করোনা শনাক্ত কিট পৌঁছেছে চট্টগ্রামে : প্রশাসনের সঙ্গে মাঠে আছে সেনাবাহিনীর ৪৩টি টিম

বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২০

চট্টগ্রাম অফিস : করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে অভিযানে নেমেছে সেনাবাহিনীর ১৭ টিম। তিন পার্বত্য জেলাসহ সেনাবাহিনীর মোট ৪৩টি টিম এখন চট্টগ্রামের মাঠে আছে। গতকাল বুধবার সকাল থেকে জেলা প্রশাসনের ৬ জন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর টিম নগরজুড়ে অভিযান শুরু করে। নগরীর খুলশী এলাকায় বিদেশি নাগরিকসহ পাঁচজনকে বাধ্যতামূলক হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া একটি কোরিয়ান রেস্টুরেন্ট সিলগালা করা হয়েছে। নগরীর দুটি আবাসিক ভবনকে লকডাউন করা হয়েছে।

এদিকে করোনা ভাইরাস শনাক্তের কিট চট্টগ্রামে পৌঁছেছে। গতকাল বুধবার দুপুরে ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল এন্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসে (বিআইটিআইডি) কিট পৌঁছানোর পর নমুনা সংগ্রহ শুরু হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক এম এ হাসান চৌধুরী বলেন, দুপুরের পর থেকে করোনা ভাইরাস সাসপেক্টদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাও শুরু হয়েছে। বিআইটিআইডি এখন করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত। করোনা ভাইরাসের সম্ভাব্য লক্ষণযুক্তরা বিআইটিআইডিতে গিয়ে পরীক্ষা করাতে পারবেন। আমাদের আইসোলেশন ওয়ার্ডও প্রস্তুত। ইতোমধ্যে একজন রোগী ভর্তি রয়েছেন।

সেনাবাহিনীর টিম মূলত করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে জনসমাগম ঠেকানো, বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা তদারকি করা এবং করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থা তদারক করার বিষয়ে কাজ করছেন। নগরীতে যারা হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন, সেনা সদস্যদের নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটরা তাদের এলাকায় যাচ্ছেন। মেজর অথবা ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার সেনা কর্মকর্তার নেতৃত্বে সকাল ৮টার আগেই সেনানিবাস থেকে সেনাবাহিনীর ১৭টি টিম চট্টগ্রাম নগরী ও উপজেলায় পৌঁছে যায়। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামেও আরো ২৬টি টিম পৌঁছে। সেনা সদস্যরা হ্যান্ডমাইকে লোকজনকে জটলা তৈরি না করার জন্য এবং পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চলাচলের অনুরোধ করছেন। এর ব্যক্তিক্রম হলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারিও দিচ্ছেন।

এদিকে নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা ও বাকলিয়ায় দুটি আবাসিক ভবন লকডাউন করা হয়েছে। চান্দগাঁওয়ে ছেলের বাসায় কক্সবাজারের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত নারী একদিন অবস্থান করেছিলেন। বাকলিয়ার বাসাটি ওই নারীর আরেক ছেলের। গত ২৪ মার্চ রাতে নগরীর নিউ চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার ৭ নম্বর সড়কের ৬৪ নম্বর ভবন এবং বাকলিয়া থানার সৈয়দ শাহ রোডের একটি ভবন লকডাউন করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মঙ্গলবার কক্সবাজারে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত এক রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

তাকে কক্সবাজারে আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ওই নারী গত ১৩ মার্চ ওমরা শেষে সৌদি আরব থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে চট্টগ্রামে আসেন। সঙ্গে তার ছেলেও ছিলেন। তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। আক্রান্ত ওই নারী নিউ চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় ওই ভবনে ছেলের বাসায় একদিন ছিলেন। সেখান থেকে কক্সবাজারে নিজের বাড়িতে যাওয়ার পর সেখানে করোনা শনাক্ত হয়। বিষয়টি জানার পর ভবনটি লকডাউন করা হয়েছে। ওই বাসার দোতলায় আক্রান্ত নারীর ছেলে একা থাকেন। পাঁচতলা ভবনটিতে আরও অন্তত আটটি বাসায় বাসিন্দারা আছেন। এছাড়া বাকলিয়া থানার সৈয়দ শাহ রোডে ওই নারীর অপর এক ছেলের বাসাও লকডাউন করা হয়েছে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ওই নারী বাকলিয়ার বাসায় আসেননি। তবে ছেলের স্ত্রী বাকলিয়ার বাসা থেকে শাশুড়ির সঙ্গে দেখা করতে চান্দগাঁওয়ের বাসায় গিয়েছিলেন। বাসাটি তালাবদ্ধ করা হয়েছে। ভবনের বাসিন্দাদের বাসা থেকে বের না হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে নগরীতে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা বিদেশির আসা-যাওয়ার কারণে চট্টগ্রামে একটি রেস্তোরাঁকে সিলগালা করে ২ বিদেশি, রেস্তোরাঁর মালিক-কর্মচারীসহ পাঁচজনকে বাধ্যতামূলক হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল বুধবার সকালে খুলশী ২ নম্বর সড়কের একটি কোরিয়ান রেস্টুরেন্টে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম এই অভিযান চালান। তিনি বলেন, নগরীর খুলশীর ২ নম্বর সড়কে ১২/২ নম্বর ভবনে রেস্টুরেন্টটি কোরিয়ান নাগরিকের মালিকানাধীন। ওই রেস্টুরেন্টে হোম কোয়ারেন্টাইন না মানা এক দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকের নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল। মঙ্গলবার ওই রেস্টুরেন্ট বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তবে বুধবার সকালে গিয়ে সেটি খোলা দেখা যায়। তাই ওই রেস্তোরাঁর মালিক-ম্যানেজার, মা ও ছেলে এবং তিন বাংলাদেশি কর্মচারীকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দেয়া ছাড়াও রেস্টুরেন্টটি সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামে বিদেশফেরত আটজনের হোম কোয়ারেন্টাইন শেষ হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বী মিয়া বলেন, বর্তমানে বিদেশফেরত মোট ৯৬৫ জন হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন। তাদের ওপর নজরদারি রয়েছে।

এদিকে নগরীতে জীবাণুনাশক ছিটানো অব্যাহত রেখেছে নগর পুলিশ। জলকামানের মাধ্যমে সড়কে ব্লিচিং পাউডারসহ জীবাণুনাশক পানি ছিটিয়ে নগরীকে পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত করার এই উদ্যোগে স্বস্তি মিলেছে নগরবাসীর মধ্যে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার মো. মাহাবুবুর রহমান বলেন, সেবার মানসিকতা থেকেই আমরা নগরীকে জীবাণুমুক্ত করার কাজে নেমেছি। তিনি বলেন, আমরা সবার সম্মিলিত প্রয়াসে করোনা ভাইরাসকে মোকাবিলা করব। তিনি আরো বলেন, নগরবাসীর প্রতি আহ্বান, আপনারা আতঙ্কিত হবেন না। সচেতন থাকুন। আর হোম কোয়ারেন্টাইনে যারা আছেন তাদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার অনুরোধ করছি। ঘর ছেড়ে বাইরে আসবেন না। একইসঙ্গে নগরীর ১৬টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানেও নিজ নিজ এলাকায় জীবাণুনাশক ছিটানোসহ পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম কাজ চলছে।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj