লকডাউনের ওপর নির্ভর করছে করোনার ভবিষ্যৎ

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২০

অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য : করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত রোগী প্রতিদিনই শনাক্ত হচ্ছেন এবং নতুন নতুন এলাকায় তা ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এখন যে ট্রেন্ড চলছে তা থেকে রোগীর সংখ্যা বাড়বে না, কমবে? তা জানতে আরো সপ্তাহ দুয়েক অপেক্ষা করতে বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, যদি লকডাউন কার্যকরভাবে মেনে চলে দিন পনেরোর মধ্যেই করোনার সংক্রমণ আয়ত্বে আনা সম্ভব। আর লকডাউন যদি ঢিমেতালে চলে তাহলে বাংলাদেশকে কড়া মূল্য দিতে হবে।

গত ২০ এপ্রিল দেশে করোনার রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন ৪৯২ জন। এরপর ২১ এপ্রিল তা কমে এসেছে ৪৩৪ জনে। আর গতকাল বুধবার ৩৯০ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। সবমিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৭২ জনে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগরেই রোগীর সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। অন্যদিকে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে গত তিনদিন ধরে দেশে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ১০ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১২০ জন হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় অর্ধশতাধিক এবং নারায়ণগঞ্জে ৩৫ জন মারা গেছেন। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জের পরে করোনা এখন গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদীতে শেকড় ছড়াচ্ছে। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৩ জন রোগী বেড়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে গত কদিনে করোনার নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানোর পর আক্রান্তের সংখ্যা গত দুদিনে কমে এসেছে। তবে মৃতের সংখ্যা প্রায় একই রয়েছে। এ অবস্থায় দেশে করোনা ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে যাচ্ছে- এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, কোনো কারণে হয়তো আক্রান্তের সংখ্যা কম হয়েছে। কিন্তু যেভাবে দেশজুড়ে উপসর্গহীন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে তাতে আক্রান্তের হার ঊর্ধ্বমুখী হবে। আবার কেউ বলছেন, ভাইরাসটি এখন কোন অবস্থায় রয়েছে তা বিশ্লেষণের সময় আসেনি। এজন্য আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

জানতে চাইলে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ ভোরের কাগজকে বলেন, গত দুদিন ধরে আক্রান্তের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। আমার ধারণা এপ্রিলের বাকি দিনগুলোতে পরিস্থিতি অনেকটা আয়ত্বে আসবে। এজন্য কড়াকড়িভাবে লকডাউন মানতে হবে। সুফল পেতে হলে বিশেষ করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর তিনি জোর দিয়েছেন। আর এসব মেনে চললে সুখবর আশা করা যাবে। আক্রান্ত হওয়ার পরে তরুণদের বেশি মৃত্যুও কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ধারণা করা হয়েছিল এই রোগে বয়স্করা বেশি মারা যাবেন। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি মেনে তারা ঘরে থাকছেন। এর ফলে বয়স্কদের মৃত্যহার কম। অন্যদিকে কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলে হুটহাট ঘরের বাইরে আসছেন তরুণরা। বাইরে এসে বিভিন্ন নেশা করছেন। এ কারণে তাদের মধ্যে আক্রান্তের হার যেমন বেশি, তেমনি মারা যাওয়ার সংখ্যাও বেশি।

জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব গতকাল ভোরের কাগজকে বলেন, আক্রান্তের চিত্রটা পুরোপুরিভাবে এখনো বোঝা যাচ্ছে না। তবে ভাইরাসটি এখন ‘ফ্ল্যাট’ আছে। এর গতিপ্রকৃতি কি হবে তা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পরিষ্কার হবে। যারা এবং যাদের পরিবার আক্রান্ত হয়েছেন তারা এখন ঘর থেকে বেরোচ্ছেন না। যারা এখনো আক্রান্ত হননি এবং উপসর্গহীন রয়েছেন তাদের জন্য ঝুঁকি রয়েছে। এজন্য ঘরে থাকার ওপর জোর দেন তিনি।

গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ৩৯০, মৃত্যু ১০ : দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ভাইরাসে আরো ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে করোনা ভাইরাসে মোট মৃতের সংখ্যা ১২০ জন। একদিনে নতুন করে আরো করোনা শনাক্ত হয়েছেন ৩৯০ জন। ২৪ ঘণ্টায় ৩ হাজার ৯৬টি নমুনা পরীক্ষা করে এই ফল পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত করোনায় মোট শনাক্ত হলেন তিন হাজার ৭৭২ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন পাঁচ জন, এখন পর্যন্ত মোট সুস্থ হলেন ৯২ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিনে দেশের করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত সার্বিক পরিস্থিতি জানিয়ে গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ হয়েছিল ৩ হাজার ৫২টি। আগের দিনের কিছু নমুনা পরীক্ষা বাকি ছিল, তাই নমুনা পরীক্ষার হার আগের দিনের চেয়ে দশমিক এক শতাংশ বেশি। গত ২৪ ঘণ্টায় যারা মারা গেছেন, তাদের বিষয়ে অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা বলেন, যারা মারা গেছেন, তাদের মধ্যে পুরুষ সাতজন এবং নারী তিনজন। এদের মধ্যে সাতজন ঢাকার ভেতরে এবং ঢাকার বাইরের তিনজন রয়েছেন। মৃতদের মধ্যে ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের একজন রয়েছেন। এদের মধ্যে ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে তিনজন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে দুজন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে তিনজন এবং ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে দুইজন আছেন।

করোনায় আক্রান্ত ৮৫ শতাংশই ঢাকা বিভাগে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক নাসিমা সুলতানা বলেছেন, সারাদেশে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৭৭২ জন। এদের মধ্যে ৮৫ দশমিক ২৭ শতাংশই ঢাকা বিভাগে। শুধু ঢাকা মহানগর করোনায় শনাক্ত হয়েছে ৪৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ, সংখ্যার হিসেবে ১ হাজার ৪৭৫ জন। আর ঢাকা বিভাগে (ঢাকা মহানগর বাদে) আক্রান্তের পরিসংখ্যান হচ্ছে ৩৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ, সংখ্যায় ১ হাজার ২৮১ জন।

এছাড়া দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৫ জেলায় করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। ঢাকা বিভাগের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের ব্যাপারে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৫০৮ জন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে করোনা শনাক্ত হয়েছেন ৩৬৪ জন। নারায়ণগঞ্জে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৩৫ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ১৬ জন। ঢাকা বিভাগের নারায়ণগঞ্জের পর আশঙ্কাজনক অবস্থায় আছে গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদী জেলা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, এখন আমাদের কাজ হচ্ছে সংক্রমণের বিস্তার বন্ধ করে দেয়া। নারায়ণগঞ্জের মতো যেসব জেলায় সংক্রমণ হচ্ছে, সেটা পুরোপুরি লকডাউন করে দেয়া। কিন্তু আমরা দেখছি, অনেক মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। আবার যে বেরিয়েছে, সেও রোগের বিষয়ে জানে। তবুও সে ঘরে না থেকে বাইরে আসছে। এ ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদাসীনতা কাজ করছে।

নারায়ণগঞ্জে আক্রান্তের সংখ্যা ৫শ ছাড়াল : নারায়ণগঞ্জে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৫শ ছাড়াল। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত আইইডিসিআরে ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, জেলাটিতে এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৫০৮ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলাটিতে নতুন করে ৭৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনেরই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৬৩ জন। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, জেলাটিতে চলমান লকডাউন কড়াকড়িভাবে কার্যকর না হলে আক্রান্তের সংখ্যা আরো বাড়বে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj