমার গেটের সামনে দাঁড়ায়া আছি। আর কতক্ষণ দাঁড়ায়া রাখবা? আহমাদ কায়সার এই একই কাজ করে থাকতে পারে। কিন্তু ওর জন্য আজ অপেক্ষা করতে খারাপ লাগছে না। এর মধ্যে দুই গাড়ি আর্মি ও এক গাড়ি পুলিশ যাওয়া দেখে লোকগুলো কিছুটা ফাঁক ফাঁক করে বসল। কে ত্রাণসামগ্রী পেল আর কে পেল না, টিসিবির ট্রাক থেকে মাল কিনতে কার কত ঘণ্টা লেগেছে- সে আলাপ থেমে রইল হাঁ-মুখ করে। বাজারের ব্যাগ কিংবা জরুরি কোনো কাজে ঘর থেকে বের হয়েছি বলার মতো আমার কাছে কিছু নাই বলে পাশেই এক ওষুধের দোকানে ঢুকে পড়লাম।

আর্মি ও পুলিশের গাড়ি চলে যাওয়ার পর, আশপাশে ভিড় আরও বেড়ে যাওয়ায় এবং কোনো ধরনের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা না নিয়ে মানুষের এভাবে ঘর থেকে বের হওয়ায় কিছুটা শঙ্কিত হয়ে আহমাদ কায়সারকে আবার ফোন দিয়ে জানতে পারলাম, তার বাসা পুলিশ এইমাত্র ঘিরে ফেলেছে। কাউকে বের হতে দিচ্ছে না এবং ফোনে সে এ কথা জানাল যে, তার ছোট মেয়ে খেলতে গিয়ে কিছুক্ষণ আগে হাত ভেঙে ফেলেছে। কথাটি আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে মেয়ের চিৎকার, কান্নাকাটি শোনাল।

হঠাৎ আগুনে লেলিহান শিখা আর কালো ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে যেতে দেখতে পেলাম। প্রথমে মনে হলো, আমি বুঝি ঠিক নেই। আশপাশের বাসাবাড়ি থেকে চিৎকার, চেঁচামেচি ভেসে আসতে থাকলে, ছাদে ছাদে নারী-পুরুষ জটলা পাকিয়ে আগুন দেখার চেষ্টা করছে দেখে ভালো করে তাকিয়ে দেখি, পাওয়ার হাউসের ভেতর থেকে আগুন জিহ্বা বের করে আশপাশ চাটতে উন্মুখ। আমার মনে উৎকণ্ঠা বেড়ে গিয়ে ঘোঁট পাকতে শুরু করে দেয় যখন, দেখি একজন ফায়ার সার্ভিস অফিসে ফোন দিল। রাস্তা ফাঁকা। আসতে কয়েক মিনিট লাগবে। আমি ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj