সর্বাত্মক দায়িত্ব পালনে আমরা কতটা অগ্রসর?

শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২০


বোমা ফাটানোর মতো করে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের আবির্ভাব, প্রথম চীনে, এরপর সংক্রমণের বিস্তার বিশে^র দেশে দেশে, কোথাও ব্যাপক হারে, কোথাও সীমিত আকারে। বাংলাদেশে মৃতের সংখ্যা ৫ জন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে তিন-চারজন করে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, অধিকাংশ তথ্যে সংখ্যাটি ৪৪। দৈনিক পত্রিকাগুলোতে অন্য খবর, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ খবরও মৌন হয়ে পড়েছে। লেখা হচ্ছে বিস্তর নিবন্ধ, প্রতিবেদন, উপসম্পাদকীয় বিষয় প্রায় একই। করোনা প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেয়া উচিত, ব্যক্তিগতভাবে, সমন্বিতভাবে। সংক্রমণের উৎস যেহেতু ব্যক্তি, সমস্যা তাই গভীর।

অধিকাংশ লেখা তথ্যবহুল, রয়েছে করণীয় সম্পর্কে স্বাস্থ্যসম্মত পরামর্শ। ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরী থেকে অধ্যাপক জাফর ইকবালসহ বেশ কয়েকজনের লেখায় দেশের মানুষ আতঙ্ক হ্রাসের দিকনির্দেশনা পাবেন। পরিস্থিতি বিচারে ওই একই বিষয় নিয়ে লেখা ছাড়া নতুন বিষয় পাওয়া মুশকিল। কিংবা বিষয় থাকলেও তা কতটা পাঠক গ্রাহ্য হবে বলা কঠিন। তাই কানুবিনে গীত নেই।

এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেয়াও অর্থহীন। তারা এতদিনে অবস্থা দৃষ্টে কিছুটা তৎপর হয়ে উঠেছেন বিভিন্ন নিরিখে। যেমন করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণ কিট নিয়ে, তেমনি সন্দেহভাজনদের বিচ্ছিন্নকরণ তথা কোয়ারেন্টাইন নিয়ে, যেমন গৃহবন্দি করে, তেমনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। কিন্তু আমার স্বভাব হলো নিয়ম, না মানা।

তবে একটি দিকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়- সাধারণত দুর্যোগে-দুর্ভোগ সমাজের কিছু সংখ্যক সুবিধাবাদী, মতলববাজ মানুষ স্বার্থপরতা ও মুনাফাবাজিতে তৎপর হয়ে ওঠে। তাৎক্ষণিক প্রমাণ- মাস্ক বিক্রি অবিশ^াস্য চড়া দামে। অবশ্য এর জন্য আমাদের কিছু স্বভাববৈশিষ্ট্যও কম দায়ী নয়, যা মুনাফাবাজদের সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দেয়। হুজুগে মেতে ওঠা আমাদের বরাবরের স্বভাব।

এরই প্রকাশ বৃহত্তর পরিসীমায় এ বৃহৎ বাজারে, নিত্যপণ্যে, ভোগ্যপণ্যে তেমনি অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্যের বিকিকিনিতে। করোনা ভাইরাস বাংলাদেশি বাজারে পরোক্ষ হামলা চালালে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমার সহকারীর এক প্রতিবেশী দেড়শ কেজি চাল কিনে ফেলেছেন ভবিষ্যৎ ভাবনায়। এমন আরো অনেকে। ইতোমধ্যে চালের দামও বাড়াতে শুরু করেছে চাল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। তাই দরকার বাজারের ওপর সরকারের কড়া নিয়ন্ত্রণ। এক কথায় সরকার সতর্ক হোক- মুনাফাবাজরা তক্কে তক্কে আছে।

এগুলো বাড়তি চ্যালেঞ্জ সরকারের জন্য। তবু জনস্বার্থ বিবেচনায় এসব সমস্যা কঠোর হাতে মোকাবিলা করতে হবে। কোনো খাতেই সুবিধাবাদীদের প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। সমষ্টিগত খাত ছাড়াও বড় সমস্যা ব্যক্তিক আচরণ, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। মানবিক চেতনা, সহমর্মিতা যদি ক্রমাগত মার খেতে থাকে তাহলে তা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। আমরা এখন তেমন অবস্থায়। অথচ একাত্তরের দুর্যোগে কি ঐক্য আমাদের!

দুই.

দৈনিক পত্রিকায় একটি খবর পড়ে মর্মাহত হয়েছি। শিরোনাম : ‘জ্বর-কাশির রোগীদের স্পর্শ করছেন না ডাক্তার’ (যুগান্তর : ২০.০৩.২০২০)। এ পরিপ্রেক্ষিতে আরো বলা হয়েছে ছোট্ট হরফের শিরোনাম : ‘বেসরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে বলে শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।’

প্রতিবেদনের শিরোনাম ও তার প্রথম অংশটুকু পড়েই মন খারাপ হয়ে যায়। যাদের জীবিকার শপথ নিজের জীবন তুচ্ছ করে মানুষের সেবা- রোগীদের সেবা, তাদের মধ্যে যদি বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার অভাব ঘটে, সুবিবেচনার অভাব ঘটে, তবে তা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক, সমাজ ও জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। সর্দি-জ্বর-কাশি মানেই করোনা সংক্রমণ, এমন চিন্তা ও সিদ্ধান্ত এবং সেই সুবাদে সংশ্লিষ্ট রোগীদের না দেখা অবিবেচনার কাজ।

তাদের বিদ্যা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দিয়ে তারা কিছুটা হলেও বুঝতে পারেন সমস্যার স্বরূপ। সন্দেহজনক মনে হলে সেই রোগীকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ শনাক্ত করে নিশ্চিত হওয়া সহজ যে, তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কিনা। ইতোমধ্যে প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিয়ে তার বা তাদের চিকিৎসা কারাই তো চিকিৎসক মাত্রেরই পেশাগত দায়িত্ব-আদর্শগত কর্তব্য। তা না হলে বহু সাধারণ রোগী চিকিৎসকের অমানবিক অবহেলায় নাজমা আমিনের মতো মৃত্যুর শিকার হতে পারেন।

এটা চিকিৎসকের পেশাগত আদর্শের বিপরীত কাজ। ওই প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে : ‘দেশের বেশিরভাগ সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা করোনা ভাইরাসের কারণে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ঠাণ্ডা-সর্দি, জ্বর-কাশির কোনো রোগীকে তারা স্পর্শ করছেন না। (করোনা) সংক্রমিত নয়, কিন্তু জ্বর যদি কাশিতে ভুগছেন এমন সমস্যার রোগীকেও তারা চিকিৎসা দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন।’

বিবরণটি দীর্ঘ, চিকিৎসকের অদ্ভুত আচরণ সম্পর্কে। বিশদ সে বিবরণ উল্লেখ না করে আমরা বলতে চাই, করোনা আতঙ্কে কি আমাদের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিচার-বুদ্ধি ও বিবেচনা লোপ পেয়ে গেছে? তারা বিশে^র করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত দেশের চিকিৎসকদের ভূমিকা লক্ষ করছেন না, ভুলে গেছেন তাদের পেশাগত নীতি ও আদর্শের কথা?

অন্যদিকে আমাদের প্রশ্ন, বাংলাদেশের চিকিৎসা অধিদপ্তর এসব বিষয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করছে কি? তারা করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে চিকিৎসকদের ভূমিকা সম্পর্কে চিকিৎসকদের নিয়ে এ পর্যন্ত কোনো প্রশিক্ষণ শিবির বা কর্মশালার আয়োজন করেছেন কি? কিংবা চিকিৎসকদের প্রতিরোধকর্মে উদ্দীপ্ত করার জন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন?

করা হলে প্রতিবেদনে প্রকাশিত এ জাতীয় ঘটনার খবর প্রকাশিত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তা হয়েছে। হয়নি, এমন ঘটনাও অনুমানসাপেক্ষ। এ ব্যাপারে চিকিৎসক ও সেবিকা উভয় শ্রেণিই একই রকম মানসিকতায় ভুগছেন, একাধিক ঘটনায় তা প্রকাশ পাচ্ছে। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

তিন.

শুরুতে ভিন্ন ধরনের ঢিলেঢালা মানসিকতা ছিল স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এখন যখন সংবাদমাধ্যমে এমন তথ্য পরিবেশিত হচ্ছে যে করোনা ভাইরাস সংক্রমণে আক্রান্তের সংখ্যা এবং মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে, তখন বাস্তব অবস্থার পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে করোনা ভাইরাস আক্রমণ প্রতিরোধে আমাদের ব্যবস্থাদি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। প্রশ্ন উঠতে পারে- কেন?

অর্থাৎ শুরুতেই আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগে সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা ও বিচক্ষণতার অভাব ছিল। যেজন্য সূচনালগ্নেই আগাম ব্যবস্থা গ্রহণে তৎপর হওয়া দরকার ছিল। তাই সংবাদপত্রে এমন খবরের শিরোনাম প্রকাশ পাচ্ছে- ‘নিরাপত্তা সামগ্রী নেই, চিকিৎসকদের উদ্বেগ’।

এ প্রতিবেদনটিতে গুরুত্বের সঙ্গে আরো বলা হয়েছে : ‘৫৫টি জেলার বেশিরভাগ হাসপাতালে সর্দি-কাশি-জ্বরের চিকিৎসা দেয়া প্রায় বন্ধ। চিকিৎসক-নার্সদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম এখনো পৌঁছায়নি। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সামগ্রীর অভাবে হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ চরমে পৌঁছেছে।’

স্বভাবতই আমাদের প্রশ্ন : করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে বিশে^ যেখানে দেশমাত্রই সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করে চলেছে, সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কম হওয়ার কারণেই কিনা জানি না, অনুরূপ সর্বাত্মক প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে এবং তা প্রতিরোধ সংক্রান্ত সর্বাধিক বিষয়ে। এ কর্মকাণ্ড ও ব্যবস্থাপনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব স্বাস্থ্য বিভাগের। তারাই তো যথাযথ উদ্যোগ নিয়ে, সংশ্লিষ্ট সব মহলকে নিয়ে সর্বাত্মক প্রতিরোধ ব্যবস্থা সংহত করার আয়োজন করবেন, এটা তাদেরই দায়িত্ব। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তাতে ঘাটতি রয়েছে। এখনো সময় আছে স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব সর্বশক্তি নিয়ে করোনা সংক্রমবোধের প্রতিটি দিকে সর্বোত্তম ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তা সর্বমহলের সাহায্য নিয়ে। অন্য দেশের মতো এটাকে জাতীয় সংকট হিসেবে বিবেচনা করে সে অনুযায়ী সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যিক কর্তব্য। দেরি নয়, অবিলম্বে রাজধানী থেকে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত হাসপাতালগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সামগ্রী সরবরাহের দিকে নজরদারি জরুরি।

আহমদ রফিক : লেখক, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
লিটন মহন্ত

কোথায় যাব আমরা

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার আদ্যোপান্ত

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

করোনার কাল

জুবায়ের আহমেদ

গুজবে আমরা পিছিয়ে পড়ছি

মোস্তাক আহমেদ

একটু থামুন

মীর আব্দুল আলীম

ডাক্তার-নার্স সুরক্ষা

হাসানুর রহমান

গুজব থেকে সাবধান

মুহম্মদ সজীব প্রধান

বিশ্ব অর্থনীতিতে অশনি সংকেত

গাজী মহিবুর রহমান

অনুগ্রহ করে ঘরে থাকুন

আর কে চৌধুরী

আমরা যেন হেরে না যাই

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ফোর্স নয়, সেবকও নয়, বন্ধু চাই

নিতাই চন্দ্র রায়

এই যুদ্ধে জয়ী হতে হবে

Bhorerkagoj