জয় বাংলা

বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২০

জসীম আল ফাহিম

‘মুক্তিযোদ্ধা’ নামটা শুনলেই পাকিস্তানি মিলিটারিদের শরীরে কাঁপন ধরে যেত। ভয়ে হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম বেড়ে যেত। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের নাগালে পেলে আর কোনো কথা নেই। ফটাফট গুলি করে দিত তারা। নির্বিচারে পাখির মতো গুলি করে মারত। মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করে তারা যেন এক ধরনের আনন্দ অনুভব করত। আবার মুক্তিযোদ্ধারাও কিন্তু পাকিস্তানি মিলিটারিদের ছাড় দিত না। নাগালে পেলে গুলি করে ওদের মাথার খুলি উড়িয়ে দিত। আর জীবিত ধরতে পারলে তো কোনো কথাই নেই। পিটিয়ে একেবারে তক্তা বানিয়ে ফেলত। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের তারা বাঘের মতো ভয় করত। মুক্তিযোদ্ধাদের শায়েস্তা করার জন্য তারা ক্যাম্পের ভেতর টর্চার সেল বানিয়ে রাখত। কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে জীবিত ধরতে পারলে তারা সেই টর্চার সেলে নিয়ে আটকে রাখত। টর্চার সেল হলো রীতিমতো একটা জল্লাদখানা। শারীরিক নির্যাতনের সব ধরনের অস্ত্রশস্ত্রই সেখানে মজুত থাকত।

সেদিন দুপুরবেলা পাকিস্তানি মিলিটারিরা হঠাৎ সুনামগঞ্জ শহরে গিয়ে হানা দিল। তাদের ক্যাম্প থেকে শহরের দূরত্ব প্রায় মাইল দুয়েক হবে। জলপাই রঙের জিপ এবং ট্রাক বোঝাই সৈন্য নিয়ে তারা শহরের ভেতর প্রবেশ করল। শহরে গিয়ে গাড়িবহর নিয়ে কয়েকবার চক্কর দিল। ট্রাফিক পয়েন্টের কাছে আসতেই কেউ একজন জোর গলায় চিৎকার দিয়ে উঠল, ‘জয় বাংলা! জয় বাংলা!’

আচমকা ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি শুনে মিলিটারিদের মেজরের পায়ের রক্ত যেন একেবারে মাথায় উঠে গেল। গর্জন করে সে উর্দুতে বলল, ‘এই গাড়ি থামাও।’

অমনি ড্রাইভারটি ব্রেক কষে গাড়ি থামাল। মেজর নির্দেশ দিল, ‘খুঁজে দেখো কে জয় বাংলা বলেছে। পাকড়াও করো তাকে।’

অমনি জিপ থেকে দুজন সৈন্য লাফ দিয়ে নেমে গেল। জিপের পেছনে ততক্ষণে ট্রাকটিও এসে থামল। ট্রাক থেকেও কয়েকজন সৈন্য লাফিয়ে নামল। হন্যে হয়ে তারা জয় বাংলা ধ্বনির উৎস খুঁজতে লাগল। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তারা কাউকে পেল না। পরে তারা আবার গাড়িতে চড়ে বসল। ড্রাইভার গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। গাড়ি চলতে শুরু করল।

এমন সময় পেছন থেকে আবারো কেউ একজন চেঁচিয়ে বলল, ‘জয় বাংলা! জয় বাংলা!’

এবারের ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি শুনে মেজরটির মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার অবস্থা হলো। পরে তাড়াতাড়ি গাড়ি ঘুরিয়ে আবার তারা আগের জায়গায় ফিরে এল। সৈনিকরা গাড়ি থেকে নেমে আশপাশটা ভালো করে খুঁজে দেখল। কিন্তু না। এবারো তারা কাউকে খুঁজে পেল না। পরে তারা ফিরে এসে মেজরকে বলল, ‘স্যার, আমরা এবারো কাউকে খুঁজে পাইনি।’

মিলিটারিদের কথা শুনে মেজরটি রাগে কটমট করে উঠল। ধমকের সুরে বলল, ‘খামোশ! দশ হাত মাটির নিচ থেকে হলেও ওকে খুঁজে বের করো। ওকে আমার চাই-ই চাই। ওকে পাকড়াও করে জলদি আমার কাছে নিয়ে এসো।’

সৈনিকরা আবারো খুঁজতে বেরোল। এখানে খুঁজল তারা। ওখানে খুঁজল। এভাবে অনেক খোঁজাখুঁজি করে তারা মাঝারি বয়সের একজন লোককে পাকড়াও করতে পারল। পাকড়াও করে লোকটিতে সরাসরি মেজরের সামনে এনে হাজির করল। লোকটিকে দেখে মেজর ধমকের সুরে জিজ্ঞেস করল, ‘এই তুই জয় বাংলা বলেছিস?’

লোকটি কোনো কথা বলল না। চুপ হয়ে ফ্যালফ্যাল করে মেজরের মুখপানে তাকাতে লাগল। মেজরটি আবারো ধমক দিয়ে বলল, ‘এই তুই কথা বলছিস না কেন? বল তুই জয় বাংলা বলেছিস কি না।’

লোকটি এবার মৃদু হাসল। লোকটির হাসি দেখে মেজরটি ক্রুদ্ধ হয়ে তার গালে কষে একটা চড় লাগাল। মেজরের চড় খেয়ে লোকটি এবার জোর গলায় হাসতে শুরু করল। ওর এরকম হাসির যে কী মানে মেজর কিছুই বুঝতে পারল না। তারপর বলল, ‘ওকে গাড়িতে ওঠাও। ওকে ক্যাম্পে নিয়ে যাও।’

সৈনিকরা তখন লোকটিকে জোর করে ধরে ট্রাকে নিয়ে উঠাল। লোকটি অবশ্য ট্রাকে উঠতে চাইছিল না। না ওঠার জন্য সে অনেক গাঁইগুঁই করল। কিন্তু মিলিটারিরা তার গাঁইগুঁইয়ে কান দিল না। চ্যাংদোলা করে তাকে ট্রাকে নিয়ে উঠালো। ট্রাকে উঠিয়ে মিলিটারিরা লোকটিকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল। পরে তারা তাকে ক্যাম্পে নিয়ে টর্চার সেলে আটকে রাখল।

বিকেলের দিকে দুজন মিলিটারি সেই টর্চার সেলে গিয়ে ঢুকল। লম্বা গোঁফঅলা মিলিটারি দুজনকে সাক্ষাৎ জমদূতের মতোই লাগছিল। তারা প্রথমে লোকটির কাছ থেকে কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে চেষ্টা করল। একজন তাকে প্রশ্ন করার জন্য তৈরি হলো। অন্যজন তার বক্তব্য খাতায় লিপিবদ্ধ করতে কাগজ-কলম নিয়ে পাশে অপেক্ষা করতে লাগল। মিলিটারিদের ভাবখানা এমন যেন তারা বিরাট একজন অপরাধীকে পাকড়াও করেছে। এখন তার মুখ থেকে মূল্যবান কিছু তথ্য পাওয়া যাবে।

একজন মিলিটারি জিজ্ঞেস করল, ‘নাম কী রে তোর?’

লোকটি কোনো জবাব দিল না। মিলিটারিটি তখন আবার বলল, ‘তোর নামটা কী বল?’

লোকটি এবারো কিছু বলল না। শুধু চুপ হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। তাকে এমন চুপ হয়ে থাকতে দেখে মিলিটারিটি ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল। পরে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে এসে লোকটির মুখে জোরসে একটা ঘুষি মারল। ঘুষি খেয়ে লোকটি মাটিতে পড়ে গেল। তার দুটো দাঁত উপড়ে গেল। মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোতে লাগল। মিলিটারিটি তখন পায়ের বুট দিয়ে লোকটিকে আচ্ছামতো লাথি মারতে লাগল। ওর লাথি খেয়ে লোকটির শরীর বেঁকে যাচ্ছিল। বারবার কঁকিয়ে উঠছিল। তবু মুখ খুলল না বেচারা। পরে নিরাশ হয়ে মিলিটারি দুজন টর্চার সেল ত্যাগ করল।

কিছুক্ষণ পর টর্চার সেলে আবার মিলিটারিদের আগমন ঘটল। এবার মিলিটারি এল চারজন। লোকটি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসেছিল। একজন মিলিটারি তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এই তুই কী মুক্তিযোদ্ধা?’

লোকটি এবারো কোনো জবাব দিলো না। মিলিটারিটি তখন সঙ্গীদের বলল, ‘ওর কনুই আর হাঁটু পরখ করে দেখো তো কড় পড়েছে কি না।’

অমনি দুজন মিলিটারি এসে ভালো করে লোকটির হাঁটু আর কনুই পরীক্ষা করল। শেষে বলল, ‘না কোনো দাগ নেই। কড় পড়েনি।’

এবার আগের মিলিটারিটি সঙ্গীদের বলল, ‘জাপটে ধরো তো ওকে।’

সঙ্গী তিনজন এসে লোকটিকে জাপটে ধরল। মিলিটারিটি তখন একটি মোটা বেত নিয়ে এসে লোকটির পায়ের তলায় আচ্ছামতো বাড়ি দিতে লাগল। আর বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগল, ‘এই বল তোর নাম কি? তুই মুক্তিযোদ্ধা কিনা বল?’

এভাবে অনেকক্ষণ পিটানোর পরও লোকটি মুখ খুলল না। মুখ খুলছে না দেখে মিলিটারিটি এবার নির্দেশ দিলা, ‘ওকে উপুড় করে ঝুলিয়ে দাও।’

অমনি অন্য মিলিটারিরা এসে লোকটিকে উপুড় করে ঝুলিয়ে দিল। মিলিটারিটি এবার মোটা বেত দিয়ে লোকটিকে বেদম পিটাতে লাগল। পিটিয়ে তাকে রক্তাক্ত করে তুলল। কিন্তু তবু সে মুখ খুলল না। পা দুটো ওপরে আর মাথা নিচে দিয়ে লোকটি ঝুলে রইল। সে মুখ খুলছে না দেখে মিলিটারিরা বিরক্ত হয়ে টর্চার সেল থেকে বেরিয়ে গেল।

কিছু সময় পর আরো তিনজন মিলিটারি এসে টর্চার সেলে ঢুকল। তাদের দুজন লোকটির হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে রাখল। আর অন্যজন একটি ট্রে থেকে সুচ নিয়ে লোকটির নখের গোড়ায় ফুটাতে শুরু করল। প্রতিটি সুচ ফুটানোর সময় লোকটি চোখ দুটো বড় বড় করে তাকাচ্ছিল। মনে হলো তার প্রাণপাখিটা যেন বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। এভাবে দুই হাত এবং দুই পায়ের নখের গোড়ায় ওরা অনেক সুচ ঢোকাল। কিন্তু তবু লোকটি মুখ খুলল না। এত মার খাওয়ার পরও সে মুখ খুলছে না দেখে ওরা এক প্রকার হাল ছেড়ে দিল। মিলিটারিরা ভেবে পাচ্ছিল না যে কী করে ওর পেট থেকে কথা বের করা যায়। পরে তারা গিয়ে মেজরকে বিস্তারিত খুলে বলল। সব শুনে মেজরটি সিংহের মতো ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল। বলল, ‘ওকে সুরমা নদীর ধারে নিয়ে যাও। আমি আসছি।’ বলে মেজরটি তার রুমে গিয়ে প্রবেশ করল।

এদিকে মিলিটারিরা লোকটিকে টেনেহেঁচড়ে সুরমা নদীর কাছে নিয়ে গেল। যাওয়ার সময় ওরা লোকটির চোখ দুটো কালো কাপড় দিয়ে শক্ত করে বাঁধল। ওরা তাকে নদীর ধারে নিয়ে দাঁড় করাল। মেজরটি তখন গুলি ভরা পিস্তল নিয়ে এসে মুহুর্তেই লোকটিকে মাটিতে শুইয়ে দিল। গুলি খেয়ে চোখ বাঁধা মানুষটা গলা কাটা কবুতরের মতো তড়পাতে লাগল। নিথর হয়ে যাওয়ার আগে সে মিলিটারিদের চমকে দিতে শেষবারের মতো চিৎকার করে উঠল, ‘জয় বাংলা! জয় বাংলা!’

দুদিন পর লোকটির মৃতদেহটা সুরমা নদীতে ভেসে ভেসে অনেকদূর গেল। সকালে সমীর মাঝি নৌকা নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে এসেছিল। হঠাৎ নদীর পানিতে গুলিবিদ্ধ একজন বুড়ো লোকের লাশ ভাসতে দেখে সে চিৎকার দিয়ে উঠল। লাশ দেখতে তখন আরো কিছু কৌত‚হলী লোক এসে জড়ো হলো। সমীর মাঝি লোকটির মুখ দেখে অসহায়ের মতো হাহাকার করে উঠল। ‘এ যে দেখছি আমাদের মজু পাগলা রে। পাকিস্তানি

নরপিশাচেরা পাগল মানুষটারেও ক্ষমা করল না।’

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj