একা শেখ হাসিনাকেই সব দায়িত্ব নিতে হবে?

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২০


কী এক ভয়ঙ্কর সময়ের মধ্য দিয়ে সমগ্র বিশ্ববাসীর মতো বাংলাদেশের মানুষও জীবনযাপন করছেন তা আর নতুন করে উল্লেখের প্রয়োজন নেই। ‘নতুন’ ভাইরাসঘটিত করোনার তাণ্ডবে সমগ্র বিশ্ব যখন টালমাটাল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ঠিক এমন সময়ে বাংলাদেশ ‘চির-পুরাতন’ লুটেরা-স্বভাবী আরো এক উপদ্রবে টালমাটাল অবস্থায় পড়েছে। এ দেশের অসহায় মানুষের জন্য প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যে ত্রাণ ও খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করেছেন, নি¤œ আয়ের মানুষের জন্য ১০ টাকা মূল্যের যে চালের ব্যবস্থা করেছেন তা তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছাতে লুটেরা ও রিলিফ চোর-ভাইরাসরা সৃষ্টি করছে করোনার অতিরিক্ত আরো এক ভয়াবহ টালমাটাল অবস্থা! করোনা অদৃশ্য শত্রু আর চোরাকারবারিরা দৃশ্যমান শত্রু। এখন কাকে রেখে কাকে মোকাবিলা করা হবে? আর কে-ই বা মোকাবিলা করবেন? জননেত্রী শেখ হাসিনার ওপরই বর্তেছে যেন ‘এই ভুবনের ভার’। একা তাকেই সবকিছু করতে হবে। মহামারির কবল থেকে জাতিকে সুরক্ষার প্রত্যয়ে তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করলেও দেশব্যাপ্ত চোরের দল হাঁ করে বসে আছেন সব ত্রাণ ও রিলিফের সামগ্রী আত্মসাতের জন্য!

একবিংশ শতাব্দীর এই ডিজিটাল যুগে এসে আমরা দেখতে পাচ্ছি সদ্য-স্বাধীন দেশটির মতো চোরাকারবারি, দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের সীমাহীন দৌরাত্ম্য! মহামারির এমন দুর্যোগে চোরাকারবারিদের আপন স্বভাব প্রকাশিত। তারা বিপুল উৎসাহে রিলিফের খাদ্য সামগ্রী আত্মসাতে মেতে উঠেছে! জননেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে যতই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয় ততই যেন পাল্লা দিয়ে ত্রাণ ও অন্যান্য সহায়তার খাদ্য সামগ্রী নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ডিলারদের মধ্যে লোপাটের মহোৎসব চলে! এত স্পর্ধা তারা কোথায় পায় ভেবে বিস্মিত হই! বিপদগ্রস্ত মানুষের মুখের আহার নিয়ে যারা প্রতিনিয়ত সরকারি খাদ্য সামগ্রী আত্মসাৎ করছে করোনা পরিস্থিতির সাম্প্রতিক সংকটকাল বিবেচনায় নিয়ে সেসব অমানুষের অতিদ্রুত বিশেষ বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন এখন সময়ের দাবি। এমন সংকটকালে শুধু তাৎক্ষণিক ‘জরিমানা’ কিংবা দায়িত্ব থেকে ‘অব্যাহতি’ কোনো বিচার হতে পারে না। জনসমক্ষে এসব অপরাধীর কঠিন ‘শাস্তি’ দিয়ে সরকারের উচিত ‘দৃষ্টান্ত’ স্থাপন করা। দুয়েকটি স্থানে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ‘কঠোর’ বিচারিক প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হলে অন্যরা সতর্ক হতে পারে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এসব চোরাকারবারির পূর্বপুরুষদের (!) সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। দুর্নীতিগ্রস্ত সেসব চোরাকারবারির যন্ত্রণায় তিনি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। এক ভাষণে তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন : ‘এখনো ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, চোরাকারবারি, মুনাফাখুরি, বাংলার দুঃখী মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। দীর্ঘ তিন বৎসর পর্যন্ত এদের আমি অনুরোধ করেছি, আবেদন করেছি, হুমকি দিয়েছি। চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনী। […] বিদেশ থেকে ভিক্ষা করে আমাকে আনতে হয়, আর এই চোরের দল আমার দুঃখী মানুষের সর্বনাশ করে, এরা লুটতরাজ করে খায়। […] এই বাংলার মাটি থেকে দুর্নীতিবাজ, এই ঘুষখোর, এই মুনাফাখুরি এই চোরাকারবারিদের নির্মূল করতে হবে। […] যে, কয়েকটা চোরাকারবারি, মুনাফাখোর, ঘুষখোর দেশের সম্পদ বাইরে বের করে দিয়ে আসে, জিনিসের দাম, গুদাম করে মানুষকে না খাওয়াইয়া মারে! উৎখাত করতে হবে বাংলার বুকে থেকে এদের।’ আজকের রিলিফচোরদের কাণ্ডকারখানাদৃষ্টে ১৯৭৪ সালে প্রদত্ত জাতির পিতার এই ভাষণটির কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে বংশপরম্পরায় এই গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা এখনো বহাল তবিয়তে বাংলাদেশে আছেন- আছেন সরকারদলীয় ছত্রছায়ায়ই!

সদ্য-স্বাধীন দেশে ‘রিলিফ-চোরা’ শব্দটি জনপ্রিয় ছিল। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে সেসব চোরাকারবারির উত্তর-প্রজন্ম আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় আবারো কি পুনর্জীবন লাভ করেছে? সেসব লুটেরা মহামারি করোনাকে একটি ‘সুযোগ’ হিসেবে গ্রহণ করেছে বলেই আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে। তা না হলে এমন ঘোর দুর্দিনে কোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষ কী করে ত্রাণের খাদ্য লোপাট করে? ঘরের ভেতর গর্ত করে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখে? কি করে গরিবের জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্য সহায়তা আত্মীয়ের বাড়িতে গোপন করে? ধিক তাদের! আমরা কোথায় আছি, মানুষ হিসেবে কতটা পচে গেছি, কতটা হীন হয়ে গেছি? স্বভাবে আমরা কী পরিমাণ নষ্ট ও ভ্রষ্ট হয়ে গেছি তার প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাপিয়ে প্রধান ধারার গণমাধ্যমেও দেখতে পাচ্ছি। করোনা সংক্রমণের বৈশ্বিক মহামারিকালে আমাদের এই অবর্ণনীয় পচনশীলতার, মানসিক নিচতার, অমানুষিকতার, নষ্ট ও ভ্রষ্ট স্বভাব-চরিত্রের প্রকাশ দেখে কেবল বিস্মিত নয় রীতিমতো বিরক্তও বোধ করছি। আমরা দেখতে পাচ্ছি দেশের বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় সরকার প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কর্মকাণ্ডের সীমাহীন নিচতা ও লোভ-লালসার নিকৃষ্টতার ধারাবাহিক চিত্র। তাদের এই কর্মকাণ্ডে মানুষ হিসেবে আমাদের খুব খাটো করে, ক্ষুদ্র করে। মানবিক মূল্যবোধকে প্রচণ্ড এক বিদ্রƒপের ভাগাড়ে নিক্ষেপ করে। দরিদ্র অসহায় মানুষদের সঙ্গে সরকার-সংলগ্ন এসব ব্যক্তির প্রতারণা ও দুর্নীতি আমাদের ভাবিয়ে তোলে। জনপ্রতিনিধিরূপ এসব লোভী মানুষের চাতুর্য আর অবৈধভাবে সম্পদ উপার্জনের কৌশল আমাদের হতাশ করে। আমরা খুবই অসহায় ও পীড়িত বোধ করি যখন দেখি কোনো ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দ্বারা অসহায় দরিদ্রদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের ‘ফটো সেশন’ শেষে তাদের কাছ থেকে সেসব ত্রাণ জোরপূর্বক কেড়ে নেয়া হয়! তাদের লাঠিপেটা পর্যন্ত করা হয়! এসব সংবাদে মানুষ হিসেবে যেমন সংকোচ বোধ হয় তেমনি অসহায়ও বোধ করি। ভাবি, কোথায় আছি আমরা, আমাদের যাত্রাই বা কোন লক্ষ্যের অভিমুখে! এ ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম অঞ্চলে। অবশ্য সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানকে স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ বরখাস্ত করেছে। শুধু বরখাস্তই নয়, বরং এরূপ অমানবিক উপহাসের জন্য গুরুতর শাস্তি সবার প্রত্যশা। আবার দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণের চাল সম্প্রতি উদ্ধার করা হলো ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলার কোনো এক ইউপি সদস্যের ঘরের মেঝে গর্ত খুঁড়ে! সেখানে অনুসন্ধানী দল মাটির নিচ থেকে বস্তা বস্তা চাল আবিষ্কার করে! আবার তারই আরেক সাগরেদের (চৌকিদার) বাড়ি থেকেও কয়েক বস্তা চাল উদ্ধার করা হয়। ঘটনা দুটি কেবল উদারহণ মাত্র। প্রতিদিনকার সংবাদে এ নিয়ে যুক্ত হয়েছে নতুন ‘আইটেম’। সম্প্রতি দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণের সরকারি চাল নিয়ে সারাদেশেই প্রায় একই রকমের ঘটনা ঘটছে। এ যেন বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের রিলিফের সেই কম্বলের কথাই মনে করিয়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকেই দায়িত্ব নিতে হবে এ দেশ থেকে নতুন ভাইরাস করোনা ও পুরনো ভাইরাস দুর্নীতিকে সমূলে উৎপাটনের। তার বিকল্প কেউ নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে এসব চোর ও দুর্নীতিবাজকে সতর্ক করছেন। কিন্তু ‘চোরা না শোনে ধমের্রও কাহিনী’। এখন জনগণের মধ্য থেকেও এসব দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি উঠেছে। একদিকে করোনা-তাণ্ডব অপরদিকে জনপ্রতিনিধিদের অমানবিক কীর্তিকলাপ আশার আলো দেখার সব পথ যেন চারদিক থেকে রুদ্ধ করে দেয়! এসব দেখেশুনে রবীন্দ্রনাথের কবিতার সেই চরণগুলো মনের মধ্যে উঁকি মারে। প্রায় শতবর্ষ আগে ভিন্ন কোনো অবকাশে তিনি লিখেছিলেন : ‘দুঃখ যেন জাল পেতেছে চার দিকে;/ চেয়ে দেখি যার দিকে/ সবাই যেন দুর্গ্রহদের মন্ত্রণায়/ গুমরে কাঁদে যন্ত্রণায়/ লাগছে মনে এই জীবনের মূল্য নেই/ আজকে দিনের চিত্তদাহের তুল্য নেই।’

করোনা সমগ্র বিশ্বকে একেবারে এলোমেলো করে দিয়েছে। এলোমেলো করে দিয়েছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি, ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিল্প-সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি মানসিকভাবে। ধর্মীয়ভাবেও করোনা আমাদের ভিন্নভাবে চিন্তার অবকাশ করে দিয়েছে! কেউ কি কখনো ভেবেছিল বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের মসজিদে যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত হবে? কেউ কি ভেবেছিল মানুষ মানুষের হাত স্পর্শ করতে পারবে না, পারবে না দীর্ঘ বিরতির পর সাক্ষাতে পরম বন্ধুরা পরস্পর বুকে আলিঙ্গন করতে! এক অদ্ভুত রোগ আমাদের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে! সমগ্র মানব সভ্যতাকে কীভাবে বিপন্ন করে তুলল করোনা নামক ভাইরাসটি! চীন থেকে শুরু করে এখন সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে কী বিচিত্র শক্তিমত্তায় লাখো মানুষকে মৃত্যুর কোলে নিপতিত করেছে। বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়ে কী তেজস্বিতায় মানুষকে মৃত্যুর মিছিলে নিক্ষেপ করছে। মহাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো এই ভাইরাসের কাছে যে কত বড় অসহায় তার প্রমাণ বহন করে চলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, প্রমাণ বহন করে চলেছে যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, চীন, জার্মানি, ইরান, রাশিয়া, সৌদি আরবসহ অনেক দেশ? সবার বিনীত দুই হাত এখন পরম ¯্রষ্টার উদ্দেশ্যে। বিজ্ঞানীরা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু এখনো তারা কোনো আলোর ইঙ্গিত পাচ্ছেন না। তাদেরও দুচোখে যেন অসহায়ত্বের অশ্রæজল! করোনা বিপর্যয়ের এই সংকটকালে সবচেয়ে বড় অসহায় অশ্রæ বিসর্জন করেছেন সম্ভবত ডাক্তাররূপী সম্মুখসারির যোদ্ধারা। যারা অনেক চেষ্টার পরও রোগীর মুখে হাসি ফোটাতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে রোগী দেহের সংক্রমিত ভাইরাস বহন করে নিজেরাও মৃত্যুর দীর্ঘ সারিতে যুক্ত হচ্ছেন। ধন্যবাদ হে ডাক্তাররা, আপনাদের অভিবাদন! আজ হোক বা কাল এ যুদ্ধে আপনারা জয় নিয়েই ফিরবেন এই ভরসা আমাদের।

পুনশ্চ. দেশব্যাপী স্থানীয় সরকারের অনেক সদস্য নিজস্ব তহবিল ও ভাণ্ডার থেকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সংখ্যায় এরাই বেশি। তাদের স্যালুট। কতিপয় অসৎ নেতাকর্মীর জন্য ক্ষুণœ হচ্ছে সরকারের ভাবমূর্তি! প্রধানমন্ত্রী, আপনার কঠোর হুঁশিয়ারি এসব পথভ্রষ্টদের ওপর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়ে আবর্তিত হোক।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj