নববর্ষ আলোর প্রতীক্ষায়

মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২০

কামাল লোহানী

নতুন বছর আনন্দ-উৎসবের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন জুড়ে দেয় দেশজুড়ে। তাই আমরা জনগণ মেতে উঠি নবজীবনের সমৃদ্ধি কামনায়। এবারের উৎসব ভিন্নভাবে পালিত হচ্ছে। প্রাণঘাতী করোনা দীর্ঘ বছরের প্রাণের উৎসবে হানা দিয়েছে। ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে করোনা পরিস্থিতি। ভালো কোনো খবর আসছে না। আতঙ্ক এবং শঙ্কার খবরই বেশি। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সরকার একটি নির্দেশনায় বাংলা নববর্ষের সব অনুষ্ঠানে জনসমাগম বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। ঘরে বসে ‘ডিজিটাল পদ্ধতিতে’ পহেলা বৈশাখ উদযাপনের জন্য বলা হয়েছে সরকারের তরফ থেকে। এই দুর্যোগে আমরা কেউ ঝুঁকির বাইরে নই। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমরা সবাই মিলে এই দুর্যোগ মোকাবিলা করব। আমাদের সবার মনে থাকার কথা ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও বৈশাখ এসেছিল। মুক্তিযোদ্ধা শব্দসৈনিক- কবি মুস্তফা আনোয়ার শত্রুকে পরাস্ত করার জন্য তার কবিতার পঙ্ক্তিতে রুদ্র বৈশাখের শক্তি প্রার্থনা করেছিলেন। ‘বৈশাখের রুদ্র জামা আমায় পরিয়ে দে মা’ হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কবলিত পূর্ব বাংলার বুক থেকে হায়েনা-পিশাচদের পরাজিত করার লক্ষ্য নিয়ে লিখেছিলেন যে কবিতা, তার এই পঙ্ক্তি প্রমাণ করে কবি যেন বাংলার মানুষের আকাক্সক্ষারই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। আমরা তো আদতেই বিপুল প্রাণের প্রবল শক্তি নিয়ে সেদিন মুক্তিযুদ্ধে হানাদার পাকিস্তানিদের পরাভূত করে নিজ মাতৃভূমিকে দখলদার চক্রের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করেছিলাম। করোনা যুদ্ধেও আমাদের জয়ী হতে হবে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।

বৈশাখ তো আমাদের নতুন বছরের সূচনা করে। তাই উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠে সারা বাংলা। ঘরে ঘরে পিঠে-পুলি, পায়েস রান্নার ঘ্রাণে কি যে মৌতাত সৃষ্টি করে, সে কথা আজ আর বোধহয় বলা যাবে না। তবুও ফেলে আসা দিনগুলোর গøানি মুছে ফেলার আনন্দে আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই যেন মেতে ওঠেন। নববর্ষের আনন্দ উৎসব গ্রামকে ছেড়ে যেন শহরকে আকৃষ্ট করেছে। তাই বর্ষবরণের কত না অভূতপূর্ব আয়োজনই আমরা শহরে দেখতে পাই। এ বর্ষবরণ উৎসবে মঙ্গল শোভাযাত্রা চারুকলা থেকে প্রতি বছর বের হয় চলমান পরিস্থিতি ও শাসন ব্যবস্থার অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতীকী শিল্পকর্ম নিয়ে। কখনো বিশাল ময়ূর, কখনোবা আজদাহা প্রতিনিধিত্ব করছে সময়ের। এ ছাড়া কত যে পাখি নানা ধরনের শিল্পকর্মের সৃষ্ট বঙ্গ সংস্কৃতির রূপ উঠে আসছে চঞ্চল তরুণ-তরুণীদের হাতে। মুখোশ এ আনন্দ উৎসবের একটি বিশেষ আয়োজন। সারা বাংলার মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে এই নববর্ষের দিনটির। কারণ এ দিনেই যে তিনি সাজবেন নতুন পোশাকে আর দূর-দূরান্ত থেকে হেঁটে হেঁটে পৌঁছে যাবেন রমনার বটমূলে আর শাহবাগ চত্বরে। আহা কি আনন্দ, কি প্রাণোচ্ছল উৎসব বাংলার মানুষের। কিন্তু সন্ত্রাস আর জঙ্গিবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি যখন হামলা করে সংস্কৃতির ওপর তখন রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানেও বোমা হামলায় ১০ জনকে প্রাণ দিতে হয়। এই ইতিহাস লেখা আছে আমাদের সংগ্রামে মুক্ত স্বদেশের এক পর্যায়ে। এত বড় আঘাত এবং মারণযজ্ঞ সত্ত্বেও বাঙালি কি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে উৎসব আয়োজন বন্ধ করে দিয়েছিল, না দেয়নি। বরঞ্চ সগর্বে নবশক্তির উত্থান ঘটিয়ে তারা জঙ্গিবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তুলেছিল সংস্কৃতির সংগ্রামে।

বাঙালির জীবনে বর্ষবরণ, নবান্ন, বর্ষামঙ্গল, বসন্ত উৎসব, শারদ উৎসব এমনই বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশে দুঃখ-যাতনা, দমন-পীড়ন এসবের মধ্যেও প্রাণোচ্ছল বাংলার মানুষ তাদের জীবননির্ভর আয়োজনগুলোকে অব্যাহত রেখেছেন। জঙ্গি পিশাচ শক্তির ভয়ে আমাদের জীবনের প্রচলিত আনন্দকে নির্দেশের বাঁধনে বেঁধে ফেলা এক নিন্দনীয় আঘাত। আমরা সবাই মুক্তিযুদ্ধ করে দেশটাকে স্বাধীন করেছি। দেশের এই মহাসংকটে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাকে তথা বাংলার সব মানুষের ইপ্সিত স্বদেশ ভূমি গড়ে তুলতে সহায়ক হওয়ার অঙ্গীকার গ্রহণ করতে হবে আজকের এই পহেলা বৈশাখে- বর্ষবরণে। আলোর প্রতীক্ষায় রইলাম।

দ্বিতীয় সংস্করন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj