বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের এ কেমন রূপ!

মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২০

শামসুজ্জামান খান

নববর্ষ বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব। এ উৎসবকে বড় করেছি আমরাই- পূর্ব বাংলার বাঙালিরা। আমরা যে এককালের পল্লীবাংলার ক্ষুদ্র সামান্য একটা উৎসবকে আমাদের স্বপ্ন দিয়ে, আশা দিয়ে, আকাক্সক্ষা দিয়ে গড়ে তুললাম তার কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে পূর্ব বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক তো বটেই ধর্মীয় কারণের মধ্যেও অনুসন্ধান করতে হবে। কৃষিপ্রধান পূর্ব বাংলা গোটা ভারতবর্ষের সঙ্গে ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত হলেও চিন্তাচেতনা ও মানসিক ও মনস্তাত্তি¡কভাবে অনেকটা আলাদা। এই অঞ্চলের একটা স্বকীয় সত্তা আছে। তার একটা কারণ এই অঞ্চলের মানুষের মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠা বিশেষ করে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও স›দ্বীপের মানুষ পঞ্চদশ, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে বাংলা ভাষার চর্চা ও ভাষা রক্ষার ক্ষেত্রে যে অবদান রেখেছে তা বিস্ময়কর। আলাওল, শাহ মোহাম্মদ সগীর, সৈয়দ সুলতান, আলী রজা, আবদুল হাকিম এঁরাই কিন্তু বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিকে একটি শক্তিশালী রূপ দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তা গঠনের ভিত্তি নির্মাণ করেছেন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো এঁরা মুসলমান। তাহলে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও বাঙালি, জাতিসত্তা গঠনে বাঙালি মুসলমানের কৃতিত্বই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে বোঝা যায় বাংলার দুশ বছরের স্বাধীন সুলতানী আমলের সুশাসন ও উদার সমন্বয়বাদী নীতির প্রভাবেই এটা সম্ভব হয়েছে। আলাউদ্দীন হোসেন শাহ, শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ, রাজা গণেশের শাসনের ফলেই বাঙালি সত্তার বিকাশ ও সমন্বয়বাদী জীবনদর্শন গড়ে ওঠে। স্থানীয় উৎসব অনুষ্ঠান পার্বণও এঁদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে।

বাঙালি বর্ণ হিন্দু সাংস্কৃতিক দিকদর্শনের জন্য উত্তর ভারতের দিকে তাকাতে হয়, কিন্তু বাঙালি মুসলমানকে তাকাতে হয় লোকায়ত জীবন ও সংস্কৃতির দিকে। সেই উৎসব থেকে তারা তুলে আনে বৈশাখী উৎসব ও মেলা চৈত্রসংক্রান্তিকে। বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় উৎসব থাকলেও সর্বমানবিক উৎসব ছিল না। পহেলা বৈশাখ হলো তাদের সেই উৎসব। এই উৎসব আগে বাঙালি হিন্দুরাও করতো জমিদারদের পুণ্যাহ আর ব্যবসায়ীদের হালখাতা আর সাধারণ বাঙালির মেলার মাধ্যমে। ষোড়শ শতকে বাংলা মুঘলদের অধিকারে আসে। শাসন ব্যবস্থা সুসংগঠিত হয়। এর আগের মাৎসন্যায় কাটিয়ে সুলতানী আমলে বাঙালিত্বের যে অঙ্কুরোদগম হচ্ছিল মুঘল শাসনে প্রথমে তা একটা বাধার মুখে পড়ে ভাষার প্রশ্নে। মুঘলরা ফার্সি চাপাতে চেয়েছিল। অভিজাত শ্রেণি ও তখনকার উদীয়মান বণিকেরাও ছিল ফার্সির পক্ষে। তাদের যুক্তি ছিল মুঘল আমল থেকেই ভারতের রাজভাষা ফার্সি, সেখানে বাংলা ভাষার কথা বাংলা প্রদেশে নতুন করে আসে কেন? বাংলায় তো ফার্সি জানা লোকের কমতি নেই। আর বাংলায় ফার্সি সাহিত্যও যথেষ্ট সম্মৃদ্ধ। কিন্তু এ যুক্তি মানলেন না চট্টগ্রাম, নোয়াখালী আর স›দ্বীপের বাঙালি কবিরা। বাংলা ভাষার পক্ষে বিদ্রোহের শুরু সেই ষোড়শ শতকেই। ধর্মীয় কবিতাই লিখেছিলেন চট্টগ্রামের কবি সৈয়দ সুলতান। তাই তাঁকে বলা হলো ‘মোনাফেক’। প্রতিবাদে কবি এক অসাধারণ উত্তর দিলেন : ‘যারে সেই ভাসে প্রভু করিলেন সৃজন/সেই ভাস হয় তার অমূল্য রতন।’ সেই থেকে বাঙালির ভাষিক ও সংস্কৃতির মুক্তির সূত্রপাত।

বাঙালি মুঘল আমলে ফার্সির আধিপত্য থেকে মুক্তি পেল, কিন্তু দেশীয় ভিত্তির ওপর নির্ভর করে নতুন কোনো মৌলিক সাংস্কৃতিক পাঠাতন তৈরি হতে পারল না। কারণ পলাশীর যুদ্ধে বণিক ইংরেজের কাছে পরাজয়ে তাদের আধিপত্য মেনে নিতে হলো বাংলার মানুষকে। ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসকেরা দেশ শাসনের লক্ষ্যে ১৭৯৩ সালে যে চিরস্থায়ী ব্যবস্থার প্রবর্তন করলেন তাতে সৃষ্টি হলো জমিদারি প্রথা। দেশের সাধারণ মানুষ পরিণত হলো প্রজায়, জমিদাররা হলেন মধ্যস্বত্বভোগী, আর মাথার ওপরে রইল ইংরেজ শাসকেরা। নব্য জমিদারি প্রথা এবং মুঘল আমল থেকে বিকশিত বণিকতন্ত্র শোষণের উপায় হিসেবে আবিষ্কার করল নতুন বছওে দুই উৎসবের। একটি জমিদার বাড়ির উৎসব ‘পুণ্যা’। প্রজারা ওই দিন জমিদার বাড়িতে আসবে খাজনা চুকিয়ে মিষ্টিমুখ করে বাড়ি ফিরে যাবে। তো, জমিদাররা মজালুটবে আর বণিকেরা চেয়ে চেয়ে দেখবে তা তো হতে পারে না! তারাও আবিষ্কার করে ফেললেন আরেক উৎসব : ‘হালখাতা’। গরিব মানুষ নগদ পয়সার অভাবে সারা বছর দোকান থেকে বাকিতে জিনিসপত্র কিনবে নববর্ষে হালখাতা উৎসবে বকেয়া শোধ করে মিষ্টিমুখ করে ঘরে ফিরবে। আর গরিব মানুষ মেলায় যাবে, গরুর দৌড়, ষাঁড়ের লড়াই দেখবে বা যাত্রাপালা দেখবে এই তো ছিল বাঙালির নববর্ষ উৎসব।

দুই.

ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নানা পর্যায়ে একদিকে শুরু হলো বিদ্রোহ, অন্যদিকে স্বদেশ অন্বেষা। কলকাতায় নবগোপাল মিত্র একটি জাতীয় মেলার প্রস্তাব করেন। তিনি এর নামকরণ করেছিলেন ‘চৈত্রমেলা’। এর উদ্দেশ্য স্বদেশ চিন্তা ও দেশের মানুষকে শুভ ও কল্যাণ চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করা। কিন্তু সে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হলো। মেলার নামকরণ করা হলো : ‘হিন্দুমেলা’। মেলার দ্বিতীয় অধিবেশনে ঠাকুর পরিবারের সন্তান সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথমে সুরটা বেঁধে দিয়েছিলেন যথাযথভাবে : “মিলে সবে ভারত সন্তান, একতান মনপ্রাণ, গাও ভারতের যশগান।” কিন্তু সব শেষ করে দিলেন ওই পরিবারেরই গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি মেলার উদ্দেশ্য ঠিক করলেন নি¤œরূপ : “এই মেলার প্রথম উদ্দেশ্য, বৎসরের শেষে হিন্দু জাতিকে একত্রিত করা। …যত লোকের জনতা হয় ততই ইহা হিন্দুমেলা ও ইহা হিন্দুদিগেরই জনতা এই মনে হইয়া হৃদয় আনন্দিত ও স্বদেশানুরাগ হইতে থাকে।” আলোকিত ঠাকুর বাড়ির সন্তানের উপযুক্ত উক্তিতে জাতীয় প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় পঙ্ক নিমজ্জিত হয়ে যায়। আর তাই ঊনবিংশ শতকের তথাকথিত রেঁনেসা হয়ে গেল ক্ষুদ্র নগরবাসীর হিন্দু বাঙলার সুবিধাবাদ ভিক্তিক দল।

তিন.

ফলে পূর্ব-বাংলা বেদনাহত হয়েছে। কিন্তু ধর্ম-সাম্প্রদায়িক জাগরণকে লক্ষ্য নির্ধারণ করে নাই। ষোড়শ সপ্তদশ শতকে বাংলা ভাষাকে আঁকড়ে ধরে চট্টগ্রাম- স›দ্বীপের কবিরা বাংলা ও বাঙালিত্বকে রক্ষা করেছিলেন তা ধীরে ধীরে একটি তাত্তি¡ক যুক্তিবাদী দর্শনে রূপ দিয়েছে বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ঢাকায়। ১৯২৬ সালে গড়ে উঠল বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন। উপর্যুক্ত আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮-৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের বিপ্লবে সৃষ্টি হলো ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতিসত্তা। ফলে নবায়ন ঘটল বাংলা নববর্ষ উদযাপনে। ঢাকায় নতুন নতুন সংস্থা নবআঙ্গিকে নববর্ষ উৎসব উদযাপনে উদ্যোগী হলো। বাংলা একাডেমি বাংলা পঞ্জিকা ও বর্ষপঞ্জির বৈজ্ঞানিক সংস্কার করে বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার সিদ্ধানুসারে। ছায়ানট রবীন্দ্র-নজরুলসহ পঞ্চ কবির গান ও লোকসংগীত সহযোগে যে নববর্ষ উৎসব করে তাকেই বলতে পারি প্রকৃত সাংস্কৃতিক জাগরণ। পরে এলো মঙ্গল শোভাযাত্রা চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে। গ্রামীণমেলার সঙ্গ থেকে নেয়া হলো উপাদান। গম্ভিরা থেকে এবং যাত্রার বিবেক ও সমাজ সমালোচনামূলক উপাদান থেকে সংযুক্ত হলো কিছু অংশ, ঢাকা শহরের ঐতিহ্যবাহী ঈদ মিছিলের কিছু, রমনার কিছু অংশের সংলগ্নতায় সৃষ্টি হলো তির্যক হাস্যরস ও নির্দোষ বিনোদন। এই আমাদের নববর্ষ উৎসব।

এ বছরের করোনা ভাইরাসে গোটা বিশ^ বিপর্যস্ত, স্থবির। কিন্তু অদম্য বাঙালির নববর্ষ উৎসব আমাদের যাপিত জীবনসংলগ্ন বটমূল-পাকুড়তলার স্পেসে হতে না পারলেও ভার্চুয়াল স্পেসে অনুষ্ঠিত হবে। তাই দেখতে হবে ইমেজ হিসেবে টেলিভিশন, ফেসবুক ও কম্পিউটারে। আসুন এ বছর ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হিসেবে উপভোগ করি নববর্ষ উৎসব।

দ্বিতীয় সংস্করন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj