করোনার সময়ে ঘরের ভেতরও নারীর ঝুঁকি

সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২০

সারথী ভৌমিক

অদৃশ্য শত্রু করোনাকে প্রতিরোধ করতে বিশে^র অনেক দেশের মানুষই ঘরবন্দি হয়েছেন। এই ঘরবন্দি অবস্থা নারীদের জন্য বিপদ ডেকে আনছে। এই সময়টায় নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানেও এই তথ্য উঠে এসেছে। আর তাই তাদের নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে জাতিসংঘ ও নারী নির্যাতন নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো।

বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নির্যাতনের শিকার এমন নারীর কথা। ভারতের যোধপুরের গীতা। তার দিন শুরু হয় ভোর ৫টায়। তার স্বামী বিজয় অটোরিকশা চালক। ভারতে লকডাউন চলায় গণপরিবহন বন্ধ করা হয়েছে। সেই থেকে তাদের দুরবস্থা চলছে। বিজয়য়ের দৈনিক আয় ছিল দেড় হাজার রুপি। তা এখন কমে দাঁড়িয়েছে ৭০০ রুপিতে। মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরে ভাঙচুর চালায় বিজয়। চুলের মুঠি ধরে গীতাকে মারধর করে। বাবার এমন মূর্তি দেখে ভয়ে শিধিয়ে থাকে তাদের দুই সন্তান। অনেক সময় সন্তানদেরও মারধর করে বিজয়।

আমাদের দেশের চিত্র যে সুখকর তা নয়। অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের এক গবেষণা বলছে, পুরুষতন্ত্রে প্রচলিত বিশ্বাস হচ্ছে, নারী ঘরেই নিরাপদ। অথচ বাড়িতেই নারী বেশি সহিংসতার শিকার হন। ঘরের প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজন নারীই নানাভাবে পরিবারের সদস্যদের দ্বারা নির্যাতিত হন। বিবাহিত নারীদের ৮২ শতাংশই স্বামীর হাতে কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। ১২ হাজার ৫৩০ জন নারীর ওপর পরিচালিত এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। তবে বিবাহিতদের মধ্যে গ্রামের নারীরাই বেশি নির্যাতিত হন। আবার বয়স অনুযায়ী নির্যাতনের হার পাল্টাতে থাকে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বিবিএস বলছে, যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে অবিবাহিত নারীরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। আর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে বিবাহিত নারীরাই নিপীড়নের শিকার হন বেশি।

জাতিসংঘ বলছে, তুলনামূলকভাবে দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় ঘরে যারা নিপীড়নের শিকার হন, তাদের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। বিবিসি ও রয়সার্টসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, যুক্তরাজ্যে সরকারি হটলাইনে নির্যাতনের শিকার নারীদের ফোন ৬৫ ভাগ বেড়েছে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের গৃহ নিপীড়ন বিষয়ক কমিশনার এমন তথ্য দিয়েছেন।

ইউরোপের দেশগুলোতে ঘরবন্দি হয়ে পড়ায় নারী-পুরুষ বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীদের মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হচ্ছে। এর থেকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছে না শিশু-কিশোররাও। এ ধরনের পারিবারিক সহিংসতা ফ্রান্সে ইতোমধ্যে বেড়েছে ৩০ শতাংশ।

জার্মান ফেডারেল এসোসিয়েশন অব উইমেনস কাউন্সেলিং সেন্টার্স এন্ড হেলপলাইনস (বিএফএফ) বলেছে, এই মুহূর্তে বহু মানুষের জন্য তাদের বাড়িই আর নিরাপদ নয়। এএফপি বলেছে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে মনের ওপর চাপ পড়ছে। দুশ্চিন্তা বাড়ছে। নারী ও শিশুদের ওপর পারিবারিক ও যৌন সহিংসতার ঝুঁকিও এতে করে বাড়ছে। মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, এই ঝুঁকি শুধু বাড়িতে সীমাবদ্ধ নেই। স্বেচ্ছায় বন্দি থাকার এই কষ্টের পাশাপাশি সামনের দিনে চাকরির নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমস্যা বাড়বে। এসব সমস্যা ঘরে চাপ বাড়াচ্ছে।

চীনের নারী অধিকার প্রতিষ্ঠান উয়েইপিং জানিয়েছে, করোনার মধ্যে নারীদের ওপর সহিংসতার হার তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। জার্মান ফেডারেশন বলছে, শিশু-কিশোর ও নারীরা যারা এখন মানসিক ও শারীরিকভাবে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে, তাদের আসলে নির্যাতকরা হাতের কাছে পাচ্ছে।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj