বন্ধ হচ্ছে না তৈরি পোশাক কারখানা

বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২০

মরিয়ম সেঁজুতি : নোভেল করোনা ভাইরাসের প্রভাবে পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো একের পর এক লকডাউন ঘোষণা করছে। বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করছে পোশাকের ব্র্যান্ডগুলো। এ পরিস্থিতিতে ভোক্তা চাহিদায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। কিন্তু বাজার চাহিদার এ পরিস্থিতিতে নতুন ক্রয়াদেশ দিচ্ছে না ক্রেতারা। এরই মধ্যে দেয়া ক্রয়াদেশগুলোর পরিমাণ কমাচ্ছে। চলমান ক্রয়াদেশগুলোর উৎপাদন থেকে বিরত থাকতে বলছে ক্রেতারা। আবার কর্মক্ষেত্রে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঝুঁকিতেও আছেন শ্রমিকরা।

এদিকে করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) প্রাদুর্ভাবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্যই কেবল এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রীর এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এমন উদ্যোগে শ্রমিক মজুরি পরিশোধ নিয়ে গার্মেন্টস মালিকরা কিছুটা ভারমুক্ত হলো, প্রতি মাসে শ্রমিকের মজুরি বাবদ চার হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয় রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা মালিকদের। বিজিএমইএ তথ্যমতে, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ৯৩৬ কারখানায় প্রায় ২ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার বা ২৫৮ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এদিকে আজ বৃহস্পতিবার থেকে আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড় শিল্প খাত তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়নি। এরই মধ্যে শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্নে দেশের সব গার্মেন্ট কারখানা বন্ধের দাবি তুলেছেন এ শিল্পের অনেক শ্রমিক নেতা।

জানা গেছে, করোনার প্রভাবে প্রথমে কাঁচামাল সরবরাহ সংকটে পড়তে হয়েছিল পোশাক খাতকে। চীননির্ভর কাঁচামালগুলো আসতে পারছিল না। কারণ করোনা ভাইরাসের প্রভাবে দেশটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ধীর গতিতে হলেও কাঁচামাল সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও এখন চাহিদা সংকটে পড়েছে দেশের পোশাক খাত। পশ্চিমা দেশগুলোর ক্রেতারা একের পর এক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় ভোক্তা চাহিদা কমে বিক্রি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে একের পর এক ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিতাদেশ দিচ্ছে ক্রেতারা। বিরূপ পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ বাতিলের তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে বিজিএমইএ। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যমতে, বিজিএমইএর সদস্য ৯৩৬ কারখানার ২ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার বা ২৫৮ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২১ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা। এসব ক্রয়াদেশের আওতায় ছিল ৮০ কোটি ১ লাখ পিস পোশাক। এসব প্রতিষ্ঠানের আওতায় আছে ১৯ লক্ষাধিক শ্রমিক। ক্রয়াদেশ বাতিল-স্থগিত করা ক্রেতাদের মধ্যে প্রাইমার্কের মতো বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানও আছে। আয়ারল্যান্ডভিত্তিক প্রাইমার্কের পাশাপাশি ক্রয়াদেশ বাতিল-স্থগিত করেছে ইউরোপের ছোট-মাঝারি-বড় সব ধরনের ক্রেতাই।

এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, করোনার কারণে ক্রেতারা ২.৫৮ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার বাতিল করেছেন। তিনি জানান, আগামী এপ্রিল, মে ও জুন মাসের অর্ডারও বাতিল করছেন ক্রেতারা। রুবানা হক বলেন, তবে পরিস্থিতি যাই হোক, পোশাক শ্রমিকরা সময়মতো মজুরি পাবেন। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে, সরকার পোশাক শিল্পের পাশে আছে। তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে কেউ সাময়িকভাবে গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ কিংবা শ্রমিক-কর্মচারীদের ছুটি দিতে চাইলে সংশ্লিষ্ট আইনের বিধিবিধান মেনে করতে হবে। তিনি বলেন, ‘কোনো মালিক যদি তার কারখানার শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানো কিংবা সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ রাখতে চান, তাহলে তাকে অবশ্যই সব বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ করে চলতি মাসের বেতন পরিশোধ করাসহ নিয়মানুযায়ী প্রতি মাসের বেতন পরবর্তী মাসের ৭ কার্যদিবসের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।’

এদিকে মহামারি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড় শিল্প খাত তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে এ পর্যন্ত ৭টি কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে পোশাক শ্রমিকদের রক্ষা করতে পোশাক কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছে শ্রমিক সংগঠনগুলো। একই সঙ্গে শ্রমিকদের বেতনসহ ছুটি দিতে সরকার ও পোশাক শিল্প মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সংগঠনগুলোর নেতারা। স¤প্রতি বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার, সাধারণ সম্পাদক জুলহাস নাইন ও সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম এক যৌথ বিবৃতিতে এই আহ্বান জানান। তারা সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধের পাশাপাশি পোশাক শ্রমিকদের চলতি মাসের মজুরি, যাতায়াত ভাতাসহ অন্যান্য নিরাপত্তা ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দেন।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj