সিআইডির মামলা : পাপিয়ার অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গী ওয়েস্টিনের কর্মকর্তা

বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২০

কাগজ প্রতিবেদক : মদের টেবিলে ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ছবি তুলে ব্লু্যাকমেইল করতেন পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে মতি সুমন। আদায় করতেন মোটা অঙ্কের অর্থ। এই প্রক্রিয়ায় চার মাসে ৫ কোটিরও বেশি টাকা উপার্জন করেন তারা। পাপিয়ার অবৈধ এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গুলশানের দি ওয়েস্টিন হোটেলের অসাধু কিছু কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অনুসন্ধানে। গত শনিবার সংস্থাটির পক্ষ থেকে হোটেলের এক কর্মকর্তাসহ ছয় জনকে আসামি করে মানি লন্ডারিং আইনে গুলশান থানায় মামলা করা হয়েছে।

পাপিয়া ও তার স্বামী ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন- পাপিয়ার সহযোগী সাব্বির খন্দকার, শেখ তায়্যিবা নূর, তেজগাঁও এফডিসি গেটসংলগ্ন কার একচেঞ্জের অন্যতম মালিক যুবায়ের আলম এবং হোটেল ওয়েস্টিনের বারের ম্যানেজার মো. বশির। এদের মধ্যে যুবায়ের দেশের বাইরে রয়েছেন আর বশির পলাতক। আর সাব্বির ও তায়্যিবা আগেই পাপিয়া-সুমনের সঙ্গে গ্রেপ্তার হয়েছেন। গাড়ির দোকান ‘কার এক্সচেঞ্জে’ পাপিয়ার কোটি টাকার বিনিয়োগ আছে বলে আগেই জানিয়েছিল র‌্যাব।

ঢাকার বিমানবন্দর এলাকা থেকে গত ২২ ফেব্রুয়ারি পাপিয়া, তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে মতি সুমন এবং তাদের দুই সহযোগী গ্রেপ্তার হন। পরে র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গ্রেপ্তারের সময় ওই চার জনের কাছ থেকে সাতটি পাসপোর্ট, ২ লাখ ১২ হাজার ২৭০ টাকা, ২৫ হাজার ৬০০ টাকার জালনোট, ৩১০ ভারতীয় রুপি, ৪২০ শ্রীলঙ্কান রুপি ও সাতটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। এরপর আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নেয়া হয় তাদের। রিমান্ডে তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

ঢাকা ও নরসিংদীতে পাপিয়ার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বিপুল সম্পদের খোঁজ পাওয়ার কথা জানিয়েছে র‌্যাব। লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফী উল্লাহ বুলবুল বলেছিলেন, অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই নারী রাজধানীর গুলশানের একটি অভিজাত হোটেল ভাড়া নিয়ে ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ চালিয়ে যে আয় করতেন, তা দিয়ে হোটেলে বিল দিতেন কোটি টাকার উপরে। এই নারীর নামে ওই হোটেলের ‘প্রেসিডেনসিয়াল স্যুইট’ সবসময় বরাদ্দ থাকত। নিজের এবং কাস্টমারদের মদ-বিয়ার পান করানো বাবদ হোটেলে প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ টাকা পরিশোধ করতেন তিনি। এই হোটেলে নিয়মিত কয়েকজন তরুণী থাকত, যারা তার ‘কাস্টমারদের’ বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করত। এজন্য তাদের মাসিক বেতন বরাদ্দ ছিল।

সিআইডির করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা সিকিউরিটি সার্ভিস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক টোকন মিয়া, তার দুই সহযোগী স্বপন মিয়া এবং আইয়ুব আলীকে নরসিংদীতে আটকে রেখে মেয়েদের সঙ্গে আপত্তিকর ছবি তোলা হয়। পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে পাপিয়া তার বাবার ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ২ লাখ ৬০ হাজার এবং নগদ ২০ হাজার টাকা আদায় করেন। এছাড়া একই বছর ১২ অক্টোবর থেকে ২১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ওয়েস্টিনের ২২০১ কক্ষে মাদক কেনাবেচা, চাঁদাবাজি, প্রতারণা এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে পাঁচ কোটি ৯ লাখ ৭৭ হাজার টাকা আদায় করে পাপিয়ারা। সেই টাকারই একটি বড় অংশ কার একচেঞ্জ, নরসিংদীতে কেএমসি এন্টারপ্রাইজ এবং কেএমসি কার ওয়াশ অটো সলিউশনে বিনিয়োগ করেন তারা। এছাড়া পাপিয়া ও তার সহযোগীরা ওয়েস্টিনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহায়তায় হোটেলের ২৬টি কক্ষ অবৈধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতেন বলেও মামলায় উল্লেখ করেছেন বাদী।

মামলায় বলা হয়, আসামি সাব্বির ও তায়্যিবা প্রতারণা, হুমকি, ভয়ভীতি দেখানো, ওয়েস্টিনের কর্মকর্তা বার ম্যানেজার বশির হোটেল কক্ষে ব্যবসায়ীদের আপত্তিকর ছবি তুলে তা সংরক্ষণ করে অর্থ আদায়ে পাপিয়া এবং তার স্বামীকে সহায়তা করতেন। আর পাপিয়ার এসব অর্থ অবৈধভাবে উপার্জিত জেনেও যুবায়ের আলম তার ‘কার একচেঞ্জ’ নামের প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে মুদ্রাপাচার আইনে অপরাধ করেছেন। পাপিয়া এভাবে অবৈধভাবে উপার্জিত আয়ের ৩ কোটি ২৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা ওয়েস্টিনে বিল এবং ইন্দিরা রোডের বাসা ভাড়া বাবদ ছয় লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। এছাড়া প্রায় ৬০ লাখ টাকা নিজের কাছে রাখেন, যা ইতোমধ্যে জব্দ করা হয়েছে বলে মামলায় বলা হয়েছে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj