বদলে যাওয়া সময়ে

রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২০

“মানুষের মাঝে সম্পর্কের উন্নয়ন হবে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি নজরদারি বাড়বে”

ডা. সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম

যুগ্ম মহাসচিব, ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)

চিফ কনসালটেন্ট, ঢাকা ডার্মাটোলজি ইনস্টিটিউট, লেজার ট্রিট এবং ডিএইচআই

করোনাভাইরাসে স্থবির চারদিক। ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) এর পক্ষ থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে পিপিই বিতরনসহ সামাজিক কর্মকান্ড শুরুতে করা হলেও এখন আপাতত অংশ নিচ্ছি না। কোভিড-১৯ রোগের এ মহামারির সময়ে আপাতত তাই গৃহবন্দি জীবনযাপন করতে হচ্ছে। কিন্তু অবসরেই যেন খুঁজে পাচ্ছি নতুনত্ব, নতুন উদ্যোম। প্রযুক্তির উৎকর্ষে গৃহবন্দিবস্থাতেও যুক্ত থাকতে পারছি প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকান্ডেও। আন্তর্জাতিক কনফারেন্স মিটিং থেকে শুরু করে রোগী দেখা সবকিছুর সমাধান হয়ে উঠছে ইন্টারনেট। ঘরে থাকার কারনে চিন্তার পরিবর্তন আসছে। প্রচুর সময় কাটাতে পারছি নিজের উন্নয়নে। পড়াশুনাতে সময় দিতে পারছি। মেডিকেল সায়েন্সের অনেক খুঁটিনাটি বিষয়ে জানতে, রিসার্চ করতে সময় পাচ্ছি।

আমার মনে হয় এই মহামারির জন্য সরকার ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যখাত ও শিক্ষাখাতে নজর বৃদ্ধি করবে। এখাতে বরাদ্দ বাড়বে। বৈশ্বিকভাবে চিকিৎসা খাত এবং চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রের সংকটগুলো থেকে উত্তরণে সবাই কাজ করবে একযোগে। তবে, রোগীর সাথে সম্পর্ক স্থাপনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রোগীর সাথে চিকিৎসা বিনিময়ের অভ্যস্ততা তৈরি হবে। এতে অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে গ্রামের বা শহরের মানুষ সহজেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারবেন। এদিকে অন্যান্য সময়ে যেহুতু আমাকে প্রচুর দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশ নিতে হয় তাই নিজেকে এবং পরিবারকে আরো বেশি সময় দেয়াও হতো না। এখন বাসাতে থাকছি। প্রচুর পড়াশুনা করছি। পাশাপাশি নেটফ্লিক্স বা ইউটিউবে নতুন নতুন সিনেমা দেখারও সুযোগ পাচ্ছি। স্মার্ট গ্যাজেট আর ইন্টারনেটের কল্যানে চিকিৎসা বিষয়ের পাশাপাশি বৈশ্বিক সংকটগুলো নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণ জানার জন্য যথেষ্ঠ সময় পাচ্ছি। তবে লকডাউনের কারনে কমবেশি পরিবর্তন এসেছে খাদ্যাভাসে। বেড়েছে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং। পরিবর্তন এসেছে ঘুমেরও। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মানবিক শ্রদ্ধাবোধ বেড়েছে। বিপদে গরীব বা আতœীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশিদের খাদ্যসংকটে এগিয়ে আসছে সমাজের সকল স্তরের মানুষ, স্বেচ্ছাসেবী বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান। মানুষের মধ্যে সংকটে পাশে দাড়ানোর মতো মানবিক ব্যাপারগুলো আরো সুদৃঢ় হচ্ছে। ঘরে থাকার কারনে পারস্পারিক যোগাযোগ বেড়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার নানা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে বাড়ছে যোগাযোগ, নানা প্রচারণার কারণে বেড়েছে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারটিও। মানুষজনের চলাচল সীমিত করার কারনে পরিবেশ ফিরে পাচ্ছে তার সৌন্দর্য। কমছে দূষণ। মোটকথা, সামাজিক এবং পারিবারিক বন্ধন আবারও দৃঢ় হবে।

নতুন সংকট, অর্থনৈতিক মোকাবেলা এবং উদ্ভাবন নিয়ে চিন্তার সুযোগ সৃষ্টি করবে এই করোনা উত্তরণের পরবর্তি সময়। অন্ধকার কেটে যাবে, আলো আসবেই।

“বদলে যাওয়া লাইফস্টাইলে যুক্ত হয়েছে হোম অফিস ধারণা”

মমিনুল ইসলাম

ভাইস প্রেসিডেন্ট, দি সিটি ব্যাংক লি.

আমি মনে করি, কোভিড-১৯, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক বিপর্যয়। খুব দ্রুত যে এ অবস্থার উন্নতি হবে তারও কোন সুনিশ্চিত লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আর যেহেতু আমরা এখন অদৃশ্য প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়ছি, সাধারণ জনমনে ভীতি আসাটাই স্বাভাবিক। সবকিছু মিলিয়ে জনজীবনে তৈরি হয়েছে স্থবিরতা। আমদানী-রপ্তানী সহ পন্য উৎপাদন এবং ডিস্ট্রিবিউশনে স্বাভাবিকতা ব্যাহত হচ্ছে। এ স্থবিরতা গোটা অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। আর এভাবে চলতে থাকলে তৈরি হতে থাকবে বৈশ্বিক বেকারত্ব লে-ওফ। যে দেশ যত দক্ষতার সাথে এই অবস্থার ম্যানেজমেন্ট করতে পারবে, করোনা পরবর্তী বিশ্বে সে দেশ হবে তত বেশি অগ্রগামী। আর দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সবার উচিত সরকারের করোনা ব্যবস্থাপনায় সকল নির্দেশনা মেনে চলা। সীমিত আকারে জরুরি সেবা চালু থাকলেও বর্তমানে চলছে সরকারি বন্ধ। বদলে যাওয়া লাইফস্টাইলে যুক্ত হয়েছে হোম অফিস ধারণা, যার সাথে আমরা খুব একটা পরিচিত ছিলামনা। টেলিফোন বা ভিডিও কনফারেন্সে টিম মিটিং এবং গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করা এখন দৈনন্দিন ব্যাপার। উপরন্তু প্রতিদিনকার ট্রাফিক জ্যাম থেকে মুক্তি, কোয়ালিটি ফ্যামিলি টাইম, ধর্মীয় বিশ্বাস আরও পোক্ত হওয়া, নিয়মিত আতœীয় এবং বন্ধুদের খবরাখবর নেওয়া সব মিলিয়ে পুরো লাইফ স্টাইলে ব্যাপক পরিবর্তন – আমার বিশ্বাস পুরো বিশ্বজুড়েই একটা বড় পরিবর্তন আসবে।

সরকার নির্দেশিত সকল সতর্ক ব্যবস্থার পাশাপাশি আমার কর্মপ্রতিষ্ঠানেরও বেশ কিছু কোভিড-১৯ সতর্ক নির্দেশনা রয়েছে। আমি এবং আমার পরিবার সবগুলোই মেনে চলছি। আমি গত ২৪ দিনে একদিন মাত্র ঘর থেকে বের হয়েছি শুধুমাত্র দৈনন্দিন বাজারের প্রয়োজনে। সকল প্রয়োজনীয় কাজ টেলিফোনেই সেরে নিচ্ছি। বাইরে বের হওয়ার সময় মাস্ক এবং সিংগেল ইউজ গøাভস নিয়ে বের হয়েছি। জুতো ঘরের বাইরে রাখার ব্যবস্থা করেছি। পন্য কেনার জন্য জনসমাগম মুক্ত দোকানে গিয়েছি। এখানে বলা দরকার, আমার স্ত্রী ফিল্ড এডমিনিস্ট্রেশনে কর্মরত একজন করোনা যোদ্ধা। সে তার কাজের প্রয়োজনে বাসা থেকে বের হতে হয়-তবে সরকার নির্দেশিত উপযুক্ত চচঊ পরে। পাশাপাশি দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় আমরা ভিটামিন সি সম্বলিত খাদ্য যেমন লেবু, কাঁচামরিচ ইত্যাদির পরিমান বাড়িয়েছি। অর্থাৎ নিজেকে, পরিবারকে এবং কমিউনিটি কে করোনা সংক্রমনের হাত থেকে বাঁচাতে নিজেরা সব নিয়ম মেনে চলছি। তবে, দীর্ঘসময়ে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া শ্রমপেশাজীবি মানুষের পাশে দাড়াতে হবে। লকডাউনে যে খাদ্যসংকটে পড়বে নি¤œআয়ের মানুষ তা থেকে উদ্ধারে সরকারের পাশাপাশি এগিয়ে আসতে হবে বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানকে।

“লকডাউনের দিনগুলোতে মানুষের মাঝে প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে”

নাসিমা আক্তার নিশা

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, রেভারি কর্পোরেশন

প্রেসিডেন্ট, ওমেন এন্ড ই-কমার্স ফোরাম (উই )

করোনা পরিস্থিতিতে পুরো বিশ্ব এখন থমকে গেছে। এমন কোন দিন যে দেখবো তা চিন্তা করিনি কখনো। আমরা সবাই মিলে প্রকৃতির প্রতি এতো বেশি অত্যাচার করেছি, হয়তো প্রকৃতির কোনো প্রতিশোধ এটা আমাদের প্রতি। দিন দিন করোনাতে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই। সামাজিক দূরত্ব মেনে লকডাউন একমাত্র উপায় আপাতত। যত দিন পর্যন্ত কোনো প্রতিষেধক না বের হয় ততদিন পর্যন্ত আমাদের অনেক সাবধানে থাকতে হবে। খাদ্যাভাসে পরিবর্তন এনে নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে।

দীর্ঘ বন্ধে জীবন অনেক খানিই বদলে গেছে। বাচ্চা কে স্কুলে দিতে হচ্ছে না, অফিস যেতে হচ্ছে না, রাস্তায় জামে বসে বিরক্ত হতে হচ্ছে না। তবে যেটা হচ্ছে আগে থেকে যেন অফিসের কাজ বেড়েছে। বাচ্চাও অনলাইন এ স্কুল করছে।

এখনো খুব বেশি অবসর পাইনি। যতটুক পাচ্ছি, সেই সময়টাকে নিজের আতেœান্নয়ন করার জন্য কিছু অনলাইন কোর্স করছি। পাশাপাশি কিছু উপন্যাসের লিস্ট করে সেগুলো একটা একটা করে শেষ করছি। বিকেল সময়টায় ছেলেটাকে নিয়ে ছাদে যেয়ে একটু খেলাধুলা করি। সন্ধ্যা থেকে কোর্স বা জুম মিটিং সেরে নিচ্ছি। যেহেতু আমি নিজে ই-কমার্স নিয়ে কাজ করছি তাই আমাদের সংগঠনের নারী সদস্যদের ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা থেকে সমাধান নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে করোনার কারণে একটি অর্থনৈতিক ধাক্কা খেতে হবে ধনী থেকে গরীব সবশ্রেণী পেশার মানুষকেই। দারিদ্রতার আরেক সংকট দেখতে হবে নি¤œআয়ের মানুষকে। অভাব থেকে বাড়বে সামাজিক অবক্ষয় এবং অপরাধ। কর্মহীন হয়ে পড়তে হবে অনেক মানুষকেই। কিন্তু সংকট থেকেই উত্তরণ। বদলে যাবে বৈশ্বিক নেতৃত্ব। প্রতিকুল পরিবেশে লড়াই করার নতুন শিক্ষা নেবে মানুষ। বদলায়ে যাবে আমাদের জীবনযাপনের গতিপথ। তবে, লকডাউনের দিনগুলিতে মানুষের মাঝে প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘসময় বাড়িতে থাকার কারনে পারিবাবিক বন্ধন দৃঢ় হবে। বিপদে সাহায্য করার মানসিকতা বৃদ্ধি পাবে। বাড়বে সামাজিক দায়বোধও। সব খারাপ জিনিসের একটা নাকি ভালো দিক থাকে। করোনার কারণে তা আসলেই জানলাম। আমরা সবাই এখন কমবেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করা শিখে গেছি। সংকটকালীন সময়ে অনলাইনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটায় আগ্রহ বাড়ছে। ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে নিজেদেরকে মানিয়ে নেয়ার জন্য এখনই একটা ট্রায়াল হয়ে যাচ্ছে। এখন আকাশ অনেক পরিষ্কার হয়ে গেছে, সমুদ্রের পানি অনেক শুদ্ধ হয়ে গেছে, বায়ুর দূষণ এখন নেই বললেই চলে। করোনা শেষ হয়ে যাওয়ার পর ও যদি পৃথিবী এমন শুদ্ধ থাকতো, তাহলে বেশ ভালো হতো।

ফ্যাশন (ট্যাবলয়েড)'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj