করোনা ভয়াবহতায় ডেন্টাল রোগীর করণীয়

শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২০

ডা. মো. আসাফুজ্জোহা রাজ

সময়টি এখন করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে একসঙ্গে যার যার অবস্থান থেকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার, সঠিক ও সহজ ভাষায় সচেতনতা বাড়ানোর। পরিসংখ্যান না থাকলেও অনুমেয় যে দেশের অনেক মানুষ এখনো সঠিক সচেতনতায় সতর্ক নয়।

করোনা এখন বিশ্ব মহামারি, আর তাই শুধু চিকিৎসক নয়, সব পেশার মানুষকে এ রোগ সংক্রমণ রোধে সঠিক শিক্ষা নিয়ে দৃঢ়ভাবে তা পালন করতে ও অন্যকে সাধ্যমতো উৎসাহিত করা অতি জরুরি। বিষয়টি এখন নিশ্চিত যে আক্রান্ত রোগীর মাধ্যমেই এ রোগ ছড়াচ্ছে, সুতরাং সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান দায়িত্ব নিজেকে আলাদা করে রক্ষিত রাখা। কিন্তু কিছু সেবাদানকারী পেশা যেমন ডেন্টাল চিকিৎসকরা চাইলেই নিজেকে আলাদা করে রাখাটা দুস্কর, পেশাগত দায়বদ্ধতা থেকে রোগীর ডেন্টাল কষ্ট কমাতে এরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছে যে করোনা ভাইরাস মানুষের উপরের শ্বাসতন্ত্রে থাকতে ভালোবাসে, অর্থাৎ মুখ গহŸরে এদের অবাধ বিচরণ আর ডেন্টাল চিকিৎসকদের এখানেই কাজ করতে হয়।

বিষয়টি হয়তো স্পষ্ট যে মাত্র তিন মাসের মতো আগত এই ভাইরাসের সঠিক আচরণ নির্ভুল তুলে ধরাটা গবেষকদের জন্য প্রায় অসম্ভব, কিন্তু তারপরও নির্ভরযোগ্য সংস্থাগুলো যথাসম্ভব চেষ্টা করে যাচ্ছে নানা দিক তুলে ধরে আমাদের সতর্ক করতে। আর তাই নির্ভরযোগ্য সূত্র ছাড়া গুজব বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সব তথ্যকে বিশ্বাস করে অনুশীলন করা বোকামি হবে।

ডেন্টাল রোগীর বিশেষ সচেতনতা :

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের উপদেশ মতো ছয় মাস অন্তর যে ডেন্টাল চেকআপ করার কথা আমরা সব সময় বলে থাকি সেই উপদেশ থেকে আপাতত বিরত থাকতে হবে, কিন্তু বাসায় থেকে মুখ পরিষ্কারের বাকি উপদেশগুলো আরো শক্তভাবে পালন করা খুব জরুরি কারণ নিজেকে সুস্থ রাখার চেষ্টাতে যেন কোনো অবহেলা না হয়। ঘরে বসে কোয়ারেন্টাইনে অলসতায় যেন শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে না যায় সেদিকে শক্ত নজর দিতে হবে। অবস্থা ভেদে ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা ঘরের মধ্যেই ব্যায়াম করতে হবে আর খাদ্যতালিকায় ভিটামিন সি যুক্ত খাবারসহ স্বাস্থ্যবান্ধব খাবার রাখতে হবে। আতঙ্কে না থেকে প্রফুল্ল থাকতে হবে, ধূমপান ও মদপান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে, শরীরের অন্যান্য রোগ যেমন ডায়াবেটিস, ব্লুাড প্রেসার, শ্বাসকষ্টকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

মুখ গহŸরের কোনো কষ্ট বা অস্বাভাবিকতায় নিজস্ব আস্থাভাজন চিকিৎসকের টেলিপরামর্শ নিতে হবে, আর তাই চিকিৎসকের ফোন নম্বর সংগ্রহে রাখাটা জরুরি। বিপদের এই সময় চিকিৎসক ফোনে বিরক্ত হবে না, তবে অতি প্রয়োজন ছাড়া ফোন না দেয়াটা ভালো, কারণ উনাকে অনেক রোগীর টেলিপরামর্শ দিতে হচ্ছে।

তবে বিশেষ প্রয়োজন যেমন :

১। অসহনীয় দাঁতে ব্যথা, যা চিকিৎসকের টেলিমেডিসিনে না কমলে

২। মাড়ি বা মুখের অভ্যন্তরের কোথাও থেকে অনিয়ন্ত্রিত রক্তপাত

৩। ডেন্টার সংক্রমণ থেকে নিচের চোয়াল বা চোখের নিচে অস্বাভাবিক ফুলে যাওয়া অথবা

৪। দুর্ঘটনায় দাঁত পড়ে গেলে বা বড় ধরনের আঘাত পেলে

এসবের যে কোনো একটা সমস্যায় পড়লে প্রথমে আপনার নিজস্ব বিডিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসককে টেলিফোনে বিষয়টি জানাতে হবে, পাশাপাশি কোনো গোপনীয়তা ছাড়া অবশ্যই স্পষ্টভাবে জানাতে হবে :

১। করোনা বা সাধারণ ভাইরাস আক্রান্ত যে কোনো উপসর্গ যেমন জ্বর, কাশি, সর্দি, শ্বাসকষ্ট বা শরীরে ব্যথা ছিল বা আছে কিনা।

২। এমন উপসর্গসহ কোনো মানুষের সংস্পর্শে ছিল কিনা

৩। বিদেশ ফেরৎ কোনো ব্যক্তির সংস্পর্শে ছিল কিনা অথবা নিজে শেষ কবে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন।

৪। পেশাগত বা অন্য কোনো প্রয়োজনে জনসমাগমে যেতে হয় কিনা।

অহেতুক ভয় বা এমন ভ্রান্ত ধারণার কোনো কারণ নেই যে এসব ইতিহাস থাকলে কোনো রোগী তার প্রয়োজনীয় ডেন্টাল চিকিৎসা পাবে না। বড়জোর ক্ষেত্র বিশেষে ডেন্টাল চিকিৎসক পুরো ইতিহাস জেনে প্রয়োজনে ভিডিও কলের ব্যবস্থাপনায় সুপরামর্শের মাধ্যমে ডেন্টাল কষ্ট লাঘবের প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা দেবেন অথবা প্রয়োজন পড়লে রোগী কি সাবধানতায় সরাসরি সাক্ষাৎ করবে তার বিস্তারিত জানাবে আর রোগীকে সেটা নিজের, চিকিৎসকের, চিকিৎসা কেন্দ্রের উপস্থিত সবার এমনকি দেশের সবার মঙ্গলের জন্য সঠিক ও কঠোরভাবে মেনে নিয়ে তা অনুসরণ করতে হবে।

প্রাথমিক অবস্থায় ডেন্টাল রোগীকে অবশ্যই নতুন সার্জিকাল মাস্ক ব্যবহার, পরিষ্কার পোশাক, ৩০ সেকেন্ডের বেশি সময় ধরে সাবান দিয়ে সঠিকভাবে হাত ধুয়ে ক্লিনিকে আসতে হবে। আসার পথে কাশি বা হাঁচিতে টিস্যু ব্যবহার করে তা সঠিক স্থানে ফেলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে যেন শরীরের কোথাও কোনো সর্দি, লালা বা কাশি লেগে না থাকে, মাস্ক ও হাত ধোয়ার বিষয়টি যেন মনগড়া পদ্ধতিতে না হয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতিতে হয়। প্রয়োজনে সেটাও চিকিৎসকের কাছ থেকে ফোনে জেনে নিন। বাজারজাত ১% পোভিডন মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করে আসতে পারলে ভালো। ডাক্তার বা সহকারীর কমপক্ষে ৫ ফুট নিরাপদ দূরে থেকে জানাতে হবে তার উল্লেখিত সব কিছু, কোনো অবস্থাতেই অনুমতি ছাড়া কোথাও স্পর্শ করা যাবে না। বর্তমান সময়ে চিকিৎসকদের নিজস্ব নিরাপত্তায় ব্যবহৃত সরঞ্জামের মহাসংকট, আপনার আস্থাভাজন চিকিৎসক যদি রোগীকে অতি জরুরি ক্ষেত্র বিশেষে অন্য কোনো নিরাপদ চিকিৎসা কেন্দ্রের কথা বলে তো সেটা রোগীর নিজের ও দেশের মানুষের ভালোর জন্যই বলবে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে ডেন্টালের চিকিৎসা করোনা শঙ্কায় অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ চিকিৎসকদের ব্যবহৃত বেশির ভাগ যন্ত্র এরোসল তৈরি করে, আর এর মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ায়। সুতরাং চিকিৎসক, রোগী, সহকারীসহ সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। দেশে ১৩ হাজারের মতো অনুমোদিত ডেন্টাল চিকিৎসকের পাশাপাশি অসংখ্য অবৈধ হাতুড়ে ভুয়া চিকিৎসক আছেন, কোনো অবস্থাতেই তাদের সহজে পাওয়ার জন্য সেখানে যাওয়া যাবে না, এতে জটিলতা আরো বাড়তে পারে।

সামনের কিছু দিন আমরা আমাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা মেনে চলি, অতি জরুরি ছাড়া কোনো অবস্থাতেই বাসার বাইরে বের না হওয়া

রাজ ডেন্টাল সেন্টার, কলাবাগান

রাজ ডেন্টাল ওয়ার্ল্ড, ধানমন্ডি ১৩

সদস্য সচিব, বিএফডিএস।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj