প্রবাসীদের ‘করোনা ভিলেন’ বানানোর অসুস্থতা

শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২০


প্রবাসীদের অবাধ প্রবেশ ও বিচরণে দেশে করোনা দ্রুত ছড়েছে- এ নিয়ে দ্বিমত নেই। পাল্টা মত বা তথ্যও নেই। কিন্তু যত দোষ প্রবাসীদের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা নিয়ে রয়েছে নানা মত ও বিশ্লেষণ। দেশে ফেরা প্রবাসীদের অধিকাংশই এখনো কোয়ারেন্টাইনের বাইরে। শুরুতে বিষয়টি গায়ে না মেখে এখন তাদের কোয়ারেন্টাইনে আনার চেষ্টা সাফল্য পাচ্ছে না। প্রবাসীদের টার্গেট করার পাশাপাশি করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে সচেতনতা আনতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ব্যাপক তৎপরতা চলছে। এতে বিলম্বিত সুফলের পাশাপাশি গোলমালও পাকছে। প্রবাসীদের রীতিমতো দুশমনের জায়গায় নিয়ে ঠেকানো হচ্ছে। লাল পতাকা টানিয়ে প্রবাসীদের বাড়ি চিহ্নিত করা, পিটুনি দেয়া আপদের ওপর বিপদ ডেকে আনছে।

বরিশালে একজন গণপিটুনির শিকার হয়েছেন। প্রবাসী সন্দেহে তাকে পিটানো হয়েছে। আশীষ মণ্ডল নামের এই ব্যক্তি শরীয়তপুর থেকে উজিরপুরে বেড়াতে গিয়েছিলেন। কেবল প্রবাসী সন্দেহে কিছু লোক তাকে ধরে পিটিয়েছে। এটা কি যে কোনো বিপদ বা ব্যর্থতায় প্রতিপক্ষ খোঁজার রোগ? সেই তৎপরতায় প্রশাসন শামিল হয়ে পড়লে পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকতে পারে? প্রবাসীর বাড়িতে লাল পতাকা লটকে দেয়ার বুদ্ধিটাই এলো কার মাথা থেকে? কেরানীগঞ্জে ৫১ প্রবাসীর বাড়িতে লাল পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। প্রশাসন কি নিজে উদ্যোগী হয়ে এই প্রবাসীদের ব্র্যাকেটবন্দি করেছে? নাকি হুকুম নাজিল হয়েছিল? গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার একটি নির্দেশ ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তিনি একজন প্রবাসীর তার বাবার নামধাম-ঠিকানা উল্লেখ করে ওই এলাকায় লকডাউনের ঘোষণা দিয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মতো একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি একজন প্রবাসীর ‘করোনা ভাইরাসের লক্ষণ আছে’ ঘোষণা দিয়ে তার জন্য লকডাউনের ঘোষণা দেন কীভাবে?

কোথাও কোথাও পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রবাসী খোঁজে। গ্রামের অতি উৎসাহী কিছু লোক শত্রু ধরিয়ে দেয়ার মতো প্রবাসীদের বাড়ি দেখিয়ে দেয়। কোনো কোনো বাড়ির প্রবাসী দেশেই আসেনি। তারপরও পরিবারটিকে শাসানোর ঘটনা ঘটছে। এটা চরম সামাজিক অসুস্থতা ও বিরোধের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শুরু থেকেই ঠেকানোর চেষ্টা না করে মোটা দাগে দোষটা চাপছে দেশে ফেরত প্রবাসীদের ওপর। নষ্টের মূলে তাদের শনাক্ত করে বাদবাকিদের ছহি-শুদ্ধ থাকার এ চেষ্টা সাফল্য পেয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে করোনা মোকাবিলার চেয়েও প্রবাসীদের তুলাধুনা করাকে জরুরি এজেন্ডা করার উদ্দেশ্য-বিধেয় প্রশ্নবিদ্ধ। এই মহাদুর্যোগে প্রবাসীদের নিয়ে সস্তা সমালোচনা, কৌতুক, বিভ্রান্তিও কম নয়।

প্রবাসীদের তাড়া করার বিপরীতে নেতা-মন্ত্রীদের কর্মী-সমর্থক বাহিনী বেষ্টিত হয়ে প্রেস ব্রিফিং, পরামর্শ, দান-দখিনার সেশন চলছে। এতে ভাইরাস ছড়ায় না। বিদেশ থেকে ঘুরে এসে নেতা, আমলাসহ বিশিষ্টজনদের কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয় না। তারা দিব্যি ঘুরছেন। ফটোসেশনসহ জ্ঞান দিচ্ছেন। বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের কোয়ারেন্টাইনে থাকা এবং রাখার আহ্বান জানাচ্ছেন। চোরেও চোর দৌড়ানোর এ সার্কাস কষ্টপীড়িত মানুষের সঙ্গে এক ধরনের তামাশা। যে সচিব আমেরিকা থেকে ফিরেই অফিস করতে শুরু করেছেন, বালিতে ট্যুর শেষ করে চিকিৎসকদের যে দলটি একদিনও ঘরে না থেকে হাসপাতালে, ক্লিনিকে চলে গেছেন, যে ব্যবসায়ীটি, রাজনীতিক বিদেশ থেকে ফিরে একদিনও কোয়ারেন্টাইনে থাকেননি, বিজনেস ক্লাসে দেশে আসা এলিট প্রবাসীদের ব্যাপারে কিন্তু কথা হচ্ছে না। কথা বেশি হচ্ছে শ্রমিক-নিরীহ পর্যায়ের প্রবাসীদের নিয়ে। প্রবাসীদের ভিলেন বানানোর এই তৎপরতা প্রবাসীদের ঝুঁকিতে ফেলার পাশাপাশি দেশের জন্য কোনো বিপর্যয় ডেকে আনবে- ভাবলে ক‚লকিনারা পাওয়া যায় না। লক্ষণ বড় খারাপ।

প্রবাস থেকে আসা নাগরিকরা বেপরোয়া চলেছে। ফ্রি স্টাইলে ঘুরে পরিবেশ নষ্ট করেছে। এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু রাষ্ট্র বা সরকার আইন মানার ব্যাপারে কতটা যথাযোগ্য ভূমিকা রাখছে? প্রবাসীদের বিমানবন্দরে কি কোনো প্রকার কাউন্সিলিং করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল? এখনো কি গুরুত্ব দিয়ে দেশবাসীকে বলা হচ্ছে? তার চেয়ে বড় কথা প্রবাসীদেরও কিছু প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু বেগতিক অবস্থার তোড়ে তারা বলতেও পারছে না ইতালিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রবাসীদের কোয়ারেন্টাইনের নামে ফাঁকা মাঠে পানিটুকু পর্যন্ত না দিয়ে কেন সারারাত মশার খনিতে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল? তাদের সঙ্গে থাকা নারী শিশুদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করাও কি জরুরি ছিল?

গত বছর মাত্র ১০ মাসে যে প্রবাসীরা ১৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছে তাদের সঙ্গে এই আচরণ ও বৈরিতা তৈরি শুভ লক্ষণ নয়। প্রবাসীদের অধিকাংশই শ্রমিক। বিপদে পড়েই তারা এই সময়ে দেশে ফিরেছে। তারা কাউকে বিপদে ফেলতে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিষয়টা এমন সরল নয়। এই আদমদের করোনা আমদানিতে দোষী সাব্যস্ত করার ব্যস্ততার বিপরীতে কেউ তা উৎপাদনে ভূমিকা রেখে চলছি কিনা সেটাও ভাবনায় রাখার অবকাশ রাখে। তারা বিদেশে নিয়ম-নীতি, সভ্যতা মানলেন। দেশে ফিরে হয়ে গেলেন বেপরোয়া। শ্যালকা-শ্যালিকা নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে বেরিয়ে পড়ছেন। সেজেগুজে ঢাকার বাইরে ঘুরতে এমনকি পিকনিকেও চলে যাচ্ছেন। এ বাস্তবতায় করোনা আমদানিতে রেমিট্যান্স জোগানদাতা প্রবাসীদের দায় নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। তাদের নির্দোষ বানানোও অবান্তর। কিন্তু যত দোষ এই নন্দঘোষদের ওপর চাপানো কতটা ন্যায্য? এছাড়া সমস্যা এড়িয়ে দোষ খুঁজতে গেলে আমাদের নিজেদেরও দায়ী করে মূল দায়িত্বহীনদের পার পাইয়ে দেয়া যায়। তা প্রকারান্তরে করোনার বিস্তারে সহায়তা দেয়া। লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়ে করোনাকে বরণ করে নেয়া।

আদম এখন আর প্রবাসীদের কাছে গালমন্দ বা তিরস্কারের পর্যায়ে নেই। এটা তাদের ডাকনাম বা কল সাইনের মতো। তার ওপর নবাবজাদা থেকে শুরু মূর্খ, গাড়ল, ক্ষেতসহ তাচ্ছিল্যের নতুন নতুন বিশেষণ যোগ করাটা জরুরি হয়ে পড়ল? গালিগালাজ হজম করেও তারা প্রশ্ন তুলেছেন করোনা নিয়ে সরকারের প্রস্তুতি বিষয়ে। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয় চীনের অনেক পরে। ফলে সরকারের কাছে অন্তত মাস দুয়েক সময় ছিল এসব ব্যবস্থা নেয়ার। কিন্তু বারবার ‘করোনা মোকাবিলায় প্রস্তুত আছি’ বলেও সরকার প্রায় কিছুই করেনি। দেশের সেরা সরকারি হাসপাতালটিতে আলাদা রেখে চিকিৎসা করার জন্য নির্ধারিত জায়গায় দরজা-জানালাই লাগানো হয়নি এখনো। দেশের কোনো চিকিৎসাকর্মীর জন্য নেই নিরাপদ পোশাক।

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক-কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

২৫ বছর পূর্তি : বিশেষ আয়োজন'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj