অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূর : বঙ্গবন্ধুর প্রযুক্তি ভাবনা ও ডিজিটাল বাংলাদেশ

বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২০

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের স্থপতি, ইতিহাসের মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন দুঃখী, বঞ্চিত, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনের দিকে এগিয়ে আনার অন্যতম মাধ্যম শিক্ষা। যার কারণে ১৯৭১ সালে সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের নানান সীমাবদ্ধতা থাকার পরও জাতির পিতা প্রথমেই গুরুত্ব দিয়েছেন শিক্ষায়। বাংলাদেশে একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানমুখী শিক্ষা-নীতি প্রণয়নে গুরুত্ব দেন তিনি। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-ই খুদাকে চেয়ারম্যান করে ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই গঠন করেন বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন জাতীয় শিক্ষা কমিশন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নকালে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ১৯৭২ এর সংবিধানে ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’ অংশে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা-ভাবনা অন্তর্ভুক্ত করে ওই সংবিধান প্রণীত হয়। এতে বলা হয়েছে ‘(ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সব বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য, (খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছাপ্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য, (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।

বিশ^ তৃতীয় শিল্প বিপ্লবে প্রবেশের এক দশক পরই স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয় বাংলাদেশ। সদ্য স্বাধীন এই দেশকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোয় মনোনিবেশ করেন জাতির পিতা। সেজন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে টেলিকমিউনিকেশনের সদস্য বানানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন দুর্গম এলাকা রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় স্থাপন করেছেন ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র। বর্তমানে এই কেন্দ্রের মাধ্যমে বিশে^র বিভিন্ন দেশের সঙ্গে টেলিফোন ডাটা কমিউনিকেশন, টেলেক্স, ইত্যাদি আদান-প্রদানে মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করছে বাংলাদেশ। জাতির পিতার প্রচেষ্টায় ১৯৭৩ সালে আইটিইউর সদস্যপদ পায় বাংলাদেশ। জাতির পিতার দেখানো সেই পথ ধরে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে চলছে। ২০১০ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত এই স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে পরিণত করেছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা সরকারের প্রযুক্তি কেন্দ্রিক বাংলাদেশ স্যাটেলাইটের যুগে প্রবেশ করেছে বিশে^র ৫৭তম দেশ হিসেবে। মহাকাশে উড়ছে জয়বাংলা খচিত বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সেবা পৌঁছে গেছে জনগণের দোরগোড়ায়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ব্যবহার করে স্যাটেলাইট ও স্মার্ট টিভি চ্যানেল, স্মার্ট ফোন, দূর শিক্ষণ, দ্বীপ অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ, পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ওয়াই ফাই ইন্টারনেট সম্প্রচারসহ আরো অনেক সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। গোটা দেশ সংযুক্ত হয়েছে টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তিতে। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে মিলছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা। দেশে স্থাপন করেছেন ডিজিটাল বিশ^বিদ্যালয়। আর এই সাফল্যের পিছনে আছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। বিশ^ এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হচ্ছে ফিউশন অব ফিজিক্যাল, ডিজিটাল এবং বায়োলজিক্যাল স্ফেয়ার। এখানে ফিজিক্যাল হচ্ছে হিউমেন, বায়োলজিক্যাল হচ্ছে প্রকৃতি এবং ডিজিটাল হচ্ছে টেকনোলজি। এই তিনটিকে আলাদা করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ইন্টেলেকচুয়ালাইজেশন হচ্ছে, হিউমেন মেশিন ইন্টারফেস হচ্ছে এবং রিয়েলটি এবং ভার্চুয়ালিটি এক হয়ে যাচ্ছে। এখন যদি আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করতে চাই, তাহলে ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সি, ফিজিক্যাল ইন্টেলিজেন্সি, সোশ্যাল ইন্টেলিজেন্সি, কনটেস্ট ইন্টেলিজেন্সির মতো বিষয়গুলো তাদের মাথায় প্রবেশ করিয়ে দিতে হবে। তাহলে ভবিষ্যতে আমরা একজন শিক্ষার্থীকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত করতে পারব।

বিশে^র উন্নত দেশগুলো এ শিল্প বিপ্লব মোকাবিলায় এরই মধ্যে কাজ করছে। বিজ্ঞপ্তি।

বাংলাদেশও প্রস্তুত হচ্ছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মূলকথা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এছাড়া ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটি, রোবটিকস, ত্রিমাত্রিক প্রিন্টিং, ন্যানো টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্সের মতো বিষয়গুলোর মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করে মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজতর করা।

বাংলাদেশকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের নেতৃত্বদানের উপযোগী করে গড়ে তুলে দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী এবং তার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা দেশে প্রথম বিষেষায়িত ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি, প্রতিষ্ঠা করেছেন। ইতোমধ্যে এই বিশ^বিদ্যালয় চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে। আশা করা যায় এই বিশ^বিদ্যালয়ের মাধ্যমে উন্নত বিশে^র দেশগুলোর মতো বাংলাদেশও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে এসে বিশ^ এখন ডিজিটাল শিক্ষার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও আমরা ডিজিটাল শিক্ষার কথা বলছি। এই ডিজিটাল শিক্ষা হচ্ছে শিক্ষার উপকরণগুলো টেকনোলজির মাধ্যমে আরো উন্নত করে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানো। শ্রেণিকক্ষগুলোকে স্মার্ট প্রযুক্তির আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ এর তত্ত্বাবধানে আমরা মুজিববর্ষে প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ এর তত্ত্বাবধানে দেশের বিভিন্ন জেলার স্নাতক পর্যায়ের ১৬ কলেজের ২৪০০ (দুই হাজার চারশত) জন শিক্ষক এবং ৮০০০ (আট হাজার) শিক্ষার্থীকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে লানিং ম্যানেজম্যান্ট সিস্টেম (এলএমএস) এর আওতায় নিয়ে এসে প্রশিক্ষিত করব। এই উদাহরণকে সামনে রেখে সরকার চাইলে পরবর্তী সময় ধীরে ধীরে দেশের সব স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়কে এই প্রযুক্তির আওতায় নিয়ে আসতে পারে।

মুজিববর্ষ শুরুর প্রাক্কালে আমি পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি জাতির পিতাকে। স্মরণ করি তার কাজ ও আদর্শকে। জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি মুজিববর্ষেই সারাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ এর মাধ্যমে সারাদেশে ডিজিটাল শিক্ষার নতুন দিক উন্মোচিত হবে।

অর্থ-শিল্প-বাণিজ্য'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj