এরই নাম জীবন

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২০

নুরুল আমিন হৃদয়

লেখালেখি আমার একটি নেশা। লিখে শান্তি পাই। মন খারাপ হলে বেশি লিখি। আর আমার কাছে সবসময় এই লেখালেখিই বড় বিনোদন। খুব সাধারণ একজন মানুষ আমি। তাই আমার ভাবনাগুলোও সাধারণ। আমার স্ত্রী প্রায়ই বলে, ‘তুমি অন্যর জন্য ষোলো আনা আর নিজের জন্য আট আনা। নিজের ওষুধগুলো ঠিক মতো খাও না। অথচ কারো অসুস্থতায় কতবার ফোন কর!’

আমি বলি, ‘শোনো ষোলো আর আটের যোগফল চব্বিশই মানুষের জীবন। মনে রেখ ২৪ ঘণ্টায় একদিন। কে তোমাকে কী দিয়েছে ভাবাটাই জীবন নয়। তুমি তার জন্য কি করেছ সেটাই জীবন, সেটাই সুখ, সেটাই ভালোবাসা। আর এখানেই মানুষের প্রাপ্তি।’

আসলে এসব বাস্তবতার মাঝেই আমার বেড়ে উঠা। আমি জীবনযুদ্ধের সৈনিক সেই স্কুলজীবন থেকেই। এসএসসি পরীক্ষা দিয়েই ছোট্ট চাকরি নিই। চাকরির পাশাপাশি লেখাপড়া। আসলে জীবনটাই একটা সংগ্রাম, তা চলার পথে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।

ছোটবেলায় খুব স্বপ্ন দেখতাম লেখক হব। সাংবাদিক হব। পত্রিকায় মানুষের সুখ-দুঃখগুলো তুলে ধরব। একদিন ভোরের কাগজ দিয়ে লেখালেখি শুরু। ১৯৯৪ সাল একদিন দেখি অনেকে সাদা কাগজে লিখে আমেরিকার ডিভি লটারি পূরণ করছে। একজনকে বললাম, আমাকে পূরণ করে দিন। তিনি আমার ফরম পূরণ করলেন; আর পাঠিয়ে দিলাম স্বপ্নের আমেরিকার ডাক চিঠি। বেশ কিছুদিন পর আমাদের এলাকার ডাকপিয়ন আমেরিকার ফিরতি ডাক নিয়ে হাজির। আমি আমেরিকার ডিভি লটারি বিজয়ী হলাম।

কত স্বপ্ন মনে জাগল। খুশিতে ডাকপিয়নকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। পরিবারের বড় ছেলে আমি, একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিও বটে। তাই কষ্টের জীবনটাকে দূরে তাড়িয়ে সাজাতে চেয়েছিলাম সুখের জীবন। কত ছক কাটলাম, পরিকল্পনায় অলিগলি রাঙালাম কত রঙে। বাবার কথা হলো আমেরিকা যেতে দিবেন না।

আমার বাবা খুব ধার্মিক, সৎ মানুষ। আরো সহজ করে বললে ‘সহজ সরল মানুষ’ ছিলেন। আমেরিকার লটারি পেয়েছি শুনে তিনি অসন্তুষ্ট। আমেরিকার প্রতি তার ক্ষোভ উগরে দিতে চাইলেন। মাকে বললেন, ‘তোমার ছেলেকে বলো আমেরিকা যাওয়ার জন্য যেন চেষ্টা না করে’। আমি বললাম, ‘মা আমেরিকা যাওয়ার জন্য মানুষ কত উদগ্রীব। কত মানুষ দিন-রাত এক করে ফেলছে মার্কিন মুল্লুকের স্বপ্নে।’

বাবাকে বললাম, ‘বাবা আমেরিকা নিয়ে অনেক স্বপ্ন আমার।’

বাবার এককথা- ‘আমেরিকা সারা বিশে^র দেশগুলোর প্রতি অত্যাচার করে। যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেয়। এই ইহুদি-খ্রিস্টানের দেশে তুই যেতে পারবি না।’

অবশেষে বাবার কথায় চেষ্টা করলাম না তেমন একটা। ফলে বিভিন্ন কাগজপত্র ঝামেলায় আর যাওয়া হয়নি আমার।

যাক, আবার লেখালেখি পত্রিকায়। মানুষ বিয়ের পরে থিতু হয়। মজবুত করতে চায় উপার্জনের ভিত। চাকরিজীবীরা চাকরিটা মজবুত করতে উঠেপড়ে লাগে। আর আমি বিয়ের পর চাকরিটা ছেড়ে দিলাম পরিবারকে সময় দেব বলে। হায়, এবার দুই বছর বেকার! বেকার জীবনে কত রকমের অভিজ্ঞতা হলো। আপন-পর চিনতে পারলাম। কষ্টের আকারটা কত বড় হতে পারে- তা আরো একবার টের পেলাম। প্রকৃত বন্ধু চিনতে শুরু করলাম। বেকার জীবনে অনেক বন্ধুর উপকারও অবশ্য পেয়েছি।

লেখালেখিটা আমার মনের খোরাক। তাইতো জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অনেক ঝড়ের পরও চাকরি আর লেখালেখি একসঙ্গেই করেছি। হয়তো অনেকে এরকম করবে না। নানান সময়ে জীবনের ওপর বয়ে যাওয়া ঝড় থেকে শিক্ষা থেকে এগিয়ে যাওয়ার নামই জীবন।

:: ফেনী

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj