করোনা ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ এবং পরবর্তী রাজনীতি

শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২০


রাজনীতি নিয়ে দেশে এখন আর তেমন মাতামাতি নেই। মানুষ এখন যার যার জীবন বাঁচানোর সংগ্রামে নিয়োজিত। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেন, না শর্তহীন, খালেদা জিয়া হাসপাতাল থেকে গুলশানের ফিরোজায় দুই সপ্তাহের কোয়ারেন্টাইনে যাওয়ায় বিএনপির লাভ হলো, নাকি সরকারের- এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় এখন কারো আছে বলে মনে হয় না। তবে তার ছয় মাসের মুক্তির খবরে বিএনপি স্বস্তি পেয়েছে, এটা সবার জন্যই স্বস্তিদায়ক। খালেদা জিয়াকে একনজর দেখার জন্য বিএনপির যেসব নেতাকর্মী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন, তারা আবার প্রমাণ করেছেন, বিএনপি এখনো কার্যত একটি দায়িত্বহীন দল।

বিশ্ববাসী প্রায় তিন মাস ধরে মহাআতঙ্কের মধ্যে দিন যাপন করছেন। প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে পৃথিবীর এখন চরম নাজেহাল দশা। প্রতিদিনই এই ভয়ঙ্কর ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। করোনার কোনো প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তবে চেষ্টা চলছে। কত মানুষের জীবনের বিনিময়ে পৃথিবী করোনা মুক্ত হতে পারবে, তা কেউ বলতে পারে না। তবে পৃথিবী এখন অবরুদ্ধ। এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের যোগাযোগ বন্ধ। নিজ নিজ দেশের মানুষও ঘরবন্দি জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন। মানুষের সঙ্গে মানুষের সংস্পর্শের কারণে করোনার বিস্তার ঘটে বলেই মানুষকে এখন মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হচ্ছে। মানুষ ঘরে থাকছে কিন্তু প্রিয়জনের নিকটসান্নিধ্যে যাওয়া বারণ। একজন থেকে আরেকজনকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হচ্ছে। মানুষ বিশ্রাম চায়, অবসর চায়। কিন্তু এমন বাধ্যতামূলক বিশ্রাম বা অবসর কেউ চায় না। ঘরবন্দি জীবনে মানুষ অতীষ্ঠ, অস্থির।

এই অস্থির ও উদ্বেগের মধ্যেই এবার আমরা উদযাপন করলাম ৪৯তম স্বাধীনতা দিবস। এমন নীরবে, আড়ম্বরহীনতায় আর কখনো স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয়নি। এবার আমাদের স্বাধীনতা দিবস এসেছে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সব দেশই নভেল করোনা নামক এক ভয়ঙ্কর ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত। প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশও এ সংক্রমণ থেকে মুক্ত নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে আমরা এবারের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস ভিন্নভাবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তিনি বলছেন, ‘১৯৭১ সালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা শত্রুর মোকাবিলা করে জয়ী হয়েছি। করোনা ভাইরাস মোকাবিলাও একটা যুদ্ধ। আমরা সবার প্রচেষ্টায় এ যুদ্ধে জয়ী হব ইনশাআল্লাহ।’ এবার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কোনো সভা-সমাবেশ-জমায়েত-কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়নি। করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়ে আমরা আগামী বছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করব ব্যাপক উচ্ছ¡াস-আনন্দের মধ্য দিয়ে।

করোনা ভাইরাস পৃথিবীজুড়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। করোনার আঘাতে মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। যোগাযোগ বন্ধ। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ। কলকারখানা বন্ধ। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বেগ পেতে হবে। করোনা যেহেতু বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে সেহেতু এর ক্ষয়ক্ষতিও বিশেষ কোনো দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাংলাদেশও সংকট মুক্ত থাকবে না।

অনির্দিষ্টকাল ঘরবন্দি থাকলে ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়বে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে করোনা ভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সরকারের কিছু উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন। রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এ তহবিলের অর্থ দিয়ে কেবল শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা যাবে।

এটা ভালো উদ্যোগ। তবে মালিকরা যাতে এই তহবিলের অর্থ তাদের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, সেটা কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক জুন মাস পর্যন্ত কোনো গ্রাহককে ঋণখেলাপি না করার ঘোষণা দিয়েছে। একইভাবে আমদানি ব্যয় মেটানোর সময়সীমা ২ মাস থেকে বাড়িয়ে ৬ মাস করা হয়েছে। এনজিওগুলোর ঋণের কিস্তি পরিশোধ সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, করোনা ভাইরাসের কারণে অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছেন। নি¤œ আয়ের ব্যক্তিদের ‘ঘর ফেরা’ কর্মসূচির আওতায় নিজ নিজ গ্রামে সহায়তা প্রদান করা হবে। গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বিনামূল্যে ঘর, ৬ মাসের খাদ্য এবং নগদ অর্থ প্রদান করা হবে। ভাসানচরে এক লাখ মানুষের থাকার ও কর্মসংস্থান উপযোগী আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। বিনামূল্যে ভিজিডি, ভিজিএফ এবং ১০ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

প্রধানমন্ত্রীর এসব ঘোষণা একেবারে সাধারণ মানুষকে খুব উৎসাহিত করেছে বলে মনে হয়। গরিব মানুষ, নি¤œ আয়ের মানুষ, শ্রমজীবী মানুষের কাছে তাদের পাওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার হয়নি। এত কথা না বলে প্রধানমন্ত্রী যদি সরাসরি বলতেন যে, একজন মানুষও অনাহারে থাকবেন না তাহলে হয়তো বিষয়টি উৎসাহব্যঞ্জক হতো।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ কেন মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল? কারণ ওই ভাষণে কোনো বিষয়েই অস্পষ্টতা ছিল না। যেমন সব কিছু বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘২৮ তারিখ কর্মচারীরা বেতন নিয়ে আসবেন।’ মানুষ বুঝেছে, অসহযোগ আন্দোলন করলেও তার পেটে টান পড়বে না।

বঙ্গবন্ধু আরো বলেছিলেন, ‘আর এই সাত দিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইরা যোগদান করেছেন, প্রত্যেক শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছায়ে দেবেন।’

নিজের দলেরও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগের থেকে যদ্দূর পারি তাদের সাহায্য করতে চেষ্টা করবো। যারা পারেন আমার রিলিফ কমিটিতে সামান্য টাকা-পয়সা পৌঁছায়ে দেবেন।’

এখন তো আওয়ামী লীগের সক্ষমতা বড়েছে। আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা এখন সম্পদশালী। আওয়ামী লীগের নেতাদের এখন বাধ্য করা হোক অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে। নিম্ন আয়ের মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসতে বিত্তবানদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী আহ্বান জানিয়েছেন। তার নিজ দলের বিত্তবানদের দিয়ে শুরু হোক না এই সহায়তার কাজটি।

দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধেও এখন কঠোরতা দেখাতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। মনে রাখতে হবে, দেশের রাজনীতি এখন কোয়ারেন্টাইনে থাকলেও এটা অচিরেই মুক্ত হবে। করোনা-পরবর্তী রাজনীতি নানা বাস্তব কারণে উত্তেজনাপূর্ণ হতে পারে। দেশে অভাবী এবং ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়বে। যারা বিত্তের পাহাড় গড়েছেন তাদের প্রতি বিত্তহীনদের ঘৃণা বাড়বে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষ সোচ্চার হবে। তখন শুধু কথায় চিড়ে ভিজবে না। অনাচার-অনিয়ম অব্যাহত থাকলে গণবিক্ষোভ বাড়বে। বড় দুর্যোগ-দুর্বিপাকের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনও অনিবার্য হয়ে ওঠে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বাস্তবেই জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে শেখ হাসিনাই ভবিষ্যৎ নতুন রাজনীতির পুরোধা হতে পারেন। মানুষের সব প্রত্যাশা এখনো তাকে ঘিরেই।

লেখাটি শেষ করছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বই থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করে। বঙ্গবন্ধু লিখছেন : ‘নয়াচীন থেকে দুর্নীতি তুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে এই কারণে যে, রাষ্ট্রের কর্ণধাররা ঘুষ দুর্নীতি তুলে দিতে বদ্ধপরিকর। আমি নয়াচীনে একটা ঘটনা শুনেছিলাম যে মাও সে তুংয়ের একজন প্রধান বন্ধু এবং নয়াচীনের নেতা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছিল বলে তকে বিচার করে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। ইচ্ছা করলে মাও সে তুং তাকে রক্ষা করতে পারতেন। কিন্তু বিচার যাকে ফাঁসির হুকুম দিয়েছে তাকে রক্ষা করা অন্যায়।’

বিভুরঞ্জন সরকার : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj