আতঙ্কে যেন ঢেকে না যায় মানবতা

সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২০


দুর্যোগ মানুষকে বদলে দেয়। বিপদের সময়ই মানবতার সত্যিকারের বিকাশ ঘটে। এটা বারবার আমরা দেখেছি। জনগণের বিশাল এবং সর্বাত্মক জাগরণ ছাড়া একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের জয় এত সহজে আসতো না। অল্পকিছু স্বাধীনতাবিরোধী ছাড়া গোটা জাতি উজ্জীবিত ছিল মুক্তির চেতনায়। যারা জীবনের মায়া ত্যাগ করে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, শুধু তারা নয়; দেশের সর্বস্তরের মানুষও ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। আর দাঁড়িয়েছিল বলেই মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতির জীবনের সবচেয়ে মহৎ ঘটনা। শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়, বিভিন্ন জাতীয় দুর্যোগে বারবার আমরা প্রমাণ করেছি, সম্পদে ঘাটতি থাকতে পারে; কিন্তু মানবতায় আমরা অনন্য। ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ¡াস- যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। রানা প্লাজা ধসের পর আমার মনে হয়েছে এই ঘটনা কোনো উন্নত বিশ্বে ঘটতো, তাহলে মৃত্যুর ঘটনা আরো বেশি ঘটতো। কারণ বাংলাদেশে উদ্ধারকর্মীরা যেভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ধসে পড়া রানা প্লাজায় ঢুকে পড়েছিল, বিশ্বের আর কোনো দেশে সেটা সম্ভব ছিল না। আসলে কোনো দেশই এভাবে উদ্ধারকাজ অনুমোদনই করত না। ঝড়, বন্যায়ও মানুষ সরকারি ত্রাণের আশায় বসে থাকেনি, সাধ্যমতো দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাই তো বাংলাদেশ সবসময়ই দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতায় বিশ্বের রোল মডেল।

তবে এবারের দুর্যোগটা ভিন্ন। চাইলেই সবার পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়া সম্ভব নয়। করোনা দুর্যোগে প্রধান কাজ হলো বিচ্ছিন্ন থাকা। তারপরও কিছু মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আটকেপড়া নিম্নবিত্তের মানুষের ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন। অনেকে দূরে থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবকদের গ্রুপ তৈরি করছে। ডাক্তারদের বিভিন্ন গ্রুপ টেলিফোনে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে আশপাশের দরিদ্র মানুষদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। অনেকেই নিজেদের ড্রাইভার, পিয়ন, বাসার কাজের সহকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সামর্থ্যবান অনেকে বাজারে বা রিকশাওয়ালার সঙ্গে দরকষাকষি করছেন না। এভাবেই মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে। ছোট ছোট উদ্যোগ বাঁচিয়ে রাখছে সবাইকে। জয় হচ্ছে মানবতার। তবে করোনার এই দুর্যোগে কিছু ঘটনা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। করোনার ভয়াবহ আতঙ্ক কি ঢেকে দিচ্ছে আমাদের মানবতাবোধকে?

গত সপ্তাহে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক অধ্যাপক বললেন, একজন মেডিকেল অফিসার বগুড়া থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় এসেছেন। এই দুর্যোগের সময়ে নতুন এই মেডিকেল অফিসারকে পেয়ে সেই অধ্যাপক খুব খুশি। তাকে স্বাগত জানিয়ে কাজ শুরু করতে বললেন। সেই মেডিকেল অফিসার বললেন, স্যার কাজ করতেই তো এসেছি।

কিন্তু থাকব কোথায়? অধ্যাপক অবাক হয়ে বললেন, কেন? মেডিকেল অফিসার জানালেন, সাতদিন ধরে বাসা খুঁজছেন। কিন্তু ডাক্তার শোনার পর কেউ বাসা ভাড়া দিতে চাইছেন না। ডাক্তার প্রতিদিন হাসপাতালে যাবেন, করোনা ভাইরাস নিয়ে বাসায় ফিরবেন; এই হলো শঙ্কা। ডাক্তারদের কাছে সার্বক্ষণিক সেবা চাইবেন। একটু দেরি হলে কসাই বলে গালি দেবেন। আর থাকার জন্য বাসা ভাড়া দেবেন না। এ কেমন কথা। শুধু সেই ডাক্তার নন, এমন সমস্যায় পড়ছেন অসংখ্য ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মী। ঢাকা মেডিকেলেরই আরেক স্বাস্থ্যকর্মী পুরান ঢাকায় থাকেন। করোনা আতঙ্ক শুরুর পর বাড়িওয়ালা তাকে নোটিস দিয়ে দিল, বাড়িতে থাকতে হলে ছুটি নিতে হবে। প্রতিদিন ঢাকা মেডিকেলে গেলে বাসা ছেড়ে দিতে হবে। ডাক্তার আর স্বাস্থ্যকর্মীরা যদি সব ছুটি নিয়ে বাসায় বসে থাকে, তাহলে চিকিৎসাটা দেবে কে?

করোনার ভয়াবহ আতঙ্ক কি আমাদের চিন্তাশক্তিকে এলোমেলো করে দিচ্ছে? আমরা সবাই জানি, করোনা ভাইরাস বায়ুবাহিত রোগ নয়। বাতাসে এটি ছড়ায় না। তারপরও উত্তরার দিয়াবাড়িতে রাজউকের ফ্ল্যাট প্রকল্পে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার করা যায়নি আমাদের বিক্ষোভের মুখে। তেজগাঁওয়ে আকিজের হাসপাতাল বানানোর চেষ্টা আমরা পণ্ড করে দিতে চেয়েছি ভাঙচুর করে। সবার চাওয়া আমার এলাকায় যেন হাসপাতাল না হয়, কোয়ারেন্টাইন সেন্টার না হয়, আমার বাসায় যেন ডাক্তার না থাকে। সবকিছু আমিকেন্দ্রিক। নিজে বাঁচলে বাপের নাম। কিন্তু এমন তো আমরা কখনো ছিলাম না। খিলগাঁও কবরস্থানের সামনে সাইনবোর্ড ঝোলানো ছিল, এখানে করোনা রোগীর মরদেহ দাফন করা হয় না। মৃত্যুর পরও আমরা এতটা নির্মম। অথচ এটা মোটামুটি নিশ্চিত, মরদেহ করোনা ভাইরাস ছড়ায় না। করোনা ভাইরাস ছড়ায় মানুষ থেকে মানুষে। মুখ, চোখ, নাক, কান দিয়ে করোনা ভাইরাস আপনার শরীরে ঢুকতে পারে। করোনা আক্রান্ত কারো হাঁচি-কাশি, ফেলে দেয়া কফ থেকে আপনি সংক্রমিত হতে পারেন। মরদেহ হাঁচি-কাশি দিতে পারে না, কফও ফেলতে পারে না।

তাছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া নিয়ম মেনে যথাযথ প্যাকিংয়ের মাধ্যমে করোনা রোগীর মরদেহ যে কোনো কবরস্থানে দাফন করা যেতে পারে। কিন্তু ভয়ে-আতঙ্কে আমরা অমানবিক হয়ে যাচ্ছি, করোনা রোগীর মরদেহকেও যেন ঘৃণা করছি। করোনা রোগীর জানাজায়ও কেউ যাচ্ছেন না ভয়ে। রাস্তায় অসুস্থ লোকজন পড়ে থাকছে, কেউ কাছেও যাচ্ছে না। নরসিংদীকে এক লোক স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন। তার বাড়ি রাজবাড়িতে। সেখানেই তার দাফনের প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু রাজবাড়ি থেকে লোকজন ফোন করে জানিয়ে দিল, তাকে যেন নরসিংদীতেই দাফন করা হয়; রাজবাড়িতে যেন আনা না হয়। করোনা আতঙ্ক আমাদের বিবেককে এতটাই ঢেকে ফেলেছে, স্বাভাবিক মৃত্যু আর করোনা মৃত্যুকেও আলাদা করতে পারছি না। আমি বলছি না, আপনি গিয়ে করোনা রোগীর সেবা করুন বা মরদেহ নিয়ে কবরে নেমে যান। তবে তাদের ঘৃণা করবেন না। যথাযথ সুরক্ষা নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে থেকে আপনি করোনা সংক্রমিত মানুষের সঙ্গে কথাও বলতে পারেন। করোনা ভাইরাস কিন্তু উড়ে এসে আপনার শরীরে ঢুকে যাবে না।

অবস্থাটাই এমন, আমরা সবাই করোনা আক্রান্ত হতে পারি। করোনা বিশ্বে অদ্ভুত এক সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই ভাইরাস ধনী-গরিব মানে না। এমপি, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, রাজপুত্র কেউই ঝুঁকিমুক্ত নন। আমিও নই, আপনিও নন। এই যে এখন আপনি করোনা রোগীকে ঘৃণা করছেন, কাল যদি আপনি আক্রান্ত হন, তাহলে কী হবে, ভেবেছেন কখনো? করোনা আক্রান্ত রোগীর কিন্তু কোনো অপরাধ নেই। সর্বোচ্চ সাবধানতায় থাকার পরও কিন্তু আপনি করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন। করোনা সংক্রমণের প্রথমদিকে আমরা টার্গেট করেছি প্রবাসীদের। যেন তারাই করোনা বিস্তারের জন্য দায়ী। এটা ঠিক প্রবাসীদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস ঢুকেছে। এই সময়ে তারা কেউ দেশে না ফিরলেই ভালো করতেন। সময়টাই এমন যে যেখানে আছে, সেখানে থাকাই ভালো ছিল। কিন্তু তারা কেউ তো বেআইনিভাবে কাঁটাতার টপকে বাংলাদেশে আসেনি। বৈধভাবে বিমানবন্দর দিয়েই তারা বাংলাদেশে এসেছেন। সরকারের দায়িত্ব ছিল বিমানবন্দরেই তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া। তারা কি সরকারের নির্ধারিত কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে থাকবেন, নাকি বাড়িতে গিয়ে কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন বা আইসোলেশনে থাকবেন, থাকলে সেটার নিয়ম কী; এসব কী আমরা তাদের বলেছি? এই সময়ে আসা প্রবাসীদের কোনো ডাটাবেইজ কি আমাদের কাছে আছে? আগে থেকে পরিকল্পনা করলে বিমানবন্দরেই আমরা করোনা ভাইরাসের দৈত্যকে বোতলবন্দি করে রাখতে পারতাম। কিন্তু দৈত্যকে বোতল থেকে বের করে দিয়ে আমরা এখন সারাদেশে খুঁজে বেরাচ্ছি। এখন আমরা খুঁজে খুঁজে প্রবাসীদের বাড়িতে লাল পতাকা ঝুলিয়ে দিচ্ছি। দোকানের সামনে লিখে রাখছি, এখানে প্রবাসী প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু ভাবুন একবার, এই প্রবাসীরা কিন্তু আমার-আপনার, আমাদেরই ভাই-বন্ধু-স্বজন। তারা কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠায়। সেই রেমিট্যান্সে চাঙ্গা হয় দেশের অর্থনীতি। অন্য সময় প্রবাসীদের দেশে ফেরাটা হয় আনন্দের উপলক্ষ। আর এখন তারা যেন দেশের শত্রু। এই যে আপনি করোনার ভয়ে প্রবাসীদের প্রতি ঘৃণার স্রোত বইয়ে দিচ্ছেন; ভাবুন তারা টাকা না পাঠালে আপনাদের চলবে কীভাবে? করোনা তো একসময় চলে যাবে। কিন্তু এই প্রবাসীরা আপনার যে মনোভাব জানলো, তা কিন্তু কখনোই ভুলবে না।

করোনা আমাদের সম্পর্কগুলোকে জটিল করে তুলছে যেন। স্বামী শহর থেকে বাড়ি আসছে, এটা স্ত্রীর জন্য আনন্দের খবর হওয়ার কথা। কিন্তু স্বামী জ্বর নিয়ে এসেছে শুনে বগুড়ার এক স্ত্রী বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে। জামাই আদর বলে একটা কথা আছে। শ^শুর বাড়িতে জামাইয়ের আদরই অন্যরকম। এটাই বাংলাদেশের রীতি। কিন্তু জামাই জ্বর নিয়ে এসেছেন শুনে দিনাজপুরের শ^শুরবাড়ির লোকজন পালিয়ে গেছেন। আমি অবাক হয়ে যাই, করোনা যাওয়ার পর এই স্বামী কি তার স্ত্রীকে ভালোবাসতে পারবেন, এই জামাই কি আর কখনো শ^শুরবাড়িতে আসবেন? করোনা সন্দেহে টাঙ্গাইলে এক মাকে তার সন্তানরা জঙ্গলে ফেলে চলে গিয়েছিলেন। পরে প্রশাসন তাকে উদ্ধার করে ঢাকায় পাঠায়। পরীক্ষায় জানা যায়, তার করোনা হয়নি, সাধারণ জ্বর। যেই সন্তান স্রেফ সন্দেহের বশে মাকে জঙ্গলে ফেলে রেখে যেতে পারে, সেই অমানুষের আসলে বেঁচে থাকার দরকার কি।ব্যাপারটা যদি এমন হয়, করোনা হলেই কেউ কাউকে ধরতে পারবে না, তাহলে তো ডাক্তাররাও পারবে না। তাহলে তো কেউ কারো পাশে দাঁড়াতে পারবে না। রংপুর মেডিকেলে এক ছেলের করোনা ধরা পড়ে। তাকে ঢাকায় কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে পাঠানোর সুপারিশ করা হয়। কিন্তু ছেলেটিকে ট্রলিতে তোলার জন্যও কেউ এগিয়ে আসেনি। শেষ পর্যন্ত বাবা তার সন্তানকে কোলে করে অ্যাম্বুলেন্সে তুলেছেন। যুগ যুগ ধরে আমরা মানবতার কথা বলে আসছি, পারিবারিক বন্ধন নিয়ে গর্ব করছি। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, সব ফাঁকা বুলি। ইউরোপ-আমেরিকায় যে লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে; একটা অমানবিক ঘটনার কথাও কিন্তু আমরা শুনিনি।

এই দুঃসময়েও মানুষের মতো দেখতে কিছু লোক ত্রাণ নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি করছে। একটা সময় পর্যন্ত তো দেশে করোনা রোগীর চেয়ে ত্রাণের চাল চোরের সংখ্যা বেশি ছিল। এই করোনাবিদ্ধ দুঃসময়ে, যখন বাঁচা-মরার গ্যারান্টি নেই, তখন মানুষ কীভাবে চুরির কথা ভাবে; আমি ভেবে পাই না। এরা কি মানুষ? করোনা কি আমাদের অনেক বেশি স্বার্থপর করে তুলছে? আমরা কি আরো বেশি অমানবিক হয়ে যাচ্ছি। অনেকের ভাবটা এমন, আমি নিরাপদ থাকি, বাকি সবাই মরে যাক। কিন্তু মনে রাখবেন করোনা এমন এক সাম্যবাদী ভাইরাস, কেউই কিন্তু ঝুঁকির বাইরে নয়। বাঁচতে হলে সবাইকে নিয়েই বাঁচতে হবে। মানুষকে অবশ্যই মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। ঘৃণা না ছড়িয়ে, চলুন আমরা ভালোবাসা ছড়াই।

প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক ও লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj