করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২০


একটি টিভি চ্যানেলে খবর শুনছিলাম। বলা হলো একমাত্র দেশ যেখানে করোনা সংক্রমণ হয়নি সেখানে ফুটবল খেলা হচ্ছে। দর্শকরা স্টেডিয়ামে বসে খেলা উপভোগ করছেন। খেলার কিছু দৃশ্যও দেখানো হলো। দেশটি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের তুর্কমেনিয়া প্রজাতন্ত্র, বর্তমান স্বাধীন রাষ্ট্র তুর্কিস্তান। এর রাজধানী আশহাবাদ। ক’বছর আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আশহাবাদ বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করেছিল। দেশটিতে আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ১৯৭৮ সালে বেড়াতে যাওয়ার। সুতরাং তুর্কিস্তানের নাম শুনেই মনোযোগ কেড়ে নিল। পৃথিবীর ২১০টি দেশ যখন করোনাযুদ্ধে লড়াই করছে তখন এই দেশটির মানুষ করোনামুক্ত ভাবে এখনো জীবনযাপন করছেন। কবে আমরা এমন একটি জীবনে ফিরে যাব সেই আকাক্সক্ষাই মনে বেড়ে উঠতে শুরু করে। হ্যাঁ, একদিন আমরাও করোনামুক্ত বাংলাদেশ দেখব, তবে সেটি ঘটবে করোনার সঙ্গে বর্তমান যুদ্ধ শেষে। আপাতত অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমাদেরও করোনার সঙ্গে নিরন্তর যুদ্ধ করতে হবে। এরপরই করোনামুক্ত বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশও যুক্ত হবে।

করোনার সঙ্গে বিশ্বের ২১০টি দেশ যে যার মতো করে বেঁচে থাকার লড়াই করছে। প্রত্যেক দেশই এখন নিজের জনগণকে করোনার হাত থেকে যথাসম্ভব রক্ষা করার চিকিৎসা যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। অন্য দেশ ও জাতিকে দেখার বা সাহায্য করার সুযোগ যেন এখন কারোরই নেই। পৃথিবীর শক্তিশালী দেশ আমেরিকা প্রতিদিন করোনা যুদ্ধে ২ হাজারের অধিক নাগরিককে হারাচ্ছে, হাজার হাজার মানুষ নতুনভাবে প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলোতেও চলছে স্বজন হারানোদের ভিড়। অন্যান্য অঞ্চলেও প্রায় একই রকম অবস্থা। সব দেশেই এখন চলছে লকডাউন, ঘর-বাড়িতে বসে থাকা, অফিস, কলকারখানা, বিমান, রেল, যানবাহনসহ সব কিছুই বন্ধ। এমন কর্মবিহীন আতঙ্কের জীবন সভ্যতা আগে কখনো দেখেনি। এবার সবাই নিজ নিজ জীবন ও জাতি রাষ্ট্রকে বাঁচানোর লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। অন্য রাষ্ট্র ও জাতিকে দেখার সুযোগ কমে গেছে, মানসিকতাও খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। করোনা লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে বেশিরভাগ রাষ্ট্রের জীবন ব্যবস্থাকে, চিকিৎসার অভাব সর্বত্রই পরিলক্ষিত হচ্ছে, কোথাও যেন করোনা থেকে মুক্তির সুব্যবস্থা নেই। উন্নত দেশগুলোতেও চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ানরাও অসহায়, চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন, অনেকেই অসুস্থ হয়েছেন। দেশগুলোতে অর্থনৈতিক সংকট বেড়েই চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তো লকডাউন আর রাখতেই চাচ্ছেন না। লকডাউন তুলে দেয়ার পর আমেরিকায় করোনা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে এমনটি জেনেও তিনি লকডাউন তুলে দিতে চাচ্ছেন। বুঝাই যাচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দেশে অর্থনৈতিক সংকট গভীরতর হওয়ার সব লক্ষণই দেখতে পাচ্ছেন। এই পরিস্থিতি অন্য সব দেশেরও। কতদিন আর এভাবে চলবে- সেটি নিয়ে সর্বত্র প্রশ্ন ও দুশ্চিন্তা বেড়েই চলছে। এখনো করোনা চিকিৎসায় ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি, টিকাও তাড়াতাড়ি আবিষ্কৃত হওয়ার সম্ভাবনা কেউ দেখছেন না। তেমন অবস্থায় এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই বিশ্ব অর্থনীতি যে সংকটে পড়বে তার ফলে দেশে দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটও বেড়ে যাবে- যা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কারো থাকবে কিনা সন্দেহ দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে করোনার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী কোনো ঐক্যের বোধ দৃশ্যমান হচ্ছে না। অধিকন্তু পারস্পরিক অনাস্থা ও দূরত্ব বেড়েই চলছে। করোনা-উত্তর পৃথিবীতে বর্তমান গ্লোবাল বিশ্ব পরিস্থিতি টিকে থাকার সম্ভাবনা কতটুকু তা নিয়ে এখনই প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করেছে। বিশ্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধস নামতে পারে এটি নিশ্চিত। করোনার চিকিৎসা দ্রুত আবিষ্কৃত না হলে এই সংকট আরো জটিল হতে পারে- সেটি প্রায় নির্দ্বিধায় বলা যায়।

বাংলাদেশ গত এক মাসের অধিক সময় ধরে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করে চলছে। খোলা চোখে গণমাধ্যমের মাধ্যমে আমরা করোনা নিবারণে সরকারের গৃহীত নানা উদ্যোগ ও ব্যবস্থা দেখছি। প্রশাসনিকভাবে সরকার যেসব ব্যবস্থা নিচ্ছে তার অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। তবে উন্নত দেশগুলোই যেখানে করোনার চিকিৎসা, লকডাউন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় করোনার চিকিৎসায় হাসপাতাল, চিকিৎসকদের সুরক্ষা দান, রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আইসোলেশন, চিকিৎসার যন্ত্রপাতি, প্রয়োজনীয়সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানের ব্যবস্থা করা মোটেও সহজ কোনো কাজ নয়। এ ধরনের বিশেষায়িত চিকিৎসার হাসপাতাল এবং ব্যবস্থাদির ধারণা আমাদের থাকার কোনো কারণ ছিল না। সে কারণে স্বল্প সময়ে করোনার চিকিৎসায় আমাদের প্রস্তুত হওয়া মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ ছিল- যা এখনো দেশব্যাপী দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে বিস্তৃত হচ্ছে, বলা হচ্ছে চতুর্থ পর্বে প্রবেশ করেছে। সুতরাং এটিকে সামাল দেয়া কারো পক্ষেই সেভাবে সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া সরকার যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সেগুলো খুব কার্যকরভাবে পালিত হচ্ছে না। সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী হাজার চেষ্টা করেও ব্যাপকসংখ্যক মানুষকে রাস্তায় নেমে আসা থেকে বিরত রাখতে পারছে না। বিভিন্ন শহর থেকে মানুষজন গ্রামে সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে নানাভাবে চলে গেছে। গ্রামে-গঞ্জে, হাট-বাজারসহ সামাজিক মেলামেশা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। ফলে নতুন নতুন এলাকায় করোনা সংক্রমণের ঘটনা বেড়েই চলছে। শহরগুলোতেও বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে অনেকেই রাস্তাঘাটে বেরিয়ে আসছেন। আইইডিসিআরের সর্বশেষ তথ্যমতে এরই মধ্যে বাংলাদেশে মৃত্যুর সংখ্যা ১০১ জন, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২৯৪৮ জন। তারপরও করোনা সচেতনতা সর্বত্র লক্ষ করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন অবস্থায় এক মাসের মতো সময় ধরে রয়েছেন। এদের চাহিদামতো খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ সুনিশ্চিত করা খুবই কঠিন কাজ। দেশে অনেকেই সরকারের পাশাপাশি হতদরিদ্রদের মধ্যে ত্রাণ ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছেন। তারপরও মনে হচ্ছে অনেকেই এখনো প্রয়োজনীয় ত্রাণ পাচ্ছেন না। এ নিয়ে সমাজের অভ্যন্তরে হতাশা এবং ক্ষোভও রয়েছে। অন্যদিকে গার্মেন্টস মালিকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শ্রমিকদের ২-৩ মাসের বেতন দেয়নি। ফলে করোনার এমন জটিল পরিস্থিতিতেও শ্রমিকরা বেতন পাওয়ার দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছে। উভয় ক্ষেত্রেই হতদরিদ্র মানুষদের মধ্যে করোনা সংক্রমণের বাস্তবতা বেড়ে চলছে। এছাড়া দেশে শ্রমজীবী অসংখ্য মানুষ এখন আয়-উপার্জনহীন অবস্থায় রয়েছেন। ফলে ৪-৫ কোটি মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার বিধান নিশ্চিত করে ঘরে আবদ্ধ রাখা সরকারের পক্ষে মোটের ওপর অসম্ভব ব্যাপার। তারপরও সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসন এখনো পর্যন্ত নিরলসভাবে কাজ করে চলছে- যা প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু সেই তুলনায় জনপ্রতিনিধিদের একটি অংশ এই দুর্যোগময় মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কড়া হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করেও ত্রাণ বিতরণে যেসব অনিয়ম ও লুটপাটের ঘটনা ঘটিয়েছে তা স্বয়ং আওয়ামী লীগ দলের অভ্যন্তরেও গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকা জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়ার পরও দুর্নীতির প্রমাণ বন্ধ হয়ে যায়নি। ফলে সরকারে এবং দলের অভ্যন্তরে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ঘোষিত যুদ্ধে কেউ কেউ সমস্যা তৈরি করছে- এটি একেবারেই বরদাস্ত যোগ্য নয়। যেখানে সরকার চিকিৎসা ব্যবস্থাকেই দাঁড় করাতে হিমশিম খাচ্ছে, ৪-৫ কোটি মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করা, দেশের অর্থনীতিকে সচল করা ইত্যাদি নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে সেখানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাব সময়মতো উদ্যোগ নেয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা, যোগ্য লোকের অভাব এবং মাঠ পর্যায়ের নানা ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি দূর করার চ্যালেঞ্জ প্রকট হয়ে উঠছে সেখানে দায়িত্ব জ্ঞানহীন মানুষের আচরণ, কথাবার্তা, অপপ্রচার ইত্যাদি করোনা যুদ্ধের আতঙ্ককে আরো জটিল করে তুলতে পারে। সে কারণে সরকারের উচিত হবে গৃহীত ব্যবস্থাদির ত্রুটি-বিচ্যুতি দ্রুত দূর করা, পর্যালোচনা ও আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে দৃঢ়ভাবে কাজ করা, জনগণের মধ্যে আস্থার ভাব বৃদ্ধি করা। এই মুহূর্তে সরকারের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ জনগণের মধ্যে যে আস্থা গড়ে তুলবে সেটি করোনা যুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত রণাঙ্গনকে মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে। সরকার সেভাবেই জনগণের ওপর আস্থা পরিধি বিস্তৃত করার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য গঠনে এগিয়ে যাবে সেটি প্রত্যাশিত। এর কোনো বিকল্প নেই।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj