ছুটি না হওয়ায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে চা শ্রমিকদের

বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২০

সালেহ এলাহী কুটি, মৌলভীবাজার থেকে : করোনা সংক্রমণের ভয় নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে চা জনগোষ্ঠীর। করোনা সংক্রমণ রোধে সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক সিলেট বিভাগের ছোট-বড় ১৬৮টি চা বাগান চলছে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়। বাগানগুলোতে সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক ছুটি না হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা চিন্তা করে কাজে যেতে নারাজ চা শ্রমিকরা। তারা ছুটির দাবিতে ধর্মঘটও পালন করেছেন। গত ২৮ মার্চ মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও এবং ইছামতি ও মাকড়িছড়া চা বাগানের শ্রমিকরা ছুটির দাবিতে ধর্মঘট পালন করেন। ধর্মঘটের বিষয়ে সাতগাঁও চা বাগানের ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম বলেন, চা শ্রমিকদের ছুটি না হওয়ায় শমশেরনগর চা বাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে মিলিত হয়ে ছুটির দাবিতে ধর্মঘট পালন করেন তারা। তবে সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাগানের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছি। যেসব শ্রমিক কাজে আসেননি তাদের অনুপস্থিত হিসেবেই মূল্যায়ন করবে ম্যানেজমেন্ট।

করোনা সংক্রমণের বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশে যখন সাধারণ ছুটি চলছে, তখন কাজে যেতে হচ্ছে চা বাগানের শ্রমিকদের। বাগানগুলোতে ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস তাদের। কোনো কোনো বাগানে হাত ধোয়া ও পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী বিতরণ করলেও তা নিতান্তই অপ্রতুল।

শ্রমিক নেতারা জানান, অধিকাংশ বাগানেই ছুটি না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই কাজে যাচ্ছেন নারী-পুরুষ চা শ্রমিকরা। এতে যে কোনো সময় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে তাদের মাঝে।

চা শ্রমিক ইউনিয়ন, সিলেট ভ্যালির সভাপতি রাজু গোয়ালা বলেন, দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলেও চা বাগানে সবেতন ছুটি দেয়া হচ্ছে না। এখন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন চা বাগানের শ্রমিকরা। বাগানগুলোতে নেই পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা। এর মধ্যে করোনা সংক্রমিত হলে বাগানগুলোতে মহামারি দেখা দেবে। করোনা সংক্রমিত হওয়ার ভয়ের পাশাপাশি দানা বেঁধে উঠছে ক্ষোভ।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রাম ভরণ কৈরী বলেন, পুরো দেশের মানুষ সামাজিক দূরত্ব মেনে চলছেন। এমন বাস্তবতায় কর্মরত চা শ্রমিকরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। যেহেতু এই সময়ে চা পাতা উত্তোলন করা হচ্ছে না, তাই চা বাগান বন্ধ রাখলে খুব ক্ষতি হবে না। চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাগানগুলো বন্ধ রাখলে আমাদের জন্য ভালো হতো। তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় ৫ হাজার কোটি টাকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন, সেখান থেকে মাত্র ২৫ কোটি টাকায় চা শ্রমিক ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চা বাগানগুলো খোলা রাখার যে ঘোষণা দিয়েছেন চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য তা পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন তিনি।

চা বাগান মালিকপক্ষের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট ব্রাঞ্চ চেয়ারম্যান ও ফিনলে টি কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার গোলাম মোহাম্মদ শিবলি বলেন, সরকার ঘোষিত নির্দেশনায় যা বলা হয়েছে, সেই মোতাবেক আমরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চা বাগানের কার্যক্রম পরিচালনা করছি। তিনি বলেন, আমরা চা বাগানের ভেতরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক জোরদার করেছি। বাইরে থেকে কাউকে বাগানের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছি না। বাগান থেকেও বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা আরোপ করা হয়েছে, যাতে খুব প্রয়োজন না হলে কেউ বাগানের বাইরে না যান।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে চা বাগানে চা উত্তোলন শুরু হয়নি। এখন বাগানে চলছে চা গাছে পানি সরবরাহ করা। বাগান বন্ধ হলে পানির অভাবে রুগ্ণ চা গাছগুলো মরে যাবে। এ ছাড়া চা বাগানের কর্মক্ষেত্রটা ভিন্ন। শ্রমিকরা বাগানে কাজে গেলে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কম। কারণ তখন তারা বাগানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকেন। এছাড়া শ্রমিকদের কাজ না থাকলে তারা সবাই একত্রিত হয়ে থাকবেন। এতে তাদের

স্বাস্থ্যঝুঁকিরও সম্ভাবনা রয়েছে।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরিন বলেন, চা বাগানে রয়েছে জেলার সাত লাখ অধিবাসী। চা যেহেতু একটি শিল্প অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার সঙ্গে সঙ্গে তা সরকার ঘোষিত নির্দেশনা মোতাবেক খোলা রাখার সিদ্বান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বলেছেন চা বাগান যেহেতু একটি প্রাকৃতিক পরিবেশে কাজ করে চা বাগান তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চা বাগানে অবাধে চলাফেরা সীমিত করে দেয়ার পাশাপাশি বাগানে পাট্টা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। চা শ্রমিকরা যাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করতে পারেন সে ব্যাপারে বাগান মালিকদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যাতে হাজিরার জন্য জমায়েত না করে এবং তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj