১০ লাখ পিপিই গেল কই : সরকার ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা পরস্পরবিরোধী অবস্থানে

শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২০

সেবিকা দেবনাথ : করোনা ভাইরাসের প্রকোপ মোকাবিলায় দেশের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ১০ লাখ পারসোনাল প্রটেক্টিভ ইক্যুইপমেন্ট (পিপিই) প্রস্তুত রয়েছে। যদিও সরকার বলছেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের সবার পিপিই দরকার নেই। এদিকে কোভিড-১৯ প্রতিরোধে যখন স্বাস্থ্যকর্মীরা পিপিই পাচ্ছেন না তখন গতকাল বৃহস্পতিবার সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার প্রশাসনিক কর্মকতাদের পিপিই পড়া একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেক এলাকায় নৈশপ্রহরীকেও দেখা গেছে পিপিই পড়ে দায়িত্ব পালন করতে।

প্রশ্ন উঠেছে, পিপিই যদি থেকেই থাকে, তবে তা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা কেন পাচ্ছেন না? কেন পিপিইর দাবিতে তারা কর্মবিরতিতে যাচ্ছেন? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জীবনের নিরাপত্তায় পিপিই অত্যন্ত জরুরি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা বাংলাদেশে লাখ লাখ পিপিই পাঠাচ্ছে। কিন্তু এগুলো যাদের প্রয়োজন তাদের কাছে আদৌ পৌঁছায়নি। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, সবার পিপিইর দরকার নেই। কিন্তু বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে চিকিৎসকসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীরই পিপিই দরকার। হাইকোর্ট থেকেও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্রুত পিপিই সরবরাহের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থার উপদেষ্টা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, যারা বলছেন সবার পিপিই দরকার নেই তারা অবান্তর কথা বলছেন। তারা পিপিই সম্পর্কে জানেন না। পল্লী চিকিৎসক থেকে শুরু করে সিএইচসিপি, হাসপাতালের ক্লিনার-সুইপার, আউটডোর ও বহির্বিভাগে যিনি রোগী দেখবেন, যিনি ওষুধ দেবেন, বিশেষজ্ঞ যে চিকিৎসক রোগী দেখবেন তাদের সবার পিপিই দরকার রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ স্বাস্থ্যসেবাদানকারীর প্রত্যেকের পিপিই দরকার। তিনি বলেন, এই পিপিই সেটের মধ্যে রয়েছে গøাভস, গাউন, মাস্ক, গগলস, সুকভার ইত্যাদি। তবে সবার এই সেটের সব উপকরণ দরকার হবে না। আউটডোরে যে চিকিৎসক রোগী দেখেন উনি যদি রোগীর গলা থেকে নমুন সংগ্রহ করতে যান এবং ওই সময় রোগী যদি হাঁচি-কাশি দেয় সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের সংক্রমণের ঝুঁকি আছে। এক্ষেত্রে সাধারণ মাস্ক হলে হবে না। বিশেষায়িত মাস্ক দরকার হবে। বাংলাদেশে পিপিই নতুন নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০০৫ সালে যখন বাংলাদেশ বার্ড ফ্লু ও নিপাহ ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করি তখনই পিপিই সম্পর্কে আমাদের ধারণা হয়েছে।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান ভোরের কাগজকে বলেন, সব স্বাস্থ্যকর্মীর পিপিইর দরকার নেই এখন আর সে কথা বলার সুযোগ নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রথমে যিনি রোগীকে রিসিভ করবেন তার থেকে শুরু করে সবার পিপিই দরকার। কারা কোন ধরনের পিপিই ব্যবহার করবেন সেটিরও ভাগ রয়েছে। পিপিই প্রটোকল অনুযায়ী তা নির্ধারণ করে দেয়া আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেন, পিপিই নিয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। কার পিপিই কোথায় গেছে তা বলা মুশকিল। এছাড়া পিপিই চাই, পিপিই চাই বললেও চিকিৎসকদের মধ্যে এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা আছে। তারা গা বাঁচিয়ে চলতে চাইছে।

এনজেন্ডার হেলথ বাংলাদেশের দেশীয় কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ডা. শেখ নাজমুল হুদা ভোরের কাগজকে বলেন, করোনা প্রতিরোধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবেন চিকিৎসাসেবায় জড়িতরাই। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাও চিকিৎসা সেবাকর্মীদের এই ঝুঁকি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এবং তারাও বলছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পিপিই না থাকার কারণে এমনটা হচ্ছে। বাংলাদেশেও কিছু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মী আইসোলেশন আছেন, আক্রান্তও হয়েছেন। এখনই যদি আমরা তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারি তাহলে এই সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আমরা কেউ জানি না।

এদিকে বিভিন্ন পোশাক কারখানায় তৈরি করা হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের সুরক্ষা পোশাক। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যালামনাই এসোসিয়েশন, মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, রোটারি ক্লাব ঢাকা নর্থ ওয়েস্ট ও পে ইট ফরোয়ার্ড/অনেস্ট এই চার প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে তৈরি করা হচ্ছে চার লাখ সুরক্ষা পোশাক। প্যাশন ব্র্যান্ড লা রিভ সুরক্ষা পোশাকসহ মাস্ক তৈরিতে তাদের নিজস্ব ফ্যাক্টরির পূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগ করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের অনুমতি নিয়ে চট্টগ্রামের তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান স্মার্ট জিন্স গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান স্মার্ট জ্যাকেট লিমিটেড এক লাখ পিস পিপিই বানাচ্ছে। প্রথম দফায় ৫০ হাজার পিপিইর চালান ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj