‘মানুষ’ কেন ‘সামাজিক দূরত্ব’ মানছে না?

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২০


শিরোনামে ‘মানুষ’ শব্দটি ইনভার্টেড কমা বন্দি করার শানে নুজুল হচ্ছে, যারা ঘরে থাকে না, বিচ্ছিন্নতার সবক শুনে না এবং ‘সামাজিক দূরত্ব’ মানে না তাদের বেশিরভাগই মূলত সমাজের শ্রমজীবী, দিনমজুর, খেটে খাওয়া, দিন এনে দিন খাওয়া, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নি¤œবিত্তের মানুষ। উচ্চবিত্তের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ তো বটেই, সমাজের শিক্ষিত-নাগরিক-মধ্যবিত্তেরও অনেকের চোখে এসব আবার ‘মানুষ’ নাকি! উপরতলার মানুষের কাছে ‘অসভ্য’, ‘বর্বর’, ‘ফকিরনির পুত’ এবং ‘ছোটলোকের জাত’ হচ্ছে এসব নিচতলার মানুষের আইডেনটিটি! তাই এ প্রবন্ধে ইনভার্টেড কমা বন্দি করে ‘মানুষ’ বলতে এসব ‘ছোটলোকদের’ বোঝানো হয়েছে কেননা সমাজে বিদ্যমান ‘মানুষ’ সম্পর্কিত এ মহাবয়ান আমি গ্রহণ করি না। আর ‘সামাজিক দূরত্ব’কেও ইনভার্টেড কমা দিয়ে লেখার মূল কারণ ‘সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং’ আসলে পাশ্চাত্য থেকে আমদানি করা একটা শব্দ, যাকে আমরা আনক্রিটিক্যালি সাধারণ মানুষের ওপর আরোপ করে চাপিয়ে দিয়েছি। কিন্তু এ শব্দটা হবে আদতে ‘সামাজিক দূরত্ব’ নয়, বরঞ্চ ‘শারীরিক দূরত্ব’ যা করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বিস্তার রোধের প্রেসকিপশন হিসেবে বাজারে বিলানো হচ্ছে। সুতরাং দুটি শব্দকে ইনভার্টেড কমা বন্দি করলেও শিরোনামের মূলার্থ হচ্ছে, সমাজের শ্রমজীবী মানুষ কেন শারীরিক দূরত্ব মানছে না। অর্থাৎ এত অনুরোধ-আবদার-সবক-ধমক দিয়ে ঘরে থাকতে বলার পরও কেন তারা ঘরে থাকে না বা বের হয়ে সামাজিক দূরত্ব মানছে না। এ ঘরে না থাকাটা বা সামাজিক দূরত্ব না মানাটা কী কেবলই অবাধ্যতা, নাকি এর অন্য কোনো সামাজিক-অর্থনৈতিক এবং ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত আছে, এ প্রবন্ধে সেটার শানে নুজুল উপলব্ধির চেষ্টা করা হয়েছে।

একথা অনস্বীকার্য যে, করোনা ভাইরাস ইতোমধ্যেই আমাদের সবকিছু দখল করে নিয়েছে। আমাদের চিন্তা-দুশ্চিন্তা, আমাদের আশা-হতাশা, আমাদের উদ্বেগ-উত্তেজনা, আমাদের আতঙ্ক-মৃত্যুভয়, আমাদের নিকট বর্তমান-দূরাগত ভবিষ্যৎ, আমাদের ইলেকট্রনিক প্রিন্ট স্যোশ্যাল মিডিয়া, আমার রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রাম-পলিসি, আমাদের চিকিৎসক-চিকিৎসাব্যবস্থা, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সামরিক-বেসামরিক বাহিনী, আমাদের সরকার-রাষ্ট্রযন্ত্র, আমাদের সাংবাদিকতা-বুদ্ধিজীবীতা, আমাদের কলম-কলাম, আমাদের আলোচনা-সমালোচনা, আমাদের ঘৃণা-ভালোবাসা, আমাদের দেখানোপনা-লুকোনোপনা এবং আমাদের দানের উদারতা-চুরির বদভ্যাস সবাই করোনা-কেন্দ্রিক। প্রতিদিন মৃত্যুর উলম্ফন এবং সংক্রমণের স্কোরকার্ড দেখে দেখে আমাদের দিন কাটে। তবে মিডিয়া প্রতিদিন সংক্রমণ এবং মৃত্যুর স্কোর প্রকাশ করার পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিয়ে মানুষের সামাজিক দূরত্ব না মানার নানা স্থিরচিত্র প্রথম পৃষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে। এখন করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতি বাংলাদেশে এমন করে উপস্থাপিত হয় যেন এটা হচ্ছে উচ্চবিত্তের উদ্বেগ, মধ্যবিত্তের আতঙ্ক আর নি¤œবিত্তের অবাধ্যতা। উচ্চবিত্তের উদ্বেগের প্রধান কারণ হচ্ছে করোনা ভাইরাসের কারণে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়মিত মুনাফা প্রবাহ অনিয়মিত হয়ে গেল। কবে ঠিক হবে সবকিছু, কবে থেকে সবকিছু আগের মতো চলবে, চলমান অবস্থা সামাল দিতে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে কত কম সুদের কত টাকা আদায় করা যায় প্রভৃতি হচ্ছে বেশিরভাগ উচ্চবিত্তের প্রধান কারণ। এটাই স্বীকার্য যে, উচ্চবিত্তের অনেকেই এ দুঃসময়ে সমাজ ও মানুষের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে। তবে সমাজের মধ্যবিত্তরা আছে সবচেয়ে বিপদে। তাদের হয়তো মাস-কাবারি বেতন চলছে, কিন্তু একটা বাড়ি-গাড়ি কেনার স্বপ্নে বিভোর, সন্তান-সন্ততিদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে কিছু বাড়তি আয়ের যে ব্যবস্থা সেটা বন্ধ হয়ে গেছে; করোনায় আক্রান্ত হয়ে যদি (খোদা না করুক!) কিছু একটা ঘটে যায়, তাহলে স্বপ্নের ওপর স্বপ্ন বসিয়ে স্বপ্নের যে পাহাড় তৈরি করেছিল, সেটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। তাই মধ্যবিত্ত আছে অকাল মৃত্যুর আতঙ্কে। তবে এটাও স্বীকার্য মধ্যবিত্তের অনেকে এ করোনাকালে নানা সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে। আর নি¤œবিত্তের মানুষ যারা দিন এনে দিন খায়, বস্তিতে থাকে, দিনমজুরি করে, রিকশা চালায়, বাসাবাড়িতে কাম-কাজ করে, নির্মাণ শ্রমিক, ঠেলাওয়ালা কিংবা এ জাতীয় মানুষজন, তাদের তো ঘরে বসে থাকার জো নেই। ঘরে বসে বসে না খেয়ে মরার চেয়ে কিছু করে খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করাটাই তারা শ্রেয় মনে করে। সুতরাং সর্বত্র যখন করোনা আক্রমণের শঙ্কা, তখন এসব শ্রমজীবী মানুষের কেউ শখ করে বাইরে বের হয় না। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নেয় তারা যাকে আমরা নি¤œবিত্তের ‘অবাধ্যতা’ হিসেবে উপস্থাপন করি। মনে রাখতে হবে যে, সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক অসমতা এবং ক্ষমতার অসম সম্পর্ক জিইয়ে রেখে সমাজের সবার জন্য একই পলিসি কখনই কার্যকর হওয়ার কথা নয়। সুতরাং পুলিশের দৌড়ানি দিয়ে (ইদানীং গান-বাজনা দিয়ে!), র‌্যাবের ভয় দিয়ে এবং মিলিটারির ধমক দিয়ে লাঠিপেটা করে জীবনের তাগিদে ঘরের বাইরে আসা মানুষগুলোকে আপনি ঘরে ফেরাতে পারবেন না বা সামাজিক দূরত্ব মানাতে পারবেন না। তাই তাদের ঘরে থাকার এবং ঘরে রাখার ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেই করতে হবে। আর ঘরে থাকলেই সামাজিক দূরত্ব আপনাআপনিই মানা হয়ে যাবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ঘরে তাদের রাখবেন কীভাবে? কিংবা ঘর থেকে বের হলে তাকে ঘরে ফেরাবেন কীভাবে?

একটি সাধারণ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা সাড়ে ৩ কোটি। তার মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যা হচ্ছে দিনমজুর। দিনমজুর হচ্ছে তারা যারা দিনে এনে দিনে খায়। একদিন কাজ না করতে পারলে পরেরদিন তাদের না খেয়ে থাকতে হয়। এখন করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য তাদের যদি ঘরে অবস্থান করতে হয়, তাহলে তাদের পক্ষে সেটা বেশি দিন মানা করা সম্ভব নয়। তাই তাদের ঘরে রাখতে হলে দুবেলা খেয়েপরে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়, সেটা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। প্রধানমন্ত্রী বারবার তার সদিচ্ছার কথা উল্লেখ করেছেন। বারবার বলেছেন, এ রকম একটি পরিস্থিতিতে যদি প্রয়োজন হয়, ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে এবং সেটা একটু পরিকল্পনা করে করলে খুবই সহজ। ইতোমধ্যে ৫০ লাখ কার্ড বিতরণ করা হয়েছে এবং আরো ৫০ লাখ কার্ড বিতরণ করা হবে যার মাধ্যমে সমাজের নি¤œ আয়ের মানুষ অন্তত দুবেলা দুমুটো খেয়েপরে বেঁচে থাকতে পারবে। বাংলাদেশে একটা চমৎকার প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ কাঠামোগতভাবেই বিদ্যমান আছে, যেমন- বিভাগ, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন। আমার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব হচ্ছে, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের এ ভাগগুলোকে এক একটা ইউনিট ধরে একটা ‘খাদ্য সহায়তা প্রকল্প’ তৈরি করা যার মাধ্যমে প্রতিটি ঘরে ঘরে অন্তত এ আপৎকালীন সময়ে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব। প্রতিটা ইউনিয়নের আওতাধীন গ্রাম বা মহল্লাভিত্তিক একটা করে তালিকা তৈরি করে, পরে সেটা ইউনিয়নভিত্তিক করা এবং সমস্ত ইউনিয়নভিত্তিক তালিকাকে একত্র করে উপজেলাভিত্তিক তালিকা করা; একইভাবে জেলাভিত্তিক হবে এবং সব জেলার তালিকা নিয়ে বিভাগভিত্তিক হবে। আর সব বিভাগের তালিকা এক জায়গা আনলে পুরো দেশের কতজন মানুষের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় খাদ্য সাহায্য দরকার তার একটা চেহারা পাওয়া যাবে। আমার মনে হয়, এটা খুব কঠিন কোনো কাজ নয়। যদি শ্রমজীবী, দিনমজুর এবং দুস্থ মানুষদের খাদ্যের সংস্থান করা যায়, তাহলে সামাজিক দূরত্ব না মানার যে প্রবণতা সেটা অনেকাংশে কমে যাবে। সুতরাং সামাজিক দূরত্ব না মানার জন্য এসব শ্রমজীবী মানুষকে এককভাবে দায়ী করা যাবে না। কেননা সমাজে বিদ্যমান অসমতা জিইয়ে রেখে সমাজের সব স্তরের মানুষের জন্য একই রাষ্ট্রীয় পলিসি কোনোভাবেই কার্যকর হওয়ার কথা নয়। তাই রাষ্ট্রীয় পলিসি গ্রহণের ক্ষেত্রে সমাজের বিদ্যমান ব্যবস্থায় মানুষের সামাজিক অবস্থা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জীবনযাত্রার মান, জীবিকার উৎস, জীবনযাপনে ধরন এবং শ্রেণি-পেশার তারতম্য বিবেচনায় নিতে হবে।

পরিশেষে বলব, সমাজের শ্রমজীবী মানুষ সামাজিক দূরত্ব মানছে না বা না মানতে বাধ্য হচ্ছে মোটা দাগে পেটের দায়ে, জীবিকার চরিত্রগত কারণে এবং অন্নসংস্থানের বাসনায় কিন্তু সমাজের মধ্যবিত্ত, নি¤œমধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের কিছু মানুষ সামাজিক দূরত্ব কেন মানছে না, সেটাও বিবেচনায় নেয়া জরুরি। যারা এ দূরত্ব মানছে না, তাদের অনেকের সাক্ষাৎকার বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে যার সারসংক্ষেপ হচ্ছে, ‘ঘরে থাকতে ভালো লাগে না’, ‘একটু ঘুরতে বের হওয়া’, ‘সচেতনতার অভাব’, ‘আইন অমান্য করার প্রবণতা’ এবং কোনো প্রয়োজনে বের হলেও সামাজিক দূরত্ব মানার ক্ষেত্রে ‘ড্যাম কেয়ার ভাব’। এসব মানুষকে ঘরে রাখার জন্য এবং সামাজিক দূরত্ব মানতে বাধ্য করার জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি। কেননা বাংলাদেশ এখন করোনা ভাইরাস সংক্রমণের চতুর্থ স্তরে আছে অর্থাৎ স্থানীয় পর্যায়ে সংক্রমণ শুরু হয়ে গেছে। এবং শতকরা ৪০ ভাগ কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগীর মধ্যে রোগের কোনো উপসর্গই দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় অকারণে ঘরে থাকার নির্দেশনা ভঙ্গ করা এবং যত্রতত্র ঘোরাঘুরি করা করোনা ভাইরাস সংক্রমণের পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তুলবে। শ্রমজীবী মানুষকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে তাদের অন্ন সংস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করে তাদের ঘরে রাখার মাধ্যমে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে আর যারা শখে, প্রবণতায় এবং ‘ড্যাম কেয়ার ভাব’ নিয়ে সামাজিক দূরত্বের নির্দেশনা অমান্য করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের যে ভয়াবহ রূপ আমরা কত কয়েক মাস ধরে দেখছি, তাতে একমাত্র সামাজিক দূরত্ব (শারীরিক দূরত্ব) মানার অভ্যাসই আমাদের বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন : নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj