দখল দূষণে অস্তিত্ব সংকটে চলনবিলের নদনদী

শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২০

গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি : চলনবিলের বুক চিরে প্রবাহিত ছোট-বড় মিলিয়ে ১৬টি নদী। এক সময় নদীগুলো ছিল চির যৌবনা। সেখানে শিশু, কিশোর-কিশোরী, যুবকসহ নানা বয়সের লোকরা খুনসুটিতে মেতে থাকত সারাক্ষণ। সঙ্গে যোগ হতো মাছ ধরা, সাঁতার কাটা, লগো খেলা, পলো বাইশাল, নৌকাবাইচ, পাল তোলা নৌকার বাহারি সব দৃশ্য আরো কত কী। এখন এসব শুধুই অতীতের গল্প। দখল দূষণে মরে যাচ্ছে নদীগুলো। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সচেতন নাগরিক সমাজ কেউ শুনতে পায় না এদের বোবা কান্না।

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানীসহ ১৬ নদনদীর পানি শুকিয়ে নৌচলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুমে পানি দেখা গেলেও বর্ষা শেষে তার কিছুই থাকে না। দখল, দূষণ আর ভরাটের কারণে নদীগুলো সংকুচিত হয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

ফলে কৃষি জমিতে সেচের কাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মৎস্যসম্পদ হুমকির মুখে পড়ছে। নদীকেন্দ্রিক কর্মজীবী মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে।

এছাড়া বাণিজ্যিক নগরী চাঁচকৈড় হাট নদীর ত্রিমোনায় অবস্থিত। নদীপথে স্বল্প খরচে মালামাল আসত এই হাটে। অথচ এখন বিকল্প পথে এসব পণ্য আনতে খরচ হচ্ছে তিন থেকে চার গুণেরও বেশি। এ কারণে স্থবিরতা নেমেছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও।

এক সময় নদী আর নৌকাকে ঘিরে চলনবিলের গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড়, নাজিরপুর, সিংড়ার, বড়াইগ্রামের আহম্মেদপুর, তাড়াশের ধামাইচ, নাদোসৈয়দপুর, চাটমোহরের ছাইকোলা, অষ্টমিনষা, মির্জাপুর ও ভাঙ্গুড়ায় গড়ে উঠেছিল বড় বড় বাজার। চলত রমরমা বাণিজ্য। ২৯ বছর আগেও চলনবিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এসব নদনদীতে বছরজুড়েই ৮ থেকে ১০ ফুট পানি থাকত। কিন্তু বছরের পর বছর পলি জমে নাটোরে সুগার মিলের গাদ, পলিথিন আর ময়লা-আর্বজনায় নদীগুলো ভরাট হয়ে গেছে। এখন নন্দকুঁজা ও আত্রাই নদী সৌন্দর্য, জলুস ও স্বকীয়তা হারিয়ে খালে পরিণত হয়েছে।

চাঁচকৈড় মোকামের ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম, চাল, সার ও ডিজেল ব্যবসায়ী ধিরেন্দ্র নাথসহ কয়েকজন জানান, তারা এক সময় নৌকায় শত শত মণ কৃষিজাত পণ্য দেশের বিভিন্ন মোকামে নিয়ে যেতেন। আবার সেসব মোকাম থেকে নানা পণ্য এখানে এনে পাইকারি দামে বিক্রি করতেন। কম খরচে পরিবহন সুবিধা ভোগ করলেও এখন আর ওই সুবিধা তারা পান না। এখন বছরের ৩-৪ মাস (বর্ষাকালে) কোনো রকমে তারা নৌকায় পণ্য আনা-নেয়া করে থাকেন। ফলে আগের মতো আর ব্যবসা হয় না।

চলনবিল ও নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আতাহার হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক এস এম মজিবর রহমান মজনু বলেন, চলনবিলের প্রাণ হলো নদনদী ও খালবিল। নদনদীগুলো সঠিকভাবে খনন করা এখন সময়ের দাবি। অথচ নদীগুলো খননের পরিবর্তে দূষণ এবং দখলের প্রতিযোগিতা হচ্ছে। বারবার বলার পরও মিলছে না কোনো প্রতিকার।

জাতীয় নদীরক্ষা কমিটি গুরুদাসপুর উপজেলা শাখার সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তমাল হোসেন বলেন, চলনবিলকে বাঁচাতে এলাকার নদীনালা ও খালগুলোকে প্রথমে দখলমুক্ত করতে হবে। তাই গুরুদাসপুর উপজেলায় নদী দখলদার ১২৮ জনের তালিকা করে তা উচ্ছেদের জন্য নোটিস দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর জন্য একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চাওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসনের কাছে। অচিরেই উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথাছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে।

জতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রকল্প পরিচালক (যুগ্ম সচিব) ইকরামুল হক জানান, সারাদেশের নদনদী দখলমুক্ত করে অবারিত জলধারা ফেরাতে কাজ করছে নদী কমিশন। চলনবিলের নদীগুলো পর্যায়ক্রমে পুনঃখনন করা হবে।

সারাদেশ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj