কোভিড-১৯ এবং নারী ও শিশু

সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২০

সাবিরা নুপুর

সরকারি একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন সেগুফতা জুঁই। সেই প্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে তার মেয়ে সৃজনী। করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তাই মা-মেয়ের দীর্ঘ অবসর। গত কয়েক দিনেই যেন অনেকটা হাঁপিয়ে উঠেছেন তারা।

রাজধানীর বেসরকারি একটি ব্যাংকে কর্মরত দম্পতি জুনাইনা ও আরাফাত। অফিস থেকে তাদের মিলেছে অন কল ডিউটির নির্দেশ। অন্য সময় হলে ছুটিটা যতটা উপভোগ্য হতো নব এই দম্পত্তির, এখন যেন ঠিক তার উল্টো। সারাক্ষণ বাসায় থেকে থেকে অবসর যেন কাটতেই চাইছে না। মেজাজটাও কেমন যেন খিটমিটে হয়ে গেছে।

জুঁই, সৃজনী, জুনাইনা ও আরাফাতের মতো অনেকের কাছেই এখন ছুটির আমেজ ভিন্ন। ঘরবন্দি অবস্থায় কয়েক দিনেই হাঁপিয়ে উঠেছেন তারা। দেখা দিচ্ছে কিছু পরিবর্তনও।

আমরা এই লেখাটি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত নারী ও শিশু নিয়ে নয়, বরঞ্চ এই পরিস্থিতিতে তারা কীভাবে মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে পারে এবং আমরা কীভাবে তাদের জন্য একটি মানসিক চাপমুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে তা নিয়ে। একটা দীর্ঘ সময় তারা বাসায় থাকবে যা তাদের মধ্যে মানসিক অবসাদ তৈরি করতে পারে। তাছাড়াও বিশেষজ্ঞরা বলছেন পরিবারের সবাই দীর্ঘ সময় একসঙ্গে অবস্থানের কারণে পারিবারিক সহিংসতা বাড়তে পারে। পাশাপাশি নারী ও শিশুর প্রতি শারীরিক, মানসিক এবং যৌন নির্যাতনের হার বেড়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে যা করতে পারেন তা হলো : করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত নিয়মাবলি নিজে পালন করুন এবং শিশুকে পালনে উদ্বুদ্ধ করুন। শিশুসহ পরিবারের সবার জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করুন। পরিবারে সবাই পর্যাপ্ত পানি ও ভিটামিন-সি খাওয়া, শারীরিক অনুশীলন এবং যোগব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলুন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি দেয়া হয়েছে যাতে তারা বাড়ি থাকে এবং এই ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকতে পারে। অভিভাবক হিসেবে শিশু যেন বাড়িতে থাকে এবং কোনো অসুস্থতা যেন শিশুকে আক্রান্ত না করতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখা। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা এবং দীর্ঘ সময় বাহিরে না যাওয়ার ফলে শিশুরা ভয় পেতে পারে, বিরক্ত হতে পারে, রাগ করতে পারে, হতাশ হতে পারে। এটা স্বাভাবিক। এসময় শিশুর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করুন। শিশুর সঙ্গে সময় কাটাতে চেষ্টা করুন। পরিবারের সবার সামনে করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত খোলামেলা আলোচনা করুন এবং সবার করণীয় দায়িত্ব বণ্টন করে দিতে পারেন। তবে শিশুদের সামনে গুজব বা অনুমান ভিত্তিক তথ্য সরবারহ থেকে বিরত থাকুন। ধূমপানের কারণে পরোক্ষভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী ও শিশুরা। তাদের সামনে সব ধরনের ধূমপান থেকে বিরত থাকুন। এসময় পরিবারের সদস্যরা একে অপরের প্রতি সম্মানজনক এবং সুস্থ আচরণ করুন। যা মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা শিশুর ক্ষেত্রে বিশেষ সর্তকতা অবলম্বন করুন। পরিবারে যদি কেউ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকে তবে ভয় পাবেন না বা আতঙ্কিত হবেন না। কারণ ভয় কঠিন পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে তুলতে পারে। এ সময় আতঙ্কিত হয়ে কোনো অপরিচিত লোকের হাতে চিকিৎসার নামে শিশুকে তুলে দেবেন না, যা শিশু পাচারসহ যৌন হয়রানমিূলক সহিংসতার শিকার হতে পারে। দীর্ঘদিনের ছুটি বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা না হওয়ার কারণে মন খারাপ হওয়া, রাগ করা, অভিমান করা বা এই করোনা ভাইরাসটি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এই সময় সবাইকে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে এবং নিজেকেসহ পরিবারের সুস্থতায় ভূমিকা রাখতে হবে। আগ্রহের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার এটি একটি সুযোগ। এই সুযোগে নতুন ছবি আঁকা, নতুন গান বা নাচ তুলে নেয়া কিংবা লেখালেখির অভ্যাস থাকলে তা চালিয়ে যেতে পারেন। বাসায় জমানো গল্পের বইগুলো পড়তে পারেন। নতুন রেসেপি রান্না করে প্রিয়জনকে চমকে দিতে পারেন।

সবশেষে যা বলতে চাই, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকারের দেয়া স্বাস্থ্যসেবা ও সহায়তা কাঠামোয় শিশুদের (মেয়ে ও ছেলে শিশুদের) জন্য আলাদা ও বিশেষ ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে নারী ও শিশুর জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj