বই পাঠ > অবশ্যপাঠ্য একটি বই : হেমলকের নিমন্ত্রণ

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২০

অনিকেত রাজেশ

বইয়ের নামটা শুনলেই সক্রেটিসের কথা মনে আসে। সক্রেটিস হেমলক বিষপানে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। হ্যাঁ, মূল চরিত্র সক্রেটিস। এই উপন্যাসের কোনো চরিত্রই কাল্পনিক নয়। সক্রেটিসের সাথে আছেন তার প্রধান শিষ্য দার্শনিক প্লেটো; ইতিহাসের জনক হেরোডটাস; ট্র্যাজেডি নাটকের তিন পিতা সফোক্লিস, ইউরিপিডিস এবং এস্কিলাস; কমেডি নাটকের জনক এরিস্টোফানিস; চিকিৎসাশাস্ত্রের জনক হিপোক্রাটিস এবং সক্রেটিসের স্ত্রী জেনথিপি। যারা ইউরোপীয় সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করেছেন, তাদের এই উপন্যাসে রক্ত-মাংসে জীবন্ত করেছেন লেখক। এটি সুজন দেবনাথের প্রথম উপন্যাস। তিনি তিন বছর এথেন্সে থাকার সময় গ্রিসে ক্লাসিক্যাল সময়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন খ্রিস্টের জন্মের আগের পঞ্চম শতকটি। এই শতকেই সক্রেটিস বেঁচে ছিলেন। পৃথিবীর জ্ঞানের জগতের অনেক কিছুর শুরু এসময়। কয়েকজন প্রতিভাবান মানুষ অদ্ভুত এক পাগলামি শুরু করেছিল। তাদের পাগলামিতে মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে জন্ম হয়েছিল সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণতন্ত্র, চিকিৎসা, দর্শনসহ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রায় সবকিছু। অন্ধকার থেকে জন্ম নিয়েছিল আলো। এটি ঘটেছিল প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। এথেন্স নামের ছোট্ট একটি শহরে। তাদের সেই পাগলামি আর আলোর জন্মকথা নিয়েই ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’।

এই গল্পে সক্রেটিস দুষ্টুমি আর রসিকতায় সুন্দর জীবনের কথা বলছেন। সেই রসিকতা থেকেই প্লেটো শিখছেন দর্শন, শিখছেন জীবনের মানে। তাদের কথা থেকে জন্ম নিচ্ছে দর্শন, জন্ম হচ্ছে জ্ঞান। একই সাথে সক্রেটিস তুমুল প্রেমিক। তিনি স্ত্রীর সাথে খুনসুটি করছেন, করছেন তুমুল ঝগড়া। চুপিচুপি গল্প করছেন সময়ের সবচেয়ে বুদ্ধিমতী মেয়ে আসপাশিয়ার সাথে। এক বয়সী নারীর কাছে শিখছেন- প্রেম কী জিনিস। আসামি হয়ে দাঁড়িয়েছেন আদালতে। শান্তভাবে চুমুক দিচ্ছেন হেমলক পেয়ালায়। প্লেটো খুঁজে পাচ্ছেন- শরীরের আকর্ষণ ছাড়া সাধু-সন্ন্যাসী ধরনের এক প্রেম। যার নাম প্লেটোনিক প্রেম। রাগে-দুঃখে কবি প্লেটো তার কবিতা, নাটক সব পুড়িয়ে দিচ্ছেন। তিনি কবি থেকে হয়ে যাচ্ছেন কঠিন এক দার্শনিক। প্লেটো তার আদর্শ রাষ্ট্র থেকে কবি-সাহিত্যিকদের নির্বাসন দিচ্ছেন। এভাবে গল্পের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে খুলে যাচ্ছে মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান শুরুর ঘটনা।

এই পুরো বিষয়গুলোকে একটি গল্পে নিয়ে এসে লেখক যে সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, সেটি এক কথায় অনন্য। বাংলা ভাষায় এরকম কাজ আগে হয়নি। গ্রিসের পুরো ক্লাসিক্যাল সময়কে একটি বড় উপন্যাসে ধারণ করা, আগে কখনও হয়নি। বাংলাভাষী সব হেমলকপ্রেমীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য এই বইটি।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj