রাষ্ট্র গঠন ও নারীর ক্ষমতায়নে বঙ্গবন্ধু

সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২০

অমিত কে বিশ্বাস

একজন নেতা তখনই মানবিক নেতা হতে পারেন, যখন তিনি সব শ্রেণির আবেগ, অনুভূতি, সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে নিজেকে একত্র করতে পারেন। তেমনি একজন সার্বজনীন মানবিক নেতা ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি যে সময়ে রাজনীতি করেছেন তখনকার সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের স্বাধীনতার অনেক রকম প্রতিবন্ধকতা ছিল। অথচ আমরা লক্ষ করতে পারি স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরু থেকে পরবর্তী সময় রাষ্ট্র গঠনে বঙ্গবন্ধু কীভাবে নারীদের মূল্যায়ন করেছেন, পদায়িত করেছেন। আমরা ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলেই দেখি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের দুর্দান্ত সাহসী অবদান। তাই তো ইতিহাসে তারামন বিবি, রহিমা বেগমদের মতো সাহসী বীরাঙ্গনাকে কাঁপিয়েছিলেন সব বৈষ্যমের ঊর্ধ্বে গিয়ে। আবার লাখ লাখ নারী নির্ভয়ে স্বামী-সন্তানদের যুদ্ধে যেতে উৎসাহী করেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের রাতের আঁধারে রান্না করে খাইয়েছিলেন। দীর্ঘ ৯ মাস কত বীরাঙ্গনাকে অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেও বেঁচেছিলেন মনের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এত সাহস এসব নারী কোথায় পেয়েছিলেন? এটাই দল নেতার নেতৃত্ব। যে সাহস নেতা দিয়েছিলেন ১৯৭১-এর ৭ মার্চের রেসকোর্সের ময়দানে। সেই অমীয় বাণী ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়’।

যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও আমরা লক্ষ করি বঙ্গবন্ধু নারীদের কীভাবে মূল্যায়িত করেছেন, নারীর ক্ষমতায়নে তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল অনুসরণীয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় সংবিধানের ২৭ ধারায় উল্লেখ করা হয় সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। ২৮২ ধারায় উল্লেখ করেন ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন’।

৬৫(৩) ধারায় নারীর জন্য জাতীয় সংসদে আসন সংরক্ষিত রয়েছে এবং ধারার অধীনে স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া ২৮১, ২৮৩ ও ২৮৪ ধারায়ও নারীর সমঅধিকারের কথা বলা হয়েছে। এমনকি সেই সময়ে বঙ্গবন্ধু প্রথম জাতীয় সংসদেই নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করেন। তিনি ‘নারী পুনর্বাসন বোর্ড’ গঠন করেছিলেন। নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন ও আবাসনের জন্য যা পরবর্তী সময় ১৯৭৪ সালে নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন হয়। এছাড়া প্রথম নারী সংগঠন ‘মহিলা সংস্থার’ যাত্রাও বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে শুরু হয়। মেয়েদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে ১০ ভাগ কোটা সংরক্ষণ করে সব ক্ষেত্রে অবারিত অংশগ্রহণের নিশ্চিত করেন। ১৯৭৩ সালেই দুজন নারীকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেন ও ১৯৭৪ সালে একজন নারীকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক নিয়োগ দেন। এমনকি আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক, রাষ্ট্র পরিচালনাসহ প্রত্যেকটি কর্মকাণ্ডেই বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের মতামত, পরামর্শকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে দেখা যায় বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দিয়েছেন, যেমন : জোহরা তাজউদ্দীন, বদরুনেছা, আমেনা বেগম প্রমুখ।

নারী নেতৃত্ব ও নারীর ক্ষমতায়নের যে বীজ বঙ্গবন্ধু রোপণ করেছিলেন তার দলীয় নেতৃত্বের মাধ্যমে সেই উর্বর ফসল আজকের বাংলাদেশ। যার নেতৃত্বে আছেন তারই সুযোগ্য কন্যা বিশ্বের অন্যতম নারী নেতৃত্ব জননেত্রী শেখ হাসিনা। আজ জাতীয় সংসদের স্পিকার থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সচিবালয়, সেনা-বিমান-নৌবাহিনী, আনসার, করপোরেট সেক্টর, শ্রমিক নেত্রী, উন্নয়ন সংস্থা, সাংবাদিকতা কোথায় নেই নারী নেতৃত্ব।

তাই একথা নির্দ্বিধায় বলতে হয়- নারীর সমঅধিকার ও ক্ষমতায়নে বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগ ও নেতৃত্বের দিন সদ্য স্বাধীন একটা দেশ গঠনে অনুকরণীয় ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুলের উপলব্ধিকে যেন বাস্তবায়ন করেছিলেন- ‘পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’ এটাই নেতা ও নেতৃত্ব।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj