আমতলীতে পরিদর্শকের কক্ষে আসামির ঝুলন্ত মরদেহ : পরিদর্শকসহ বরখাস্ত ২

শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২০

সঞ্জিব দাস ও হারুন অর রশিদ, আমতলী (বরগুনা) থেকে : বরগুনার আমতলী থানায় একটি হত্যা মামলার সন্দেহভাজন আসামি শানু হাওলাদারের (৫০) মরদেহ পুলিশ পরিদর্শকের (তদন্ত) রুম থেকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলানো অবস্থায় পাওয়া গেছে। খবর পেয়ে বরগুনার পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শক (তদন্ত) ও ডিউটি অফিসারকে সাময়িক বরখাস্ত করে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বরগুনার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের পশ্চিম কলাগাছিয়া গ্রামের গরু ব্যবসায়ী ইব্রাহীম হত্যা মামলার সন্দেহভাজন আসামি একই ইউনিয়নের পশ্চিম গোজখালী গ্রামের মৃত হযরত আলীর ছেলে শাহিনুর রহমান শানু হাওলাদারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গত বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে পরিদর্শক (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রির নেতৃত্বে পুলিশ তার বাড়ি থেকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। রাতে পরিদর্শক (তদন্ত) রুমে জিজ্ঞাসাবাদ করে ওই রুমেই তাকে আটক রাখে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৬টার দিকে ডিউটিরত পুলিশ সদস্য কনস্টেবল মনির শানুর মরদেহ পরিদর্শকের (তদন্ত) অফিস কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে গলায় রশি দিয়ে ফাঁস লাগানো অবস্থায় ঝুলতে দেখে আমতলী থানার পরিদর্শক মো. আবুল বাশারকে জানান। তিনি তাৎক্ষণিক বিষয়টি বরগুনা জেলা পুলিশ সুপারকে জানান। ঘটনা শুনে পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন (পিপিএম) আমতলী থানায় এসে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরিদর্শক (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রি ও ডিউটি অফিসার এএসআই আরিফুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মো. তোফায়েল হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) মহরম আলী ও সহকারী পুলিশ সুপার (আমতলী সার্কেল) মো. রবিউল ইসলামকে সদস্য করে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ তদন্ত কমিটিকে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য বলা হয়েছে।

দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. শংকর প্রসাদ অধিকারী মরদেহের সুরতাহাল রিপোর্ট তৈরি করার পর পুলিশ মরদেহ বরগুনা মর্গে পাঠান।

অপরদিকে নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ২৩ মার্চ সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে আমতলী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রির নেতৃত্বে ৫ জন পুলিশ শাহিনুর রহমান শানু হাওলাদারকে বাড়ি থেকে ইব্রাহীম হত্যা মামলায় সন্দেহজনক আসামি হিসেবে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। এরপর গত ৩ দিন ধরে তাকে থানায় আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। এ হত্যা মামলায় পরিদর্শক (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রি শানুকে আসামি না করার জন্য পরিবারের কাছে তিন লাখ টাকা দাবি করেন। গত মঙ্গলবার সকালে শানুর ছেলে সাকিব থানায় এসে তার বাবাকে যেন শারীরিক নির্যাতন না করেন সে জন্য ১০ হাজার টাকা পরিদর্শক (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রিকে দিয়ে যান। গত বুধবার সকালে পরিবারের লোকজন শানু হাওলাদারের সঙ্গে দেখা করতে থানায় এলে পুলিশ তাদের দেখা করতে দেয়নি।

কান্নারত অবস্থায় শানু মিয়ার স্ত্রী ঝর্ণা বেগম বলেন, আমার নির্দোষ স্বামীকে ওসি মনোরঞ্জন মিস্ত্রি টাকার জন্য থানায় নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে তার রুমের ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখেন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ছেলে সাকিব বলেন, আমার বাবাকে যেন শারীরিক নির্যাতন না করে সে জন্য আমি ওসিকে (তদন্ত) ১০ হাজার টাকা দিয়েছি। তারপরও ওরা আমার বাবাকে নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে।

শানু হাওলাদারের শ্যালক রাকিব বলেন, আমি বুধবার দুপুরে ওসি মনোরঞ্জন মিস্ত্রির সঙ্গে দেখা করি। তখন আমার ভগ্নিপতিকে এ হত্যা মামলায় না জড়ানোর শর্তে তিনি আমার কাছে তিন লাখ টাকা দাবি করেন। এ টাকা না দেয়ায় আমার ভগ্নিপতিকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে।

নিহতের স্ত্রী-পুত্রসহ স্বজনরা ও পরিবারের লোকজন থানায় বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিলাপ করেন আর বলেন, আমতলী থানার ওসি আবুল বাশারের অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরে যাব না।

লাশের সুরতহাল রিপোর্টকারী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শংকর প্রসাদ অধিকারী বলেন, নিহত শাহিনুর রহমান শানু হাওলাদারের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে।

আমতলী থানার ওসি মো. আবুল বাশার বলেন, গত বুধবার রাতে তাকে ইব্রাহীম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ মামলায় তিনি জড়িত থাকার কথা স্বীকারও করেছেন। তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে আমাদের ধারণা। যদি শানু আত্মহত্যাই করে থাকে তাহলে আত্মহত্যায় ব্যবহৃত রশি কোথায় পেয়েছেন সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর তিনি দিতে পারেননি।

বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন (পিপিএম) বলেন, আমি সংবাদ পেয়ে ঘটনা শুনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। তাৎক্ষণিক আমতলী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ও ডিউটি অফিসারকে সাময়িক বরখাস্ত করেছি। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মো. তোফায়েল হোসেনকে প্রধান এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) ও সহকারী পুলিশ সুপারকে (আমতলী সার্কেল) সদস্য করে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এই তদন্ত কমিটিকে প্রতিবেদন প্রদান করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj