পেছন টেনে ধরা লোকের অভাব নেই

সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২০

আমাদের দেশে যে কোনো ইস্যুতে রাজনৈতিক বিরোধ বা মতানৈক্য যেন অবধারিত সত্য। কিন্তু করোনার এ মহাদুর্যোগে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, ত্রাণ বিতরণে যেন কোনো দলবাজি না হয়, অর্থাৎ ত্রাণ বিতরণের সময় কে কোন দলের সেটা যেন প্রাধান্য না পায়। একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে এমন বাণী উচ্চারিত হওয়ার পরে ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তা দ্বিতীয়বার বলার আর অপেক্ষা রাখে না।

কিন্তু হায়রে কপাল! এই ত্রাণ যার বিতরণ করার কথা, সে তা তার বিপক্ষ দলের অসহায় মানুষদের দেবে তো দূরের কথা, তার দলের লোকদের ভাগ্যেই জুটছে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজের ঘরের মেঝে খুঁড়ে বস্তার পর বস্তা ত্রাণ চুরি করে লুকিয়ে রেখেছেন নিজের জন্য। কেউবা আবার সরকারি গুদামে ত্রাণ মজুত না করে, নিজের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক গুদামে মজুত করেছেন।

পত্রিকায় যখন এসব খবর পড়ি, তখন বড় কষ্ট লাগে, ঘৃণায় মুষড়ে যাই। এসব অমানুষের ভিড়ে নিজেকে মানুষ ভাবতে দ্বিধা হয়। এরা একটু চিন্তাও করে না, এই করোনাঘাতে সে বাঁচবে কিনা; যদি মারা যায়, তাহলে মৃত্যুর পর মানুষ তাকে নিয়ে কী বলবে, আর তার প্রজন্মকে কী অপবাদ নিয়ে বড় হতে হবে!

আবার অনেকেই আছেন যারা অর্ধপূর্ণ গøাসের পানিপূর্ণ অংশটি দেখতে পান না, বরং গøাসের খালি অংশটিতেই তাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। এ প্রসঙ্গে নিজের দুটি সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলি। আমার বাড়িওয়ালা তার সব ভাড়াটিয়াকে মার্চ মাসের অর্ধেক ভাড়া মওকুফ করেছেন। করোনাকালীন নিঃসন্দেহে একটি মহৎ উদ্যোগ। তাই ভাবলাম, বাড়িওয়ালার মাহাত্ম্য প্রচার হওয়া দরকার। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলাম, ‘আমার বাড়িওয়ালা মার্চ মাসের অর্ধেক (৫০%) ভাড়া মওকুফ করেছেন।’ এতে ফেসবুক বন্ধুরা অনেকেই মন্তব্যের মাধ্যমে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, বাড়িওয়ালাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তবে দুজন তাদের মন্তব্যে বাড়িওয়ালার প্রশংসা না গেয়ে উল্টো আমাকেই আক্রমণ করেছেন। পাঠকদের জন্য মন্তব্য দুটো তুলে ধরছি:

একজন মন্তব্য করেছেন, ‘কেন স্যার, মার্চ মাসে কি আপনি ফুল বেতন পাননি?’

আরেকজন মন্তব্য করলেন, ‘এক মাস না যেতেই যদি আপনাদের এই অবস্থা হয়, তাহলে গরিবদের কী অবস্থা হবে?’

মন্তব্য দুটো পড়ে কিছুটা হতাশ হলাম। আমি এখানে কী প্রচার করতে চাইলাম, আর কী প্রচার করতে সমর্থ হলাম! বাড়িওয়ালার মহানুভবতা তুলে ধরতে গেলাম, কিন্তু আমাকেই হাত-পাতা মানুষ বানিয়ে কটাক্ষ করা হলো, যদিও আমি মওকুফকৃত ভাড়া দান করে দিয়েছি কিছু নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে।

যারা যেকোনো ভালো কর্ম বা উদ্যোগে নিজের ভালোটা না দেখা পর্যন্ত তারা সেটাকে ভালো কর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজি হয় না। আর তাই সুস্থ মানুষগুলো নিজেরা অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কায় করোনায় মৃত্যুপথযাত্রী মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসায় বাধা তৈরি করছে। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের যশোদলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজকে করোনা চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণার পর এর প্রতিবাদে একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কর্মীদের মানববন্ধন করতে দেখা গেছে। এর আগে দিয়াবাড়িতে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার স্থাপনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। চাঁদা না পেয়ে করোনা চিকিৎসায় তেজগাঁও শিল্প এলাকায় আকিজের হাসপাতাল নির্মাণেও বাধা দিয়েছেন স্থানীয় একজন কাউন্সিলর। সর্বশেষ এক সংবাদে দেখলাম, করোনা আতঙ্কে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের বাসা ছাড়তে বলছেন অনেক বাড়িওয়ালা। করোনা ভেবে সর্দি, কাশি ও জ্বরের রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছেন প্রতিবেশীরা।

উপরোক্ত ঘটনাগুলোতে সংশ্লিষ্ট বিরোধী পক্ষগুলো কি অগ্রিম করোনারোধী প্রতিষেধক নিয়ে রেখেছে, নাকি জন্মগতভাবে মনুষ্যত্ব ও মানবতাবিরোধী প্রতিষেধক নিয়ে জন্মেছে?- পাঠকদের কাছে প্রশ্ন রেখে শেষ করছি।

মোশারফ হোসেন
ব্যাংকার ও লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj