আশার আলো দেখছে দুনিয়া

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২০


আমাদের এই দেশে প্রশান্তপাড়ে এখন সুবাতাস বইতে শুরু করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। গোড়াতেই বলি, অস্ট্রেলিয়াকে বলা হয় ছোট মহাদেশের বৃহত্তম দেশ। সমুদ্রবেষ্টিত বলে একে পাহারায় রাখতে হয়। একবার কিছু ঢুকে পড়লে বের করা কঠিন। করোনা হানা দিয়েছে বিমান জাহাজ আর অতিথি বা নাগরিক বাহিত হয়ে। সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু বন্ধ করার পর সরকার যারা আটকে ছিল তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করে আসার সঙ্গে সঙ্গে বন্দর থেকেই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে হোটেলে। হোটেলের রুমবন্দি ১৪ দিনের পর অনাক্রান্তেরা বাড়ি ফিরেছেন। বাকিরা হাসপাতালে। ইতোমধ্যে একজন গেছে কারাগারে। ঝুঁকি নিয়ে বাইরে যাওয়ার সময় ক্যামেরায় ধরা খাওয়া তাকে এখন মোটা অঙ্কের জরিমানাও গুনতে হবে।

যখন সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার পথে তখন এখানকার দ্বীপ রাজ্য নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের কেন্দ্র তাসমানিয়া পড়েছে বিপদে। যাদের শুরু থেকে সংখ্যা ও সংক্রমণ ছিল হাতেগোনা তারা এখন সংকটে। কারণ চিকিৎসকদের কেউ কেউ হঠাৎ ডিনার পার্টিতে মেতে ওঠে এই বিপদ টেনে এনেছে। তাহলে বার্তাটা কি? বার্তা একটাই আপনি যদি না মানেন তবে আপনি নিজেকে তো বটেই সমাজ দেশ সবকিছুকে বিপদে ফেলছেন। বাংলাদেশের জন্য এটা জানা জরুরি মনে করি। কারণ জানা ও মানার বিস্তর ব্যবধানে প্রতিদিন নতুন বিপদ টেনে আনছে স্বদেশ।

সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বলি আমাদের সিডনিতে বসবাসরত বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা কিন্তু ব্যাপক। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী আছে এই দেশে। তারা দেশে ফিরতে পারেনি। মূলত মানুষ সবসময় পরোপকারী। এটা মাথায় রাখা দরকার রাজনীতি আর লোভ আমাদের আজ এক বিপদগ্রস্ত ভয়ঙ্কর লালসাপূর্ণ জাতিতে পরিণত করতে চাইলেও সাধারণ মানুষ সবসময় কল্যাণ আর মঙ্গল চায়। তাদের বুকে এখনো ভালোবাসা আতিথেয়তা আর সৌজন্য আছে। ঠিক তেমনই এদেশের সংগঠনগুলো বাংলাদেশি রাজনৈতিক দলের শাখাসহ সংগঠক লেখক সমাজ ব্যক্তিত্বরা এসে দাঁড়িয়েছে ছাত্রছাত্রীদের পাশে। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখি এরা কি কঠিন কাজ করে চলেছে। নিজেদের বিপদ বা আশঙ্কা মাথায় থাকার পরও তারা খাবার বিলি করছে। শুধু তাই না, এরা নিজেরা খেয়েছে কি না জানি না কিন্তু পহেলা বৈশাখে বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের পান্তা ইলিশ খাওয়াতে ভোলেনি। কঠিন সময়ে আমাদের দেশের ছাত্রছাত্রীরা যখন দিশাহারা যখন সরকার নিজ দেশের নাগরিক ও অভিবাসীদের সহায়তা করতে ব্যস্ত আর হিমশিম খাচ্ছে তখন এমন মানবিকতা আশার বৈকি। আশা করব সংগঠন ব্যক্তি আর সামাজিক বিভেদের বাইরে তারা এক হয়ে কাজ করতে পারবেন।

দেশের কথা বলছিলাম। করোনা ক্রাইসিসেও চুরি চামারি বন্ধ হয়নি। এমন সব নিউজ দেখি যাতে মনে হবে আমাদের নৈতিকতা বোধ বলতে অবশিষ্ট কিছু নেই। এ লেখা যখন লিখছি চাল চুরির পাশাপাশি বাড়ির খাটে বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখা তেলের বোতল দেখে থ বনে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে রংপুরে। তেল মজুত করার ভেতর দিয়ে বেরিয়ে এসেছে মানুষের নগ্ন লালসার আসল চেহারা। কীভাবে সামাল দেবে সরকার? খালি দোষারোপ করে কি লাভ? শেখ হাসিনা সম্ভবত এখন সবচাইতে বেশি বুঝতে পারছেন কারা তাকে ঘিরে আছে। সিনিয়র নেতাদের কেউ নেই পাশে। মন্ত্রিসভায় মেধা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়হীনতা এখন প্রকট। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাজ ও দায়িত্ব সারাবিশ্বে বেড়েছে। ব্রাজিলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও সচিবের কোন্দলে সচিব পদত্যাগ করেছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে নিউইয়র্কের মেয়রের চলছে ঝগড়া। মেয়র সাফ জানিয়েছেন আপনি রাজা নন ভোটে নির্বাচিত মেয়াদি প্রেসিডেন্ট মাত্র। পাশের দেশ ভারতে সোনিয়া গান্ধী মমতা দিদিরা মোদিকে মোদির সরকারকে তুলোধুনো করতে ছাড়ছে না। আমাদের তো কোনো জবাবদিহিতাই নেই। কেউ নেই প্রশ্ন করার বা জবাবদিহিতার। তাই বাংলাদেশের সংকট গভীর।

করোনার দুর্বলতম দিকটা নাকি উপমহাদেশে আঘাত হানায় এখনো পরিস্থিতি তেমন খারাপ হয়নি। সঙ্গে আছে মানুষের ইমিউন। আমাদের সমাজে সবকিছু ভেজাল এই অভিযোগ এখন কিছুটা আশারও। আশার এই কারণে ভেজালে ভেজালে মানুষের ইমিউন বেড়ে থাকায় করোনা কাবু করতে বেগ পাচ্ছে। কিন্তু এটা মানতে হবে ঢিলে দিলেই পরিবেশ নারকীয় হয়ে উঠতে সময় নেবে না। দুজন ডাক্তারের মৃত্যু প্রমাণ করেছে বিপদ কত ভয়ঙ্কর। এর পাশাপাশি আমাদের অন্ধ বিশ্বাসগুলোও ভয়ঙ্কর। অমানবিক হয়ে যারা করোনা চিকিৎসারত ডাক্তার নার্সদের তাড়া করছে বাড়ি ছাড়া করছে বা আক্রমণ করছে তারা কীভাবে তাদের কাছ থেকে করোনার দূরত্ব আসলে কতটা? আর সে যদি এসে পড়ে কে তাদের বাঁচাবে? দেশে সমস্যার গভীরে আছে নি¤œ-মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্তের পুঁজি ফুরিয়ে আসছে। নি¤œ-মধ্যবিত্তরা এখন চরম সংকটে। তারা হাত পাততে পারছে না। লাইনে দাঁড়িয়ে সাহায্যও নিতে পারছে না। এখন টুকটাক খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ির খবর এলেও এ সংকট আরো ঘনীভূত হতে বাধ্য।

আমেরিকা ইউরোপ এখন কোনো সাহায্য করবে না। করতে পারবেও না। আমেরিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকেই টাকা দিচ্ছে না আর। ফলে আমাদের যে হাজার কোটির গল্প তার কঙ্কাল বেরিয়ে আসতে সময় নেবে না।

জনপ্রতিনিধিরা এখন কোথায়? ডাক্তার নার্স পুলিশ বা স্বাস্থ্যকর্মীরা যদি নিয়ম মেনে দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করতে পারেন আপনারা কেন পারবেন না? আপনারা ঘরে থাকবেন অবশ্যই। কিন্তু বেরিয়েও আসতে হবে। দায়িত্ব পালন করে নিশ্চিত করুন মানুষ তাদের বাঁচার রসদ পাচ্ছে। তা না হলে বারবার বিনা ভোটে পার পেয়ে যাবেন বলে মনে হয় না। সত্যি বলছি এত নিরুদ্বিগ্ন এমপি বা কেউকেটাদের আগে দেখা যায়নি। বিরোধী দল তো নেই-ই। যারা আছে তারাও একই পথের অনুসারী। এদের মুখপাত্র আবার পিপিই পরে আসেন একা এক রুমে। ডাক্তাররা না পেলেও তিনি ঠিকই পেয়ে পরে আসেন পিপিই। এসব অরাজকতা এখনো যদি দূর না হয় দুর্যোগ মোকাবিলা করা যাবে না। আমাদের দেশের মূল আয়ের তিন উৎস। রেমিট্যান্স পোশাক শিল্প আর কৃষি। তিনটাই এখন হুমকির মুখে। গার্মেন্টস শিল্প আগামী কয়েক বছরে মাথা তুলতে পারবে না। রেমিট্যান্সে ধস নামতে বাধ্য। মানবিকতার নামে ভুল সিদ্ধান্তে টেনে আনা রোহিঙ্গারা আর এক সমস্যা। সবমিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। কেউ একা সামাল দিতে পারবে না। আপাতত বাজার করার নামে দলবেঁধে ঘোরাফেরা তারপর নানা অজুহাতে বাইরে যাওয়া বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে সামাজিক মেলামেশা। তাহলে আর যাই হোক মহামারির প্রকোপ কমবে। সেটা না কমা পর্যন্ত মিনিমাম লেভেলেও কাজ কর্ম চালু করতে পারবে না সরকার।

যার যার স্বার্থে পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে ঢালাও মতামত দেয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে। মানতে হবে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা। যেসব দেশ মানছে তারাই মুক্ত হচ্ছে লকডাউন থেকে। জনবহুল বাংলাদেশে মানাটা জরুরি। দয়া করে নিজে বাঁচুন দেশ বাঁচান। এটা অন্ধত্ব বা আবেগের সময় না। বেঁচে থাকলে সব আবার করা যাবে। তাই সাবধান আর সাবধান।

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj