করোনাকালের পরবর্তী পুনরুজ্জীবন

বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২০


দক্ষিণ এশিয়ার মানুষগুলো কলেরা দেখেছে, দেখেছে গুটিবসন্ত। এই পৃথিবী দেখেছে প্লেগ, স্প্যানিশ ফ্লু। আফ্রিকার গর্ভে লালিত এইডস আতঙ্ক ছড়িয়েছে সারা বিশ্বে। মাত্র চার বছর আগের আফ্রিকার ইবোলা ভাইরাসেও আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিল এ পৃথিবী, যদিও সারা পৃথিবী ঝলসে ওঠেনি। আর এভাবেই পৃথিবী সময়ে সময়ে দেখেছে হাজারো লাখো কিংবা কোটি মৃত্যু। জীবনের গতি থেমেছে, কিন্তু তারপরও জেগে উঠেছে মানুষ। পুরনো সবকিছু ঝেরে ফেলে আবারো পথ চলেছে এ সভ্যতা।

এবারের করোনা প্যান্ডামিক যেন এক ভয়ঙ্কর অদৃশ্য আগুন। যে অনল পোড়াচ্ছে মানব সভ্যতা। এতে পুড়ছে না কিছুই। শুধু মরছে মানুষ। একটা জনপ্রিয় পোর্টাল কিংবা ফেসবুক পেইজে যেমন ‘লাইক’ কিংবা ফলোয়ারের সংখ্যা বাড়ে মিনিটে মিনিটে কিংবা জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের যেমন ভোটার গণনা করা হয়, ডিজিটাল বোর্ডে দেখি বিভিন্ন ওয়ার্ডের ভোটের ফলাফল, ঠিক তেমনি যেন আমরা তাকিয়ে থাকি করোনা ভাইরাসের আউটব্রেকের দিকে। এমনকি এখন আপনিও যখন পড়ছেন এ লেখাটি, তখনো ক্রমাগতই পরিবর্তিত হচ্ছে সংখ্যা। শত শত নয়, হাজার হাজার মৃত্যু প্রতিদিন। ইংল্যান্ড কিংবা ইউরোপ, আমেরিকা কিংবা সৌদি আরব, ভারত কিংবা পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত- মাত্র ক’মাসে দেড় লাখ পেরিয়েছে এ মৃত্যু, শুধু এ ভাইরাসে।

বদলে যাচ্ছে সামাজ। সারা পৃথিবী বদ্ধ। ‘থাকবো না বদ্ধ ঘরে’র মানুষ আজ ভয়ে কুঁকড়ে আছে। মানুষ আজ মানুষকে বড় বেশি ডরায়। কেউ কারো পাশে যায় না। অথচ ভালোবেসে একে অপরকে পাশে টেনে নেয়ার সত্যটুকু শিখে নিয়েই আমরা বেড়ে উঠেছি। এই সত্যটুকু হারিয়ে গেছে মাত্র ক’মাসের মহামারিতে। সভ্যতা যেন ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। বছরের পর বছর ক্যানসার আক্রান্ত আমার এক ভাবি মারা গেলেন লন্ডনে গত সপ্তাহে। মৃত্যুর দু’দিন আগে তার ছেলেরা অনেক বলে-কয়ে যুক্তি-আবেগ সবকিছু মাখিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে তাদের মাকে নিয়ে এসেছিল বাসায়। অন্তত ছেলেমেয়েদের ভালোবাসার শেষ স্পর্শটুকু দিয়ে তাকে বিদায় জানাতে এ অনুরোধটুকু করেছিল তার সন্তানরা। সেই ভাবির শেষ যাত্রায় আমিও যাইনি। মাত্র ১০ জন মানুষের উপস্থিতির অনুমোদন সাপেক্ষে জানাজা হয়েছে। করোনার সার্টিফিকেট নয়, তবুও মাত্র পাঁচ ছেলেই উপস্থিত থেকেছে মার সমাধি সময়ে।

বদলে যাচ্ছে চারপাশ। মানুষ থেকে মানুষের দূরত্বই যেন এখন বেঁচে থাকার শ্রেষ্ঠ উপায়। মুখোশই এখন মানুষের আসল রূপ। সারাবিশ্বের মানুষই হাত দিয়ে কাউকে স্পর্শ করতে চায় না। একই গৃহে বাস করা মানুষ ছাড়া আর কাউকে কেউ ছুঁতে যেন মানা। বিদেশ থেকে যাওয়া যে মানুষগুলো দেশে গেলে অন্তত স্বজনের মায়া পেত, বুকে টেনে নিত তাদের, সেই স্বজনরা এখন হারিয়ে গেছে। প্রবাসীর বাড়িতে লাল পতাকা টানানো হয়, প্রবাসীদের দেখলে আগে অনেক দোকান মালিক অন্তত বাড়তি লাভের আশায় স্বাগতম জানাত, সেই দোকানগুলোর মালিক এখন ঘোষণা দিয়েই প্রবাসীদের প্রতিরোধ করছে। প্রবাসীরা এমনকি চিকিৎসা পাচ্ছে না নিজের দেশে। বদলে গেছে সমাজ। মৃত্যুর মহামারিতে মাকে সন্তান ফেলে আসছে বনে।

বদলে যাচ্ছে জীবন। এ জীবনে মৃত্যুভয় ক্রমে তাড়া করছে প্রতিটি মানুষকেই। নিজের মৃত্যু ঢাকতে অপরের প্রতি হয়ে উঠছে নির্মম। এমনকি নিজের প্রতি মমত্ব হারাচ্ছে। ব্রিটেনের টিভিতে দেখলাম স্বাস্থ্য বিভাগ থেকেই আহ্বান করা হচ্ছে, বুকে ব্যথা করলে কিংবা বাচ্চাদের জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে ইমার্জেন্সিতে ফোন করতে অর্থাৎ মানুষ এতটাই আতঙ্কিত যে, বাঁচার জন্য এমনকি মৃত্যু প্রতিরোধের কথা ভুলে গিয়ে একাকী থাকতে চাইছে।

মেরুকরণ হচ্ছে মানুষের। মসজিদ দেবালয় বন্ধ হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু ধর্ম মানুষকে এখন ছায়া দিচ্ছে। বাংলাদেশি কমিউনিটিতে ধর্মীয় আচার বেড়েছে ব্রিটেনে, হয়তো সবখানেই। মানুষ নিজেদের যেন চিনতে পারছে। ওপারকে কাছে থেকে দেখছে মানুষ। আমার এক পরিচিতজন তার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বাসায় ধর্মীয় সংগীত (ভজন) গান এবং তা ফেসবুকে লাইভ করেন। যে যার ধর্ম থেকেই বিশ্বাস আনছে, নির্ভরশীল হচ্ছে ¯্রষ্টার প্রতি। কিন্তু তারপরও এই মানুষগুলোই অপেক্ষায় আছে কবে আসবে সেই দিন, যেদিন ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে বদলে যাবে এ পৃথিবী আবার।

ধারণায় আসছে পরিবর্তন। করোনা এই অতি যান্ত্রিক জীবনটাকে নতুন করে চিনতে শিখিয়েছে। অর্থ-বৈভব এমনকি মিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ডলার-পাউন্ডের মারণাস্ত্র যে ঠুনকো হয়ে যেতে পারে, তা আবার নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে এই করোনা। পরাশক্তির ঔদ্ধত্য আমরা দেখছি সিরিয়া, ইয়েমেন, ফিলিস্তিন কিংবা ইরাকে। যেখানে শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে, নারী ধর্ষিত হচ্ছে, মরছে মানুষ লাখ লাখ। শুধু ক্ষমতা আর শক্তির বলয় গড়ার লক্ষ্যে সেই দেশগুলোর ওপর চালিয়েছে অমানবিক পৈশাচিকতা। এই পৈশাচিকতাকে প্রলম্বিত করতে পরাশক্তিগুলো নজর দিয়েছে অস্ত্রের প্রতি। মানুষের জীবনের মূল্যকে এরা তুচ্ছ ভেবেছে। তাই তো নাগরিকের স্বাস্থ্য নিয়ে সময়োপযোগী আবিষ্কারের দিকে ভ্রæক্ষেপ করেনি তারা। আর সেজন্যই করোনাকালে কৃত্রিম শ্বাস দিতে ভেন্টিলেটরের জন্য হন্যে হয়ে ধরনা দিতে হয়েছে বড় বড় কারখানার কাছে। গাড়ির কোম্পানি ভেন্টিলেটর বানিয়েছে। নিজের দেশ বাঁচানোর জন্য এরা তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবা দেয়ার জন্য যুদ্ধে নেমেছে। সপ্তাহে পনেরো দিনে হাজার হাজার শয্যার হাসপাতাল বানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন শহরে। কিন্তু এই এরাই সময় যখন ছিল, তখন জনগণের এসব দায়কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। ব্রিটেনের এনএইচএসকে দেনায় জর্জরিত করে ব্যবসায় সফল হতে চেয়েছে। অথচ এরাই এখন এনএইচএসের ১৩.৪ বিলিয়নের দেনা মওকুফ করেছে এখন অর্থনৈতিক সংকট সময়েও।

বদলে যাক আগামী- করোনা শাসকদের মানবিক করে তুলেছে এখন। ব্রিটেনের এনএইচএস কর্মীদের এখন জাতির ত্রাতা হিসেবে ভাবা হচ্ছে। ৯৯ বছরের বৃদ্ধ এনএইচএসের ১ হাজার পাউন্ডের অনুদান সংগ্রহ করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত উঠেছে ১৮ মিলিয়ন পাউন্ড। ডিউক অব ওয়েস্টমিনিস্টার এনএইচএস কর্মকর্তাদের সরাসরি অনুদান দিয়েছেন।

৩০ বছরের নিচে অবস্থান করা পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী এই বিলিয়নিয়ার হিউ গ্রসভেনার বয়স্ক মানুষদের জন্যও ঘোষণা করেছেন বিশাল অনুদানের। তার অনুদানের পরিমাণ ১২ মিলিয়ন পাউন্ড। এভাবেই ব্রিটেনের স্বাস্থ্যসেবা সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে। কেয়ার হোম বয়স্কদের দেখাশোনা এ করোনা সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিভিন্ন কেয়ার হোমে অধিকসংখ্যক বয়স্কদের মৃত্যু সরকারের স্বাস্থ্যসেবার সমালোচনাকে আরো সামনে এনেছে। সেজন্যই কেয়ার হোম ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়ার কোনো বিকল্প নেই। এভাবেই সরকার শিখতে বাধ্য হচ্ছে, আর সেজন্যই আগামীর ব্রিটেনে নাগরিকদের জন্য বিশাল বাজেট না দিয়ে বিকল্প হয়ে আসবে না মারণাস্ত্রের বাজেট।

বদলে কি যাবে গোটা পৃথিবী- ধর্ম, সাম্প্রদায়িকতা, বর্ণ নিয়ে হানাহানি বিশ্বরাজনীতি থেকে অন্তত কিছুটা হলেও কি অনুচ্চারিত থাকবে? করোনায় বদলে যাওয়া সভ্যতায় শোষক আর শোষিতের ধারণাটুকু হয়তো নতুন করে টোকা দেবে এ পৃথিবীতে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় ধনীদের (লুটেরা শ্রেণি) মুখোশ উন্মোচিত হবে হয়তো জনগণের সামনে। করোনাকাল শেষে অনাহারে ৩ কোটি মানুষ যদি সত্যি মারা যেতে থাকে, তবে এ বিশ্বের দেশে দেশে বিকল্প সন্ধান করতেই পারে মানুষ। তখন হয়তো নতুন বিশ্বাসে পুনরুজ্জীবিত হবে এ বিশ্ব আবার।

ফারুক যোশী : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj