কোয়ারেন্টাইন

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২০

অধ্যাপক ডা. লিয়াকত হোসেন তপন

সংক্রামক রোগের প্রবাহ রোধ করার জন্য মানুষ বা পণ্যের চলাচল বন্ধ করাকে ছঁধৎধহঃরহব বা সঙ্গরোধ বলা হয়। রোগ নির্ণয় হয়নি এমন ব্যক্তি যে কোনো রোগীর সংস্পর্শে এসেছে তাকেই সঙ্গরোধ করা হয়। আইসোলেশন (ওংড়ষধঃরড়হ) ও কোয়ারেন্টাইন (ছঁধৎধহঃরহব) কাছাকাছি শব্দ। ওংড়ষধঃরড়হ মানে হচ্ছে কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীকে আলাদা রেখে চিকিৎসা করা। আইসোলেশনে রাখা হয় সংক্রামক রোগীকে আর কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয় সংক্রামক রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিকে যে পরবর্তী সময় রোগে আক্রান্ত হতে পারে, নাও হতে পারে। তাই সংক্রমণ রোধ ও আক্রান্তকে দ্রুত চিকিৎসা শুরুর জন্য সঙ্গরোধের বিকল্প নেই।

বর্তমান সময়ে চীনের উহান থেকে শুরু করে ইতালি, ভারত, কানাডা, আমেরিকা, সৌদি আরব এমনকি বাংলাদেশেও কোভিড-১৯-এর মহামারি বন্ধের জন্য কম-বেশি সঙ্গরোধ চলছে।

সঙ্গরোধের প্রকার-

** বাধ্যতামূলক (অনংড়ষঁঃব) বা প্রাতিষ্ঠানিক (ঐড়ংঢ়রঃধষ) সঙ্গরোধ,

যেমন : নির্দিষ্ট হাসপাতালে সন্দেহযুক্ত ব্যক্তিকে ১৪ দিন ভর্তি রেখে পর্যালোচনা করা।

** আবাসিক (ঐড়সব) সঙ্গরোধ- সন্দেহযুক্তকে নিজ বাড়িতে সঙ্গরোধে রাখা।

বর্তমানে আবাসিক সঙ্গরোধের পাশাপাশি নির্দিষ্ট এলাকার যোগাযোগ বন্ধ করা বেশি প্রচলিত যা কর্ডোন বা শাটডাউন নামে পরিচিত। তবে সন্দেহময় ব্যক্তি যে কোনো প্রকারের সঙ্গরোধেই থাকুক না কেন তার মৌলিক অধিকার অনেকাংশে রক্ষা করা সমাজের দায়িত্ব।

সঙ্গরোধে থাকাকালে ব্যক্তির দায়িত্ব-

** নির্দিষ্ট কক্ষ/ঘরের মধ্যে অবস্থান করা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।

** কোনো ব্যক্তি/প্রাণীর দৈহিক সংস্পর্শ বর্জন করা।

** নির্ধারিত টয়লেট, বেসিন, গোসলখানা/পানির ভাণ্ডার ব্যবহার করা যা অন্য কেউ স্পর্শ করতে পারবে না।

** আলাদা বিছানা, বালিশ, চাদর, মশারি ও কম্বল/লেপ ব্যবহার করা।

** আলাদা স্যান্ডেল, জুতা, জামা/কাপড়, জগ-গøাস ও থালা/বাসন ব্যবহার করা।

** জরুরি প্রয়োজনেও অন্য মানুষ বা প্রাণীর ৩ ফুটের মধ্যে না যাওয়া।

** যে কোনো জমায়েত, বাজার, পুকুর, ক্লাব/সিনেমা হলে না যাওয়া।

** নিয়মিত স্বাস্থ্য কর্মীর (ঞঐঅ, ঈঝ) সঙ্গে মোবাইলে বা নেটে যোগাযোগ রাখা।

** বিনোদনের জন্য ঞঠ দেখা, পেপার/বই পড়া, নেট ব্যবহার করা বা মোবাইল ফোন ব্যবহার করা।

** সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রেখে নিজ ধর্ম একাকী পালন করা।

সঙ্গরোধে স্বাস্থ্যকর্মী/প্রশাসনের দায়িত্ব-

** নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

** খাদ্য, পানীয় ও অন্যান্য সামগ্রীর প্রাপ্তি নিশ্চিত করা

** সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা, অভয় দান, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনে সহায়তা দান।

** সম্মানজনক সঙ্গরোধ নিশ্চিতকরণ।

** পরীক্ষার ফল অনুযায়ী সামাজিক পুনর্বাসন বা পরবর্তী চিকিৎসার জন্য সহায়তা করা।

** সঙ্গরোধে থাকা ব্যক্তি নিয়ম ভঙ্গ করলে সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮ অনুযায়ী ব্যবস্থা করা।

সঙ্গরোধে সমাজের দায়িত্ব-

** সঙ্গরোধে উপস্থিত ব্যক্তির সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে ভালো ব্যবহার।

** সমালোচনা, কট‚ক্তি, তর্ক-বিতর্ক না করা।

** সঙ্গরোধকৃত ব্যক্তির পরিবারকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা, সাহায্য/সহযোগিতা করা।

সঙ্গরোধে পতাকার ব্যবহার-

সঙ্গরোধের বাড়ি বা জাহাজে পূর্বে হলুদ, সবুজ বা কালো রঙের পতাকা ব্যবহৃত হতো যা বর্তমানে অপ্রয়োজনীয়।

বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্গরোধের ক্ষেত্রে সাইনবোর্ড ব্যবহার করা হয়।

শেষকথা-

সঙ্গরোধে থাকা ব্যক্তিকে সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি (যথা- পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, হ্যান্ডসেক না করা, খাবার আগে ও টয়লেটের পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, হাঁচি/কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা, প্রাণী নাড়াচাড়া না করা, ঘন ঘন পানি পান করা ইত্যাদি) ও সঙ্গরোধের বিধি মেনে চলতে হবে। সঠিকভাবে সঙ্গরোধের মাধ্যমে ব্যক্তির স্বাস্থ্য রক্ষার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের স্বাস্থ্য রক্ষা পায়। মনে রাখতে হবে সঙ্গরোধে থাকা মানে অসুস্থতা নয়, সবার স্বাস্থ্যরক্ষায় সহায়তা করা।

অধ্যক্ষ

শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ

গোপালগঞ্জ

মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসেস লি.

উত্তরা শাখা, ঢাকা।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj