মতিন সাহেব ও করোনা বৃত্তান্ত

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২০

রফিকুল নাজিম

মতিন সাহেবের বাসার সামনে পুলিশের গাড়ি সাইরেন বাজিয়েই যাচ্ছে। তার আগে মহল্লার রাস্তায় জটলা করা মানুষকে লাঠিপেটা করে দলছুট করে দিয়েছে পুলিশ। কিছুক্ষণের মধ্যেই উপজেলা প্রশাসনের তিনজন কর্মকর্তা এসে মতিন সাহেবের বাসার গেটে লাল নিশান উড়িয়ে দিলেন। আশপাশের সাতটি বাড়িকেও লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। বিভিন্ন চ্যানেলে সংবাদটি সরাসরি সম্প্রচারিত হওয়ায় শহরতলির এই বাসাটির দিকে এখন দেশবাসীর নজর। করোনা ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে মতিন সাহেব নিজ ঘরে মারা গেছেন। তার পাশে কোনো স্বজন নেই। খবরটা শুনেই কয়েকজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, ‘আহা রে লোকটা খুব ভালো ছিল।’

মাত্র দুই ঘণ্টা আগেও মতিন সাহেবের সঙ্গে সহকর্মী করিমের দেখা হয়েছিল বাজারে। অথচ ভাইরাসের ভয়ে কোলাকুলি তো দূরের কথা; একটা কথাও হয়নি তাদের। মুচকি একটা হাসি দিয়েই দুজন দুজনকে নির্দিষ্ট দূরত্বে অতিক্রম করে গেছেন। সেই দুঃখবোধে কিছুটা পুড়ছেন করিম সাহেব। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফলটা আমরা আসলেই এখন পেতে শুরু করেছি। ফেসবুক না থাকলে তো এই মহামারিতে প্রিয় সহকর্মীর মৃত্যুর সংবাদ জানতেই পারতাম না- মনে মনে করিম সাহেব সরকারকে ধন্যবাদ দেয়। ধন্যবাদ দেয় মতিন সাহেবের সেজো ছেলেকে। সেই ছেলেটা ফিলিং সেড লিখে মরহুম বাবার একটা ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছে। রোজা-নামাজি মানুষটা একা ঘরে বিছানায় হাঁ করে মরে পড়ে আছে। কি বীভৎস মৃত্যু! চার ছেলে, ছেলের বউরাসহ নাতি-নাতনি সবাই মতিন সাহেবের লাশ ড্রয়িং রুম থেকে দেখেই ভোঁ দৌড়ে নিচে নেমে গেল। কি মিহি গলায় করুণ সুরে মরার বিলাপ করছে বউয়েরা! শ্বশুর আব্বার মুখে শেষ পানিটুকু দিতে না পারার যন্ত্রণায় মেজো বউয়ের কান্নার স্বর ঊর্ধ্বগামী হচ্ছে। বড় বউ তো আক্ষেপ করে মাটি চাপড়ে চাপড়ে কাঁদছে। টেংরা মাছের ঝোল না করে দিতে পারার ব্যথায় মুষড়ে যাচ্ছে ছোট বউ। ছেলেরা গ্যারেজের দেয়াল ধরে কেউ, কেউবা বিপরীত দিকে ঘুরে কাঁদছে। হঠাৎ সেজো বউ কান্না থামিয়ে বলল, ‘রামিমের আব্বু, ঐ দিকটায় হাত দিয়ো না। বাবা ধরে থাকতে পারেন।’ সঙ্গে সঙ্গে সেজো ছেলের টনক নড়ে। প্যান্টের পকেট থেকে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ছোট বোতলটা বের করে হাতে মাখে। হাতকে জীবাণুমুক্ত করার বিরতির পর আবারো সে কান্না শুরু করেছে।

মসজিদে তিনজন হাফেজ কুরআন খতম করছে। গোরস্তানে কবর করার কাজে সহযোগিতা করছেন ওয়ার্ডের কুদ্দুস মেম্বার। করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত লাশ দাফনের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাঁচ সদস্যের একটা টিমকে খবর দেয়া হয়েছে। আসতে বেশি সময় লাগবে না। উপজেলা হাসপাতালের টিইইচও ডা. জাহিদ আকবর বড় ছেলেকে ডেকে রোগীর কেস স্টাডি করছেন-

– আপনার বাবার বয়স কত হবে?

– এই তো স্যার, বাবা পেনশনে আছেন ২০০৮ থেকে। তার মানে ৭০/৭১ বছর হবে।

– হুম। আচ্ছা, রুমে কি উনি একা ঘুমাতেন?

– জি, স্যার। উনার রুমে এমনিতেই আমরা কেউ যেতাম না। ছেলেমেয়েদেরও যেতে দিতাম না। বাবার রুমে একমাত্র কাজের মেয়ে লুৎফা যেত। খাবার-দাবার দেয়া ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য। বাবা কদাচিৎ ড্রয়িং রুমে আসত জুনিয়রদের সঙ্গে গল্প করার জন্য। তবে আশার কথা হলো, করোনার আবির্ভাবের পর বাবাকে কড়াকড়িভাবে নিষেধ করেছি ওদের কাছে আসতে।

– হুম। বুঝতে পেরেছি। উনার কি কোনো কাশি, জ্বর বা গলা ব্যথা ছিল?

– জি। বাবা গত দুদিন ধরে খুব কেশেছেন। আমার রুম থেকে কাশির আওয়াজ শোনা যায়। জ্বরের ব্যাপারটা আমি দেখিনি। তবে ছিল মনে হয়।

– ওহ, আই সি। তাহলে এই অসুস্থ বাবাকে কেন আপনারা বাজারে পাঠালেন?

– বাবা নিজেই গেলেন। উনি বললেন, করোনা এক ভয়াবহ রোগ। তাই তোমরা বাসায় থাকো। আমিই বাজার করে আসি। মরলে আমিই মরি। আর বাবা নিজ হাতেই বাজার করতে ভালোবাসতেন।

– হুম। আমি সবই বুঝতে পেরেছি। আপনারা আপনাদের বাবার প্রতি খুবই দায়িত্বশীল ছিলেন! করোনার এই মহামারিতে আমাদের সিনিয়র সিটিজেনদের প্রতি আরো যতœবান হওয়া জরুরি। রিমেম্বার ইট, মি…।

একজন ম্যাজিস্ট্রেট এগিয়ে এসে বলল, আপনাদের মহল্লার প্রবেশপথসহ আশপাশের সাতটি বাড়িকে আমরা লকডাউন ঘোষণা করেছি। আপনারা আগামী ১৪ দিন সম্পূর্ণভাবে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন। কোথাও বের হবেন না। আপনাদের নমুনা সংগ্রহের জন্য আগামীকাল একটা মেডিকেল টিম আসবে। আশা করি তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন।

লাশটি বিশেষভাবে দাফন করার জন্য পাঁচজন আলেম ওলেমা চলে আসছেন। সঙ্গে ডা. রাহিম পাঠান যাচ্ছেন লাশ থেকে নমুনা সংগ্রহের জন্য। সম্মুখ সমরের যোদ্ধারা পুরোপুরি পিপিই, মাস্ক, গগলস পরে লাশ কেরিংয়ের জন্য ব্যাগ নিয়ে বাসাটির দোতলায় গেলেন। এরপর সবাই ড্রয়িংরুমে মিনিটখানেক দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ সেরে নিলেন। একজন লাশের ব্যাগ ধরবেন এবং বাকি চারজন লাশটাকে খাট থেকে নামিয়ে ব্যাগে রাখবেন। কাজটা খুব সহজ। তবে ভাইরাসের ভয়ে কাজটা এখন বেশ জটিল ও ভয়ঙ্কর। ডাক্তার সাহেবের পেছন পেছন লাশ দাফন টিম মতিন সাহেবের রুমে ঢুকলেন। ডাক্তার সাহেব নমুনা সংগ্রহ করতে যেই যাবেন তখনই ঘটে গেল এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার। সবাই হুড়মুড় করে মতিন সাহেবের রুম থেকে দৌড়ে বের হয়ে আসলেন। ভূত দেখার মতো হতচকিত সবাই এসে ডাইনিং রুমে দাঁড়ালেন। এ কি! মতিন সাহেব হেঁটে ডাইনিং রুমের দিকেই আসছেন। সবাই সুরা কেরাত পড়ে বুকে থুতু দিচ্ছেন। ডা. রাহিম পাঠানের সামনে এসে মতিন সাহেব জিজ্ঞেস করলেন-

– আপনারা আমার বাসায়! কি মনে করে এসেছেন?

– না। না মানে…..

– কি না মানে, না মানে করছেন? বলুন আমি আপনাদের কি সেবা করতে পারি?

– না মানে…। আপনি সুস্থ আছেন তো?

– হ্যাঁ। আলহামদুলিল্লাহ। বেশ ভালো আছি। তবে ইদানীং ঘুমটা খুব ঘন হয়ে আসে। মরার মতোই ঘুমাই। বিনা নোটিশে হুটহাট ঘুম চলে আসে। এই যে দেখুন না আজ দুপুরে বাজার থেকে ফিরে এসে বিছানায় পড়তেই এক ইনিংস ঘুম দিয়ে নিলাম। বয়স হয়েছে তো।

– হ্যাঁ, মতিন সাহেব। আর আজ একটু গরমও বেশি পড়েছে। হয়তো শারীরিকভাবে ক্লান্তও ছিলেন।

সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বললেও মতিন সাহেব ঘটনার রহস্য খুলতে পারছেন না। বড় ছেলের একমাত্র মেয়ে তিম্মি দৌড়ে এসে বলল- ‘দাদু, তুমি না মরে গিয়েছিলে?’ কথাটা শুনে মতিন সাহেব এক প্রকার ধাক্কাই খেলেন। ঘটনাকে স্বাভাবিক ও সহজ করার জন্য মতিন সাহেব গলায় সঞ্চিত ব্যথাটুকু এক ঢোকে গিলে বললেন, ‘হ্যাঁ দাদু। আজ থেকে আমি ভূত দাদু। আমরা এখন থেকে ভূত ভূত খেলব। ঠিক আছে?’

ডাক্তার, পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট এবং দাফন টিমের একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে আছেন। মতিন সাহেবের সেজো ছেলের দিকে ম্যাজিস্ট্রেটের চোখ পড়তেই সে নিজের রুমে ঢুকতে ঢুকতে শুকনো গলায় বললো, কই রে লুৎফা, ‘স্যারদেরকে চা-নাস্তা দে।’

য় পলাশ, নরসিংদী

গৃহবন্দি

হাবীব হোসেন

একমুঠো নৈঃশব্দ ছড়িয়েছি সন্ধ্যার প্রাক্কালে

তারই থেকে কিছু বীজ

ডালপালা মেলে, মহিরুহ হয়েছে এখন।

এখন অতীন্দ্রিয় ভাঁজহীন সময়ের

প্রবল প্রকোপ।

না চিনে ফেরায় মুখ স্বরলিপি এবং বাতাস।

আধোয়া রাস্তায় যাবে হাঁটা চলা করে জলছবি

বিদেশ বিভুঁইজুড়ে হাহাকার

ভারী বিভীষিকা

সবাই গোপন করে নিজেদের, গুটি পোকা যেন

খেয়ালি তন্তু বোনে অবিরত বৃথা চারপাশে।

গুম-ভয় ঘর করে

ঘুণপোকা হয়ে বাঁচে গভীরে অতলে…

অবাক সময়ে আছি,

চিলেকোঠা ডেকে নেয় রাতে…

বেসমেন্টে জমে ক্লেদ,

বেসমেন্টে অপচয়, ভুলের হিসাব।

ওষুধের গন্ধ বাড়ে, ধুপদানি গিয়েছে হারিয়ে

গৃহবন্দি বেঁচে থাকি, নৈঃশব্দ ধরেছে এসে হাত।

প্রাণহীন বৈশাখ

জুলফিকার আলী

বটমূলে বসেনি এবার

বোশেখের ঐ মেলা,

কাটছে সবার শুয়ে-বসে;

নিরানন্দ বেলা!

ইলিশ-পান্তার ধুম নেই,

দু’চোখে কারো ঘুম নেই।

বাঙালিয়ানা সাজ নেই কারো

করোনার ঐ ভয়ে,

মানুষের সম্প্রীতি নেই আর;

মহামারির জয়ে।

গৃহবন্দি সারা বিশ্ব

প্রাণহীন নববর্ষে,

বৈশাখীর ছোঁয়ায় মনে রঙ;

লাগে না স্পর্শে।

প্রাণহীন বৈশাখ-উৎসব ছাড়া

বেদনার রঙে হয়,

করোনা তুমি দূরে যাও;

পৃথিবী হোক প্রাণময়!

চোখের সামনে একটি আহত শব্দ

আশ্রাফ বাবু

একটি ক্লান্ত বিকেল তারপর আর একটি মুমূর্ষু সন্ধ্যা

বায়ুকোষে লেগে থাকা ধুলো ও একটি কাশির শব্দ

চোখের সামনে একটি আহত শব্দ

সময় ও অস্তিত্বের এলোমেলো ঘুরপাক

মৃত অভিশপ্ত স্বপ্নজাল কিংবা পুনরাবৃত্তির হাতছানি

তোমার আঁচল ধোঁয়া স্পর্শ ভাইরাস?

জীবন তার মায়ার সাথে সম্পর্ক ভেঙে ফেলছে!

অনেক দূরে সরে যাচ্ছে, জানা যায়।

সবার একটা ইচ্ছে, একা হলেও বাঁচতে চাই!

স্পর্শ, সঙ্গ স্বাদ, হবে না নির্ভয়ে চুমু কিংবা হ্যান্ডশেক

তবে জানা যায়নি, তোমার আঁচলে কি করোনা ভাইরাস?

কখন আমার শেষ দেখা! কবে পাবো প্রকৃতি তোমার ভালোবাসা।

একটি কাশির শব্দ ও করোনার আতঙ্ক প্রশ্নবিদ্ধ।

তুমি ভালো থাকো, দূরে থাকো

জমানো ভালোবাসা নিয়ে একদিন হাজির হবো?

ইলিশ

সুজন নন্দী মজুমদার

করোনার জন্য পহেলা বৈশাখে ইলিশ হলো না কেনা

ইলিশ কিনতে বাজারে যাওয়া- ঘর থেকে ছিল মানা।

তাই বাদ পড়ল ইলিশ এবার আমার ঘরে আনা।

শুধু ইলিশেই বৈশাখী ভোজ- এমনটা তো নয়

ইলিশ ছাড়াই দেখলাম এবার পহেলা বৈশাখ হয়।

বেঁচে থাকলে বৈশাখ হবে ইলিশ হবে ভূরি-ভূরি।

নিয়ম মেনে আসুন সকলে করোনা প্রতিরোধ করি।

ঘাতক করোনা

কাজী মারুফ

করোনা আজ পৌঁছে গেছে

দুই শতাধিক দেশে

সাধের জীবন নিচ্ছে কেড়ে

ঘাতকরূপে এসে।

প্রতিদিনই খবর আসে

বাড়ছে লাশের সারি

মৃত্যুভয়ে সকল মানুষ

করছে আহাজারি।

নাকমুখ ঢেকে সবাই এখন

চলছে রাস্তা-ঘাটে

খুব জরুরি কারণ ছাড়া

যায় না বাজার-হাটে।

এই করোনায় যদি কারো

মৃত্যু লেখা থাকে

পারবে না কেউ রাখতে ধরে

চেষ্টা করে তাকে।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj