বন্দরের কার্যক্রমে করোনার মারাত্মক প্রভাব : চট্টগ্রামে ১ হাজার কোটি টাকার গার্মেন্টস পণ্যের অর্ডার বাতিল

সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২০

চট্টগ্রাম অফিস : করোনা ভাইরাসের প্রভাবে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ধস নামতে শুরু করেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনারের পাশাপাশি কার্গো পণ্য আসা কমছে মারাত্মকভাবে। এদিকে দেশে করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে পোশাক শিল্পের উৎপাদন বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা। এতে পোশাক শিল্পের মালিকদের প্রতিদিন শত কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, চীন থেকে শুরু করে বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার পাশাপাশি সংক্রমণ ঠেকাতে জনজীবন অনেকটাই অচল। এর নেতিবাচক প্রভাব বিশ্ব বাণিজ্যের পাশাপাশি দেশের বাণিজ্যেও পড়েছে। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ৯২ শতাংশই সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। আর এই খাতে বছরে সরকারের রাজস্ব আয় হয় ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে প্রতি মাসেই ৪০ থেকে ৫০ হাজার টিইউএস কন্টেইনার আসা কমছে। জানুয়ারি মাসে ২ লাখ ৮৬ হাজার কন্টেইনার এলেও ফেব্রুয়ারি মাসে এসেছে ২ লাখ ৪২ হাজার। আর এক মাসে কার্গো পণ্য আসার পরিমাণ কমেছে প্রায় ১৫ লাখ টন।

এদিকে আগের মজুদের কাঁচামাল দিয়ে এতদিন পর্যন্ত দেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলো সচল রেখেছিলেন মালিকরা। তবে চলতি মাসের শুরুতে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস রোগী শনাক্ত হওয়ার পর গার্মেন্টস কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়েছে বিদেশি ক্রেতারা। এদিকে পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া কেনার আদেশ স্থগিত করে দিচ্ছে বিদেশি ক্রেতারা। করোনা ভাইরাসের কারণে চট্টগ্রামের ৫০টি গার্মেন্টেসের ১ হাজার কোটি টাকার অর্ডার বাতিল বা স্থগিত হয়েছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মো. মাহবুবুল আলম ভোরের কাগজকে বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ^ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আমাদের দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। চীন থেকে রপ্তানিমুখী পণ্যের কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যা হয়েছে। চীনে করোনা কমে আসায় আমদানি বাণিজ্যে ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হলেও রপ্তানি বাণিজ্যে প্রভাব রয়ে গেছে। বিশেষ করে গার্মেন্টস সেক্টরে এর প্রভাব ভয়াবহ। প্রতিনিয়ত ক্রয় অর্ডায় বাতিল হচ্ছে। এই ক্ষতি পোষাতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী ইন্ডিপেন্ডেন্ট অ্যাপারেল লিমিটেড থেকে আড়াই লাখ ডলার মূল্যের ক্রয় অর্ডার স্থগিত করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ই-মেইলের মাধ্যমে অর্ডার স্থগিতের বিষয়টি জানিয়েছে। এ ধরনের স্থগিতাদেশ আরো আসতে পারে- এমন শঙ্কায় রয়েছে অন্য পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও। তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) প্রথম সহসভাপতি এম এ সালাম ভোরের কাগজকে বলেন, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে চীনের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় কাঁচামালের তীব্র সংকট তৈরি হয়। এখন করোনা ভাইরাসের কারণে প্রতিনিয়ত ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ও ব্র্যান্ডের কাছ থেকে চলমান ক্রয়াদেশ স্থগিত ও বাতিলের খবর আসছে। সামনে এ রকম পরিস্থিতি চলতে থাকলে অবস্থায় খুবই ভয়াবহ হবে। পোশাক রপ্তানিতে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশের পোশাক শিল্প।

বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের গার্মেন্টস কারখানায় ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি ক্রয় আদেশ স্থগিত কিংবা বাতিল করা হয়েছে। চট্টগ্রামের বিজিএমইএ তালিকাভুক্ত ৫০টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ২৭টি গার্মেন্টসের অর্ডার স্থগিত হয়েছে, বাতিল করা হয়েছে ২০টি গার্মেন্টসের অর্ডার। এছাড়াও বেশ কিছু কোম্পানির কাটিং স্থগিত করা হয়েছে। চারটি প্রতিষ্ঠান আবার ফেব্রিক্স স্বল্পতার কারণে কাজ করতে পারছে না। অর্ডার বাতিল ও স্থগিতের কারণে চট্টগ্রামের গার্মেন্টসগুলোর ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি হবে বলে জানিয়েছেন মালিকরা।

বিজিএমইএ পরিচালক মোহাম্মদ আতিক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও কানাডা করোনা ভাইরাসের কারণে লকডাউন হয়ে আছে। ফলে প্রত্যেক দেশের ক্রয় আদেশগুলো স্থগিত করে বার্তা পাঠানো হচ্ছে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে। এতে বড় ঝুঁকিতে আছি আমরা। তিনি বলেন, ‘এছাড়াও আমাদের দেশের করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি নিয়েও গার্মেন্টস শিল্প বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এর ফলে আমরাও আগামী ২৫ মার্চ থেকে প্রতিষ্ঠান দুই সপ্তাহ বন্ধের জন্য মতপ্রকাশ করেছি। কারণ ঝুঁকি নিতে চাই না।’

বাংলাদেশের মোট আমদানি পণ্যের প্রায় ২৬ শতাংশই আসে চীন থেকে। যার মধ্যে রয়েছে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর উপকরণসহ শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি। শুধু পণ্য আমদানিই নয়, বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। করোনা সংক্রমণের কারণে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত বিপুল পরিমাণ পণ্য আটকে আছে। রপ্তানিমুখী বিভিন্ন পণ্যের কাঁচামালের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে চীন থেকে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে চীনে প্রায় ৩০০ ধরনের পণ্য রপ্তানি হয়। যা থেকে বছরে আয় হয় প্রায় ৫ কোটি ডলার। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কাঁচামাল সংকটের কারণে রপ্তানি বাণিজ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব আরো বাড়বে। কাঁচামাল সংকটে দেশের ৮০ শতাংশ গার্মেন্টস কারখানা বন্ধের আশঙ্কা জানিয়েছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা।

এদিকে করোনার সংক্রমণের কারণে কমে গেছে চীন থেকে পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যা। চট্টগ্রাম বন্দরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পণ্যবাহী জাহাজের বেশিরভাগই চীনের। প্রতিমাসে চারটি শিপিং লেনে ১৯টি জাহাজ সরাসরি চীন থেকে আসে। আর চীন থেকে সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কা হয়ে বাংলাদেশে আসা যাওয়া করে ৭০টি জাহাজ। জানুয়ারিতে চীন থেকে এসেছে ১৫টি জাহাজ। আর ফেব্রুয়ারিতে এসেছে ৯টি জাহাজ। চলতি মাসে এ পর্যন্ত এসেছে মাত্র কয়েকটি জাহাজ। এতে কমেছে পণ্যবাহী কন্টেইনারের পরিমাণও। আর যে কটি জাহাজ এসেছে সেগুলো মূলত ডিসেম্বর বা তার আগে ঋণপত্র খোলা হয়েছিল।

চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম ভোরের কাগজকে বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে স্বাভাবিকভাবেই দেশের আমদানি-রপ্তানিতে প্রভাব পড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে আসা জাহাজের মধ্যে বেশিরভাগই চীন থেকে আসা। করোনা ভাইরাসের কারণে চীন থেকে জাহাজ আসা কমেছে। এছাড়া অন্যান্য দেশ থেকে জাহাজ কম এসেছে। এতে কনটেইনার হ্যান্ডেলিংও কমেছে। জানুয়ারি মাসের তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসে কনটেইনার হ্যান্ডেলিং কমেছে ৪২ হাজার টিইইউএস। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের যে প্রভাব সেটা এখানেও পড়েছে। চীন থেকে সরাসরি জাহাজ আসা অনেক কমে গেছে। অন্যান্য রুট থেকে জাহাজ আসাও কমেছে। এতে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

অন্যদিকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশের প্রধান চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে সতর্কতামূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে চীন থেকে আসা জাহাজগুলোকে যাত্রা শুরুর পর ১৪ দিন থেকে ২২ দিন অতিবাহিত না হলে বন্দরে প্রবেশের অনুমতি না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। পর্যবেক্ষণে রাখার পরই বন্দরের প্রধান জেটিতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হচ্ছে। এছাড়া অন্য দেশ থেকে আসা জাহাজগুলোর ক্ষেত্রে বন্দরে প্রবেশের আগে নাবিক এবং ক্রুদের শারীরিক তথ্য তাদের শিপিং এজেন্টকে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে দিশেহারা ব্যবসায়ীরা। নাবিকদের শতভাগ স্বাস্থ্য পরীক্ষা (স্ক্রিনিং) শেষেই জেটিতে ভিড়তে দেয়া হচ্ছে। এছাড়া পূর্ব-এশিয়ার বন্দরগুলো হয়ে আসা জাহাজের নাবিকের শতভাগ স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে ‘নিরাপদ’ ঘোষণা শেষেই বন্দরে ঢোকার অনুমতি পাচ্ছে। সহসা করোনা ভাইরাস সংকট না কাটলে দেশের আমদানি-রপ্তানি খাতে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের। বাংলাদেশে শিপিং এজেন্ট এসোসিয়েশনের পরিচালক আজমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, ভলিউম কমে গেলে স্বাভাবিকভাবে আমাদের ওপর কস্ট ইম্প্যাক্ট বেশি পড়ে। এতে শিপিং কোম্পানিগুলো অনেক ক্ষতিমুখে পড়তে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সি-অ্যাম্বুলেন্স এবং ল্যান্ড অ্যাম্বুলেন্স সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তদারকিতে বন্দর হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টেস্ট কিটস, থার্মাল স্ক্যানার, অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামসহ ৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি পৃথক ইউনিট খোলা হয়েছে। চীনা জাহাজকে অপেক্ষায় রেখে নাবিকদের শতভাগ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। বন্দর প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ এসব বিষয়ে মনিটরিং ও সমন্বয় করছে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj