শুভ জন্মদিন ‘ছোটদের বন্ধু’

বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২০

খালেদুর রহমান জুয়েল

বাংলা ভাষায় লিখতে-পড়তে পারে আর লুৎফর রহমান রিটনের নাম শোনেনি, এমনটা ব্যতিক্রম। অথচ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমকে অতিক্রম করে এগিয়ে গেছেন তিনি। প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময়ই তার লেখা ছড়া আর আঁকা ছবি ছাপা হয়েছে দেশের শীর্ষ দৈনিক পত্রিকাগুলোতে। আর এখন তার লেখা ছড়া পাঠ্যবইতে। ‘ফেব্রুয়ারির গান’ শীর্ষক ছড়ার মাধ্যমে পঞ্চম শ্রেণির বর্তমান বাংলা পাঠ্যবইয়ের ৩১ থেকে ৩৩ পৃষ্ঠাজুড়ে আছেন তিনি। বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যজুড়ে থাকবেন তিনি আজীবন। ছড়াকার বললেই সুকুমার রায়ের পরে লুৎফর রহমান রিটনের নামটাই প্রথমে মাথায় আসে সবার। তিনি ছড়াস¤্রাট। কবি বেলাল চৌধুরী বলেছেন, ‘ছড়া লিখেও যে তারকাখ্যাতি অর্জন করা যায় রিটন তার একমাত্র দৃষ্টান্ত।’ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ভাষায়, ‘লুৎফর রহমান রিটন সাতচল্লিশোত্তর বাংলাদেশের শিশু কবিতার ধারার সবচেয়ে সফল কবি এবং বাংলাভাষার শিশুসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কবিদের একজন।’

‘কেউ কেউ ধরাকে সরা জ্ঞান করে, আর আমি ধরাকে ছড়া জ্ঞান করি।’ লুৎফর রহমান রিটন নিজের পরিচয় এভাবেই দিতে পছন্দ করেন। বাংলা ভাষাভাষিদের হৃদয় জয় করেছেন তিনি ছড়া লিখে। ছড়াকে পৌঁছে দিয়েছেন সর্বত্র, ভিন্নমাত্রায়। বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে আন্দোলন সব ক্ষেত্রেই তিনি ছড়াকে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করেছেন, জনপ্রিয় ধারা হিসেবে ছড়াকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার লেখা ছড়ায় ছন্দে বলা ‘ঝাঁকে ঝাঁকে জাটকা, কারেন্ট জালে আটকা’ বিজ্ঞাপন যেমন জনপ্রিয়তা পেয়েছিল তেমনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ‘জনতার মঞ্চ’-এর জন্য লেখা তার প্রতিটি ছড়াও দিয়েছিল আন্দোলনের প্রেরণা।

ছড়াকারদের প্রেরণা ছিলেন তিনি ছোটবেলা থেকেই। স্কুল জীবনে ছড়া লেখার পাশাপাশি প্রতিবছর নিয়মিত ছড়াসংকলন প্রকাশ করেছেন। স্কুল পড়–য়া রিটনের সম্পাদনায় সেই ছড়াসংকলনগুলোতে দেশের সব অঞ্চলের স্বনামধন্য ছড়াকারদের উপস্থিতি ছিল প্রাণবন্ত। ছড়ায় ছন্দে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট লেখাসহ ছড়ায় ছন্দে শিশুতোষ অনেক নাটকও লিখেছেন। এভাবেই একসময় বাংলাদেশে ছড়া আর লুৎফর রহমান রিটন প্রায় সমার্থক শব্দ হয়ে ওঠে।

লুৎফর রহমান রিটন গদ্য, পদ্য দুটোতেই সমান দক্ষ। দুটোই সমানভাবে এখনো লিখে যাচ্ছেন। তার লেখা ঝরঝরে গদ্যে সাধারণ বিষয়ও অসাধারণ হয়ে ওঠে। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী, রম্য, স্মৃতিচারণ, সাক্ষাৎকার- তার লেখা সব গদ্য অনবদ্য। ঋদ্ধ তিনি অন্য পরিচয়েও। টেলিভিশনের উপস্থাপক কিংবা অনুষ্ঠান পরিকল্পনায় তিনি যতটা সফল ততটাই সফল পত্রিকার সম্পাদক, নাট্যকার এবং গীতিকার হিসেবেও। তার সম্পাদিত ‘আসন্ন’ এবং ‘ছোটদের কাগজ’ বাংলাদেশের শিশু-কিশোর সাহিত্যে মাইলফলক হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং শিশুদের বিষয়ে তিনি সবসময় আপসহীন। তার লেখা এবং কর্মকাণ্ডেই এর প্রমাণ মেলে। বালক রিটনের সৌভাগ্য হয়েছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্য পাওয়ার, ছুঁয়ে দেখার, হাসি-গল্পে সময় কাটানোর। বঙ্গবন্ধুর ¯েœহধন্য ছিলেন রিটন। ছোট্ট রিটন তখন কচিকাঁচার মেলার সদস্য। ১৯৭২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রিটনের আঁকা মুক্তিযুদ্ধের ছবি দেখে মুগ্ধতায় প্রথম আদর করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তারপর ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কচিকাঁচার মেলার অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে তার মাথায় ক্যাপ পরিয়ে দেয়ার জন্য সিলেক্ট করা হয়েছিল মেধাবী খুদে লুৎফর রহমান রিটনকেই। গণভবনে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে কচিকাঁচার মেলার বন্ধুদের স্যালুট গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ওই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর ঠিক পাশেই দাঁড়ানোর সৌভাগ্য হয়েছিল মার্চপাস্টের নেতৃত্ব দেয়া রিটনের। একাধিকবার পরশ পাথরের স্পর্শেই কি পুরান ঢাকার একজন রিটন হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের গর্ব লুৎফর রহমান রিটন?

রিটনের জীবন বর্ণাঢ্য হয়েছে অসংখ্য খ্যাতিমান ও বরেণ্য মানুষের সান্নিধ্য প্রাপ্তিতে। আজ রিটনের সান্নিধ্য আলোকিত করে, প্রাণবন্ত আর বর্ণিল করে তোলে চারপাশের মানুষদের। তিনি নিজে যেমন পরিচ্ছন্ন ও গঠনমূলক লেখালেখি করেছেন, পাশাপাশি লেখক হিসেবে তৈরি করেছেন অনেক অনেককে, যারা আজ বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে এক একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।

তাই মেন্টর হিসেবে লুৎফর রহমান রিটনকে এককথায় অতুলনীয় বলা যায়। তিনি অতুলনীয় মানুষ হিসেবেও। হাস্যোজ্জ্বল, বুদ্ধিদীপ্ত, মানবিক এই মানুষটি সবসময়ই স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন। নিজের মেধার ওপর শতভাগ নির্ভরশীল মুক্ত চিন্তার এই মানুষটি চিন্তা-চেতনায় অনন্য। ‘সেন্স অফ হিউমার’ যে একটা শিল্প হতে পারে তিনি তা প্রমাণ করে গেছেন, তার সান্নিধ্য পাওয়া প্রত্যেকেই এটা নির্ধিদ্বায় স্বীকার করবেন।

চির তরুণ, অতুলনীয় এই মানুষটার জীবনে ১ এপ্রিল গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন। আর এখন এই তারিখটা বাংলা সাহিত্যের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ১৯৬১ সালের ১ এপ্রিল জন্মেছিলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের অন্যতম প্রধান এই নায়ক ‘ছোটদের বন্ধু’ লুৎফর রহমান রিটন।

শুভ জন্মদিন প্রিয় লেখক, প্রিয় মেন্টর। শুভ কামনা নিরন্তর।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj